নবম খণ্ড
ঋগ্বেদীয়
কর্ত্তৃক অনূদিত ও সম্পাদিত।
____________________
প্রকাশক শ্রীঅরুণচন্দ্র মজুমদার দেব সাহিত্য কুটীর প্রাইভেট লিমিটেড ২১, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা-৯। ১৩৯৭ ৩
| বাক্য। | অধ্যায়। খণ্ড। মন্ত্র। |
|---|---|
| অগ্নির্বাগ্ভূত্বা | ... ১।২।৪ |
| আত্মা বা ইদমেক | ... ১।১।১ |
| এষ ব্রহ্মৈষ ইন্দ্র | ... ৩।১।৩ |
| কোহয়মাত্মেতি | ... ৩।১।৩ |
| তচ্চক্ষুষাজিঘৃক্ষৎ | ... ১।৩।৫ |
| তচ্ছিশেন্না | ... ১।৩।৯ |
| তচ্ছোত্রেণা | ... ১।৩।৬ |
| তৎত্বচা | ... ১।৩।৭ |
| তৎপ্রাণেনা | ... ১।৩।৪ |
| তৎস্ক্রিয়া আত্মভূয়ম্ | ... ২।১।২ |
| তদপানেনা | ... ১।৩।১০ |
| তদুষ্কমূষিণা | ... ২।১।৫ |
| তদেনদধিসৃষ্টম্ | ... ১।৩।৩ |
| তন্মনসাজিঘৃক্ষৎ | ... ১।৩।৮ |
| তমভ্যতপৎ | ... ১।১।৪ |
| তমশনায়া-পিপাসে | ... ১।২।৫ |
| তস্মাদিদন্দ্রো | ... ১।৩।১৪ |
| বাক্য। | অধ্যায়। | খণ্ড। | মন্ত্র। |
|---|---|---|---|
| কা এতা দেবতাঃ | ... | ১।২।১ | |
| তাভ্যো গামানয়ৎ | ... | ১।২।৩ | |
| তাভ্যঃ পুরুষমানয়ৎ | ... | ১।২।২ | |
| পুরুষে হবা অয়ম্ | ... | ২।১।১ | |
| যদেতদ্ধদয়ম্ | ... | ৩।১।২ | |
| স ইমাইল্লোকানসৃজত | ... | ১।১।২ | |
| স ঈক্ষত কথং ন্বিদম্ | ... | ১।৩।১১ | |
| স ঈক্ষতেমে নু লোকাঃ | ... | ১।১।৩ | |
| স ঈক্ষতেমে নু লোকাঃ | ... | ১।১।৩ | |
| স এতমেব সীমানম্ | ... | ১।৩।১২ | |
| স এতেন প্রজ্ঞেনাত্মনা | ... | ৩।১।৪ | |
| স এবং বিদ্বানস্মা | ... | ২।১।৫ | |
| স জাতো ভূতান্যভি | ... | ১।৩।১৩ | |
| স ভাবয়িত্রী | ... | ২।১।৩ | |
| সোহপোহভ্যতপৎ | ... | ১।৩।২ | |
| সোহস্যায়মাত্মা | ... | ২।১।৪ |
মন্ত্রসূচী সমাপ্ত।
, প্রথম অধ্যায়
বিষয় খণ্ড। মন্ত্র ১। সৃষ্টির পূর্ব্বে এক অদ্বিতীয় আত্মার অস্তিত্ব, এবং সেই আত্মায় (ব্রহ্মের) লোকসৃষ্টি বিষয়ে আলোচনা... ১।১ ২। লোকসিসৃক্ষু ব্রহ্মকর্তৃক অন্তঃ ও মরীচ প্রভৃতি চতুর্বিধ লোকের সৃষ্টি... ১।২ ৩। পুনর্ব্বার লোকপালসৃষ্টিবিষয়ে ঈক্ষণ ও জল হইতে পুরুষ- মূর্তি নির্মাণ... ১।৩ ৪। উক্ত পুরুষবিষয়ে ঈশ্বরের চিন্তা, এবং তদীয় চিন্তার ফলে ইন্দ্রিয় এবং তাহার অধিষ্ঠান(গোলক) ও দেবতাগণের উৎপত্তি ১।৪ ৫। সৃষ্ট দেবতাগণের ক্ষুধা-পিপাসাযোগ ও ভোগায়তন প্রার্থনা ২।৫ ৬। পরমেশ্বরকর্তৃক সেই দেবতাগণের নিকট ভোগায়তনরূপে গো-অশ্বাদি দেহ উপস্থাপন ও দেবতাগণ কর্তৃক তাহা প্রত্যাখ্যান ২।৩ ৭। অবশেষে মনুষ্যমূর্ত্তি দর্শনে আনন্দপ্রকাশ এবং পরমেশ্বরকর্তৃক তন্মধ্যে প্রবেশের আদেশ...... ২।৩ ৮। মুখাদি ইন্দ্রিয়স্থানে অগ্নি প্রভৃতি দেবতার প্রবেশ ২।৪ ৯। পরমেশ্বরের নিকট ক্ষুধা ও পিপাসা কর্তৃক ভোগ্যপ্রার্থনা এবং তদ্বিষয়ে ঈশ্বরকৃত ব্যবস্থা...... ২।৫ ১০। লোক ও লোকপালদিগের অন্নসৃষ্টি-বিষয়ে পরমেশ্বরের আলোচনা এবং পঞ্চভূত হইতে অন্নসমুৎপাদন ও ভক্ষকদর্শনে অন্নের পলায়নোদ্যম...... ৩।১—৩ ১১। পলায়মান অন্নকে ধরিবার জন্য দেবতাগণের বাক্প্রাণ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ব্যাপার দ্বারা গ্রহণের চেষ্টা ও নিষ্ফলতা; এবং অবশেষে অপানবায়ুর সাহায্যে গ্রহণ...... ৩।৪—১০ ১২। পরমেশ্বরের উক্ত দেহমধ্যে আত্মপ্রবেশের আবশ্যকতা চিন্তা ও প্রবেশের পথনিরূপণ এবং মুর্ধসীমা-পথে দেহমধ্যে প্রবেশ ৩।১১—১২
10
ওঁ বাঙ্মে মনসি প্রতিষ্ঠিতা মনো মে বাচি প্রতিষ্ঠিতমা- বিরাবীর্ম এধি। বেদস্য ম আণী স্থঃ শ্রুতং মে মা প্রহাসীঃ। অনেনাধীতেনাহোরাত্রানৎসন্দধাম্যতং বদিষ্যামি। সত্যং বদিষ্যামি। তন্মামবতু। তদ্বক্তারমবতু অবতু মামবতু বক্তারমবতু বক্তারম্ ॥
অথ শান্তিমন্ত্রার্থঃ।[অস্মিন্ উপনিষৎপাঠে প্রবৃত্তস্য] মে(মম) বাক্ (বাগিন্দ্রিয়ং) মনসি প্রতিষ্ঠিতা(মনোবৃত্ত্যনুগুণত্বেন অবস্থিতা)[ভবতু]। তথা মে(মম) মনঃ বাচি প্রতিষ্ঠিতং[ভবতু],(উপনিষৎপাঠে, তথারবধারণে চ মম বাঙ্মনসে পরস্পরামুগ্রহতন্ত্রে ভবতাম্ ইতি ভাবঃ)।
আবিঃ(স্বপ্রকাশম্ আত্ম-চৈতন্যম্); হে আবিঃ(চৈতনরূপিন্ আত্মন্) [ত্বং] যে(মদর্থৎ) আবীঃ(আবিঃ-আবির্ভূতম্) এধি(ভব)।[হে বাঙ্মনলে][যুবাম্] মে(মদর্থং) বেদস্য আণী(আনয়ন-সমর্থে) স্থঃ (ভবতম্)।[হে মনঃ, ত্বং], মে(মম) শ্রুতং(শ্রবণেন অবগতং গ্রন্থং তদর্থজাতঞ্চ) মা প্রহাসীঃ(ন পরিত্যজ-তন্মে বিস্মৃতং মা ভূদিত্যর্থঃ)। অনেন অধীতেন(গ্রন্থেন তদর্থেন চ, অধ্যয়নেন বা) অহোরাত্রান্(দিবারাত্রং) সন্দধামি(সংযোজয়ামি; অধ্যয়নেনৈব দিবারাত্রম্ অতিবাহয়েয়ম্)। ঋতং (বাচিকং সত্যং) বদিষ্যামি; সত্যং(মানসং সত্যং) বদিষ্যামি(পাঠকালে মনসা সত্যমর্থং সঙ্কল্প্য বাচাপি তথৈব অভিলপামি ইতি ভাবঃ)। তৎ(ময়া বক্ষ্যমাণং ব্রহ্ম) মাং(শিষ্যম্) অবতু(রক্ষতু, মমাধ্যয়ন বিঘ্নং বিনিহন্ত); তথা তৎ(ব্রহ্ম) বক্তারং(ব্যাখ্যাতারম্ আচার্য্যম্) অবতু(প্রবোধনসামর্থ্য-দানেন
পালয়তু)।[পুনরপি ফলপ্রাপ্তয়ে প্রার্থয়তে-] মাম অবতু(মমাজ্ঞানবিলাসঃ নশ্যতু ইতি ভাবঃ); তথা বক্তারম্(আচার্য্যমপি) অবতু(আচার্য্যস্থাপি বিদ্যাসপ্রদানতঃ পরিতোষঃ সম্ভবতু)।[‘অবতু বক্তারম্’ ইতি পুনরুক্তিঃ অধ্যায়সমাপ্ত্যর্থা] ॥ ১ ॥
মূলানুবাদ।[উপনিষৎপাঠকালে] আমার বাগিন্দ্রিয় মনে অবস্থিত হউক, আমার মনও বাগিন্দ্রিয়ে প্রতিষ্ঠিত হউক, অর্থাৎ আমার বাক্য ও মন পরস্পর সহানুভূতিসম্পন্ন হউক। হে স্বপ্রকাশ আত্মচৈতন্য, তুমিও আমার নিকট প্রকাশিত হও। হে বাক্য ও মনঃ, তোমরা আমার নিমিত্ত বেদ আনয়ন কর অর্থাৎ বেদগ্রহণ ও তাহার অর্থবোধে সমর্থ হও; আমার অধীত গ্রন্থ যেন আমি বিস্মৃত না হই; আমি যেন এই অধীত গ্রন্থের সহিত দিবারাত্রকে সংযোজিত করিতে পারি, অর্থাৎ দিবারাত্র যেন আমার অধ্যয়নের বিরাম না হয়। আমি সত্য কথা বলিব; আমি সত্য চিন্তা করিব; আমি যে ব্রহ্মবিদ্যা অধ্যয়ন করিব, সেই ব্রহ্ম আমাকে(শিষ্যকে) রক্ষা করুন; তিনি বক্তাকে-আচার্য্যকে রক্ষা করুন; আমাকে রক্ষা করুন; বক্তাকে রক্ষা করুন।
[ এই শান্তি-মন্ত্রটি এই উপনিষদের সপ্তমাধ্যায়ের শেষে পঠিত আছে; অধ্যায়শেষে পঠিত বাক্যের শেষাংশের দ্বিরুক্তি করিতে হয়; এইজন্য ‘অবতু বক্তারম্’ বাক্যটি দুইবার পঠিত হইয়াছে ॥]
- - -.
( প্রথমাধ্যায়ে-প্রথমঃ খণ্ডঃ)
আভাস-ভাষ্যম্।—ওঁ নমঃ পরমাত্মনে ॥ পরিসমাপ্তং কৰ্ম্ম সহাপর- ব্রহ্মবিষয়বিজ্ঞানেন। সৈষা কর্মণে। জ্ঞানসহিতস্য পরা গতিরুথবিজ্ঞানদ্বারে- ণোপসংহৃতা। এতৎ সত্যং ব্রহ্ম প্রাণাখ্যম্। এষ একো দেবঃ। এতস্যৈব প্রাণস্থ্য সর্ব্বে দেবা বিভুতয়ঃ। এতস্য প্রাণস্যাত্মভাবং গচ্ছন্ দেবতা অপ্যেতীত্যুক্তম্। সোহয়ৎ দেবতাপ্যয়লক্ষণঃ পরঃ পুরুষার্থঃ; এষ মোক্ষঃ। স চায়ং যথোক্তেন জ্ঞান-কর্মসমুচ্চয়েন সাধনেন প্রাপ্তব্যঃ, নাতঃ পরমস্তীত্যেকে প্রতিপন্নাঃ। তান্ নিরাচিকীর্ষু রুত্তরং কেবলাত্মজ্ঞানবিধানার্থম্ “আত্মা বা ইদম্” ইত্যাদ্যাহ ॥১
কথং পুনরকর্মসম্বন্ধি কেবলাত্মবিজ্ঞানবিধানার্থ উত্তরো গ্রন্থ ইতি গম্যতে? অন্যার্থানবগমাৎ। তথাচ পূর্ব্বোক্তানাং দেবানামগ্ন্যাদীনাং সংসারিত্বং দর্শয়িষ্যতি অশনায়াদিদোষবত্ত্বেন “তমশনায়াপিপাসাভ্যামন্ববার্জৎ” ইত্যাদিনা। অশনায়া- দিমৎ সর্ব্বং সংসার এব, পরস্য তু ব্রহ্মণোহশনায়াদ্যত্যয়শ্রুতেঃ। ভবত্বেবং কেবলাত্মজ্ঞানং মোক্ষসাধনম্, ন ত্বত্রাকর্ম্যেবাধিক্রিয়তে; বিশেষাশ্রবণাৎ। অকস্মিণ আশ্রম্যন্তরস্যেহাশ্রবণাৎ। কৰ্ম্ম চ বৃহতীসহস্রলক্ষণং প্রস্তুত্য অনন্তর- মেবাত্মজ্ঞানং প্রারভ্যতে। তস্মাৎ কর্ম্মেবাধিক্রিয়তে ॥২
ন চ কর্মাসম্বন্ধ্যাত্মবিজ্ঞানং, পূর্ব্ববদন্তে উপসংহারাৎ। যথা কৰ্ম্মসম্বন্ধিনঃ পুরুষস্য সূর্য্যাত্মনঃ স্থাবরজঙ্গমাদি সর্ব্বপ্রাণ্যাত্মত্বমুক্তং ব্রাহ্মণেন মন্ত্রেণ চ “সূর্য্য আত্মা” ইত্যাদিনা, তথৈব “এষ ব্রহ্মা এষ ইন্দ্রঃ” ইত্যাদিপক্রম্য সর্ব্ব- প্রাণ্যাত্মত্বম্। “যচ্চ স্থাবরং, সর্ব্বং তৎ প্রজ্ঞানেত্রম্” ইত্যুপসংহরিষ্যতি। তথাচ
সংহিতোপনিষদি “এতৎ হ্যেব বহ্বচো মহত্যুথে মীমাংসন্তে” ইত্যাদিনা কর্মসম্বন্ধিত্বমুক্তা “সর্ব্বেষু ভূতেষেতমেব ব্রহ্মেত্যাচক্ষতে” ইত্যুপসংহরতি। তথা তস্যৈব “যোহয়মশরীরঃ প্রজ্ঞাত্মা” ইত্যুক্তস্য “যশ্চাসাবাদিত্য একমেব তদিতি বিদ্যাৎ” ইত্যেকত্বমুক্তম্; ইহাপি “কোহয়মাত্মা” ইত্যুপক্রম্য প্রজ্ঞাত্মত্বমেব “প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম” ইতি দর্শয়িষ্যতি। তস্মান্নাকৰ্ম্মসম্বন্ধ্যাত্মজ্ঞানম্ ॥৩
পুনরুক্ত্যানর্থক্যমিতি চেৎ-“প্রাণো বা অহমস্থ্যষে” ইত্যাদি ব্রাহ্মণেন “সূর্য্য আত্মা” ইতি চ মন্ত্রেণ নির্ধারিতস্যাত্মন “আত্মা বা ইদম্” ইত্যাদিব্রাহ্মণেন “কোহয়মাত্মা” ইতি প্রশ্নপূর্ব্বকং পুনর্নিদ্ধারণং পুনরুক্তমনর্থকমিতি চেৎ; ন, তস্যৈব ধর্মান্তরবিশেষনির্ধারণার্থত্বান্ন পুনরুক্ততাদোষঃ। কথম? তস্যৈব কর্মসম্বন্ধিনো জগৎসৃষ্টিস্থিতি-সংহারাদিধর্মবিশেষনির্দ্ধারণার্থত্বাৎ কেবলোপাস্ত্য- র্থত্বাদ্বা; অথবা, আত্মেত্যাদিঃ পরো গ্রন্থসন্দর্ভ আত্মনঃ কর্ম্মিণঃ কর্ম্মণোহন্যত্রো- পাসনাপ্রাপ্তৌ কর্মপ্রস্তাবে বিহিতত্বাৎ কেবলোহপ্যাত্মোপাস্য ইত্যেবমর্থঃ। ভেদাভেদোপাস্যত্বাচ্চ “এক এবাত্মা” কৰ্ম্মবিষয়ে ভেদদৃষ্টিভাক্; স এবাকর্মকালে অভেদেনাপ্যুপাস্য ইত্যেবমপুনরুক্ততা ॥৪ “বিদ্যাঞ্চাবিদ্যাঞ্চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ। অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীর্ত্বা বিদ্যয়া- মৃতমশ্নুতে” ইতি, “কুর্ব্বন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতৎ সমাঃ” ইতি চ বাজিনাম্। ন চ বর্ষশতাৎ পরম্ আয়ুর্মন্ত্রানাং যেন কৰ্ম্মপরিত্যাগেনাত্মান- মুপাসীত। দর্শিতঞ্চ “তাবস্তি পুরুষায়ুষোহহাৎ সহস্রাণি ভবন্ত” ইতি। বর্ষ- শতঞ্চায়ুঃ কৰ্ম্মণৈব ব্যাপ্তম্। দর্শিতশ্চ মন্ত্রঃ “কুর্ব্বন্নেবেহ কর্মাণি” ইত্যাদিঃ; তথা “যাবজ্জীবমগ্নিহোত্রং জুহোতি” “যাবজ্জীবৎ দর্শপৌন্ন মাসাভ্যাং যজেত” ইত্যাদ্যাশ্চ; “তৎ যজ্ঞপাত্রৈর্দহন্তি” ইতি চ। ঋণত্রয়শ্রুতেশ্চ। তত্র হি পারি- ব্রাজ্যাদিশাস্ত্রং “ব্যুত্থায়াপ ভিক্ষাচর্য্যৎ চরস্তি” ইত্যাত্মজ্ঞানস্তুতিপরোহর্থবাদোহন- ধিকৃতার্থো বা ॥৫
ন, পরমার্থাত্মবিজ্ঞানে ফলাদর্শনে ক্রিয়ানুপপত্তেঃ-যদুক্তং কর্ম্মিণ এব চাত্মজ্ঞানং কর্মসম্বন্ধি চেত্যাদি, তন্ন; পরং হ্যাপ্তকামৎ সর্ব্বসংসারদোষবর্জিতং ব্রহ্মাহমম্মীত্যাত্মত্বেন বিজ্ঞানে, কৃতেন কর্তব্যেন বা প্রয়োজনম্ আত্মনোইপশ্যতঃ ফলাদর্শনে ক্রিয়া নোপপদ্যতে। ফলাদর্শনেহপি নিযুক্তত্বাৎ করোতীতি চেৎ; ন; নিয়োগাবিষয়াত্মদর্শনাৎ। ইষ্টযোগমনিষ্টবিয়োগং বাত্মনঃ প্রয়োজনং পশ্যন্ তদুপায়ার্থী যো ভবতি, স নিয়োগস্য বিষয়ো দৃষ্টো লোকে, ন তু তদ্বিপরীত- নিয়োগাবিষয়ব্রহ্মাত্মত্বদর্শী। ব্রহ্মাত্মত্বদৃশ্যপি সন্ চেন্নিযুজ্যেত, নিয়োগাবিষয়ো-
হপি সন্ন কশ্চিৎ ন নিযুক্ত ইতি সর্ব্বং কৰ্ম্ম সর্ব্বেণ সর্ব্বদা কর্তব্যৎ প্রাপ্নোতি, তচ্চানিষ্টম্ ॥৬ ন চ স নিযোক্তং শক্যতে কেনচিৎ; আম্নায়স্যাপি তৎপ্রভবত্বাৎ। ন হি স্ববিজ্ঞানোখেন বচসা স্বরং নিযুজ্যতে; নাপি বহুবিৎ স্বাম্যবিবেকিনা ভৃত্যেন আম্নায়স্য নিত্যত্বে এতি স্বাতন্ত্র্যাৎ সর্ব্বান্ প্রতি নিয়োক্ত্বসামর্থ্যমিতি চেৎ; ন, উক্তদোষাৎ। তথাপি সর্ব্বেণ সর্ব্বদা সর্ব্বমবিশিষ্টং কৰ্ম্ম কর্তব্যমিত্যুক্তো দোষোহপরিহার্য্য এব। তদপি শাস্ত্রেণৈব বিধীয়ত ইতি চেৎ-যথা কর্মকর্তব্যতা শাস্ত্রেণ কৃতা, তথা তদপ্যাত্মজ্ঞানং তস্যৈব কর্ম্মিণঃ শাস্ত্রেণ বিধীয়ত ইতি চেৎ; ন; বিরুদ্ধার্থবোধকত্বানুপপত্তেঃ। ন হ্যেকম্মিন্ কৃতাকৃতসম্বন্ধিত্বং তদ্বিপরীতত্বঞ্চ বোধয়িতুং শক্যম্, শীতোষ্ণত্বমিবাগ্নেঃ ॥৭ ন চেষ্টযোগচিকীর্ষা আত্মনোইনিষ্টবিয়োগচিকীর্ষা চ শাস্ত্রকৃতা, সর্ব্বপ্রাণিনাং তদ্দর্শনাৎ। শাস্ত্রকৃতঞ্চেৎ, তদুভয়ং গোপালাদীনাং ন দৃশ্যেত, অশাস্ত্রজ্ঞত্বাৎ তেযাম্। যদ্ধি স্বতোহপ্রাপ্তং, তচ্ছাস্ত্রেণ বোধয়িতব্যম্। তচ্চেৎ কৃত-কর্তব্যতা- বিরোধ্যাত্মজ্ঞানং শাস্ত্রেণ কৃতং, কথং তদ্বিরুদ্ধাং কর্তব্যতাং পুনরুৎপাদয়েৎ শীততামিবাগ্নৌ, তম ইব চ ভানৌ? ন বোধয়ত্যেবেতি চেৎ; ন; “স ম আত্মেতি বিদ্যাৎ প্রজ্ঞানৎ ব্রহ্ম” ইতি চোপসংহারাৎ। “তদাত্মানমেবাবেৎ তত্ত্বমসি” ইত্যেবমাদিবাক্যানাং তৎপরত্বাৎ। উৎপন্নস্য ব্রহ্মাত্মবিজ্ঞানস্যাবাধ্যমানত্বান্নানুৎপন্নং ভ্রান্তং বেতি শক্যং বক্তুম্ ॥৮ ত্যাগেহপি প্রয়োজনাভাবস্য তুল্যত্বমিতি চেৎ; “নাকৃতেনেহ কশ্চন” ইতি স্মৃতেঃ-য আহুর্ব্বিদিত্বা ব্রহ্ম ব্যুত্থানমেব কুৰ্য্যাৎ ইতি; তেষামপ্যেষ সমানো দোষঃ প্রয়োজনাভাব ইতি চেৎ; ন, অক্রিয়ামাত্রত্বাদ্ব্যুত্থানস্য। অবিদ্যানিমিতো হি প্রয়োজনস্য ভাবঃ, ন বস্তুধৰ্ম্মঃ, সর্ব্বপ্রাণিনাং তদ্দর্শনাৎ; প্রয়োজন-তৃষ্ণয়া চ প্রের্য্যমাণস্য বাষ্মনঃকায়ৈঃ প্রবৃত্তিদর্শনাৎ; “সোহকাময়ত জায়া মে স্যাৎ’ ইত্যাদিনা পুত্রবিত্তাদি পাঙ্ক্তলক্ষণং কাম্যমেবেতি উভে হোতে সাধ্য সাধনলক্ষণে এষণে এবেতি বাজসনেরিব্রাহ্মণেহবধারণাৎ ॥৯ অবিদ্যাকামদোষনিমিত্তায়া বাষ্মনঃকায়প্রবৃত্তেঃ পাঙক্তলক্ষণায়। বিদুষোহ- বিদ্যাদিদোষাভাবাদনুপপত্তেঃ ক্রিয়াভাবমাত্রং ব্যুত্থানম্, ন তু যাগাদিবদনু- ষ্ঠেয়রূপং ভাবাত্মকম্। তচ্চ বিদ্যাবৎপুরুষধৰ্ম্ম ইতি ন প্রয়োজনমন্বেষ্টব্যম্। ন হি তমসি প্রবৃত্তস্য উদিত আলোকে যদ্গর্ভপঙ্ককণ্টকাদ্যপতনম্, তৎ কিং- প্রয়োজনমিতি প্রশ্নার্হম্ ॥:০
ব্যুত্থানং তর্হ্যর্থপ্রাপ্তত্বান্ন চোদনার্হম্ ইতি। গার্হস্থ্যে চেৎ পরং ব্রহ্মবিজ্ঞানৎ জাতম্, তত্রৈবাস্তু অকুর্ব্বত আসনং ন ততোহন্যত্র গমনমিতি চেৎ; ন, কামপ্রযুক্তত্বাদগার্হস্থ্যস্য। “এতাবান্ বৈ কামঃ” ইতি, “উভে হোতে এষণে এব” ইত্যবধারণাৎ কামনিমিত্ত-পুত্রবিত্তাদিসম্বন্ধনিয়মাভাবমাত্রম্; ন হি ততোহন্যত্র গমনং ব্যুত্থানমুচ্যতে। অতো ন গার্হস্থ্য এবাকুর্ব্বত আসনমুৎপন্নবিদ্যস্য। এতেন গুরুশুশ্রূষাতপসোরপ্যপ্রতিপত্তির্ব্বিদুষঃ সিদ্ধা ॥১১
অত্র কেচিদগৃহস্থা ভিক্ষাটনাদিভয়াৎ পরিভবাচ্চ ত্রস্যমানাঃ সুক্ষ্মদৃষ্টিতাৎ দর্শয়ন্ত উত্তরমাহুঃ-ভিক্ষোরপি ভিক্ষাটনাদিনিয়মদর্শনাৎ দেহধারণমাত্রা- র্থিনো গৃহস্থস্যাপি সাধ্যসাধনৈষণোভয়বিনির্ম্মুক্তস্য দেহমাত্রধারণার্থমশনা- চ্ছাদনমাত্রমুপজীবতো গৃহ এবাস্ত্বাসনমিতি; ন স্বগৃহবিশেষপরিগ্রহনিয়মস্য কামপ্রযুক্তত্বাদিত্যুক্তোত্তরমেতৎ। স্বগৃহবিশেষাপরিগ্রহাভাবে চ শরীর- ধারণমাত্রপ্রযুক্তাশনাচ্ছাদনার্থিনঃ স্বপরিগ্রহবিশেষভাবেহর্থাদ্ভিক্ষুত্বমেব। শরীরধারণার্থায়াং ভিক্ষাটনাদিষু প্রবৃত্তৌ যথা নিয়মো ভিক্ষোঃ শৌচাধৌ চ, তথা গৃহিণোহপি বিদুষোহকামিনোহস্ত নিত্যকর্মসু নিয়মেন প্রবৃত্তির্্যাংজ্জীবাদি- শ্রুতিনিযুক্তত্বাৎ প্রত্যবায়পরিহারায়েতি। এতন্নিয়োগাবিষয়ত্বেন বিদুষঃ প্রত্যুক্তমশক্যনিযোজ্যত্বাচ্চেতি ॥২
যাবজ্জীবাদিনিত্যচোধনানর্থক্যমিতি চেৎ; ন, অবিদ্বদ্বিষয়ত্বেনার্থবত্ত্বাৎ। যত্তু ভিক্ষোঃ শরীরধারণমাত্রপ্রবৃত্তস্য প্রবৃত্তেনিয়তত্বম্, তৎ প্রবৃত্তেন প্রযোজকম্। আচমনপ্রবৃত্তস্য পিপাসাপগমবন্নান্যপ্রয়োজনার্থত্বমবগম্যতে। ন চাগ্নিহোত্রাদীনাৎ তদ্বদর্থপ্রাপ্তপ্রবৃত্তি নিয়তত্বোপপত্তিঃ।১৩
অর্থপ্রাপ্তপ্রবৃত্তিনিয়মোহপি প্রয়োজনাভাবেহনুপপন্ন এবেতি চেৎ; ন। তন্নিয়মস্য পূর্ব্বপ্রবৃত্তিসিদ্ধত্বাত্তদতিক্রমে যত্নগৌরবাদর্থপ্রাপ্তস্য ব্যুত্থানস্য পুন- র্ব্বচনাদ্বিদুষো মুমুক্ষোঃ কর্তব্যত্বোপপত্তিঃ ।১৪
অবিদুষাপি মুমুক্ষুণা পারিব্রাজ্যং কর্তব্যমেব; তথা চ “শান্তো দান্তঃ” ইত্যাদিবচনং প্রমাণম্; শমদমাদীনাঞ্চাত্মদর্শনসাধনানামন্যাশ্রমেঘনুপপত্তেঃ। “অত্যাশ্রমিভ্যঃ পরমং পবিত্রং প্রোবাচ সম্যগৃধিসঙ্ঘজুষ্টম্” ইতি চ শ্বেতাশ্বতরে বিজ্ঞায়তে। “ন কৰ্ম্মণা ন প্রজয়া ধনেন ত্যাগেনৈকে অমৃতত্বমানশুঃ” ইতি চ কৈবল্যশ্রুতিঃ। “জ্ঞাত্বা নৈষ্কর্ম্মমাচরেৎ” ইতি স্মৃতঃ। “ব্রহ্মাশ্রমপদে বসেৎ” ইতি চ ব্রহ্মচর্য্যাদিবিদ্যাসাধনানাঞ্চ সাকল্যেনাত্যাশ্রমিষূপপত্তের্গ, হস্থ্যেহসম্ভবাৎ ।১৫
ন চ অসম্পন্নং সাধনং ক্বচিদর্থস্য সাধনায়ালম্। যদ্বিজ্ঞানোপ-
যোগীনি চ গার্হস্থ্যাশ্রমকর্মাণি, তেষাং পরমফলমুপসংহৃতং দেবতাপ্যয়লক্ষণৎ সংসারবিষয়মেব। যদি কর্ম্মিণ এব পরমাত্মবিজ্ঞানমভবিষ্যৎ, সংসারবিষয়স্যৈব ফলস্যোপসংহারো নোপাপৎস্যত। অঙ্গফলং তদিতি চেৎ; ন, তদ্বিরোধ্যাত্ম- বস্তুবিষয়ত্বাদাত্মবিদ্যায়াঃ। নিরাকৃতসর্ব্বনামরূপকৰ্ম্ম-পরমার্থাত্মবস্তু-বিষয়- মাত্মজ্ঞানমমৃতত্বসাধনম্। গুণফলসম্বন্ধে হি নিরাকৃতসর্ব্ববিশেষাত্মবস্তু- বিষয়ত্বং জ্ঞানস্য ন প্রাপ্নোতি; তচ্চানিষ্টম্, “যত্র ত্বস্য সর্ব্বমাত্মৈবাভূৎ” ইত্যধিকৃত্য ক্রিয়া-কারক-ফলাদিসর্ব্বব্যবহারনিরাকরণাদ্বিদুষঃ; তদ্বিপরীতস্যাবিদুষঃ “যত্র হি দ্বৈতমিব ভবতি” ইত্যুক্তা ক্রিয়াকারকফলরূপস্য সংসারস্য দর্শিতত্বাচ্চ বাজসনেয়িব্রাহ্মণে। তথেহাপি দেবতাপ্যয়ৎ সংসারবিষয়ং যৎ ফলমশনায়াদি- মদ্বত্ত্বাত্মকম্, তদুপসংহৃত্য কেবলং সর্ব্বাত্মকবস্তুবিষয়ং জ্ঞানমমৃতত্বায় বক্ষ্যামীতি প্রবর্ততে।১৬
ঋণপ্রতিবন্ধশ্চাবিদুষ এব মনুষ্য-পিতৃ-দেবলোকপ্রাপ্তিং প্রতি, ন বিদুষঃ; “সোহয়ং মনুষ্যলোকঃ পুত্রেণৈব” ইত্যাদিলোকত্রয়সাধননিয়মশ্রুতেঃ। বিদুষশ্চ ঋণপ্রতিবন্ধাভাবো দর্শিত আত্মলোকার্থিনঃ “কিং প্রজয়া করিষ্যামঃ” ইত্যাদি- দিনা। তথা “এতদ্ধ স্ম বৈ তদ্বিদ্বাৎস আহুর্ঋষয়ঃ কাবষেয়াঃ” ইত্যাদি, “এতদ্ধ স্ম বৈ তৎ পূর্ব্বে বিদ্বাৎসোহগ্নিহোত্রং ন জুহবাঞ্চক্রুঃ” ইতি চ কৌষী- তকিনাম্।১৭
অবিদুষস্তহি ঋণানপাকরণে পারিব্রাজ্যানুপপত্তিরিতি চেৎ; ন, প্রাগ্- গার্হস্থ্যপ্রতিপত্তেঋণিত্বাসম্ভবাৎ; অধিকারানারূঢ়োহপি ঋণী চেৎ স্যাৎ, সর্ব্বস্য ঋণিত্বসিত্যনিষ্টং প্রসজ্যেত। প্রতিপন্নগার্হস্থ্যস্যাপি “গৃহাদ্বনী ভূত্বা প্রব্রজেৎ যদি বেতরথা ব্রহ্মচর্য্যাদেব প্রব্রজেদ্গৃহাদ্বা বনাদ্বা” ইতি আত্মদর্শনোপায়- সাধনত্বেনৈষ্যত এব পারিব্রাজ্যম্। যাবজ্জীবাদিশ্রুতীনামবিদ্বদমুমুক্ষবিষয়ে কৃতার্থতা। ছান্দ্যোগ্যে চ কেষাঞ্চিদ্ দ্বাদশরাত্রমগ্নিহোত্রং হুত্বা তত ঊর্দ্ধং পরিত্যাগঃ ক্রয়তে। ১৮
যত্ত্বনধিকৃতানাং পারিব্রাজ্যমিতি; তন্ন, তেষাৎ পৃথগেব “উৎসন্নাগ্নি- রনগ্নিকো বা” ইত্যাদিশ্রবণাৎ সর্ব্বস্মৃতিষু চাবিশেষেণাশ্রমবিকল্পঃ প্রসিদ্ধঃ, সমুচ্চয়শ্চ। যত্তু বিদুষোহর্থপ্রাপ্তং ব্যুত্থানমিত্যশাস্ত্রার্থত্বে, গৃহে বনে বা তিষ্ঠতো ন বিশেষ ইতি; তদসৎ; ব্যুত্থানস্যৈবার্থপ্রাপ্তত্বান্নান্যত্রাবস্থানং স্যাৎ। অন্যত্রাবস্থানস্থ্য কামকৰ্ম্মপ্রযুক্তত্বং হ্যবোচাম; তদভাবমাত্রং ব্যুত্থানমিতি চ।১৯
যথাকামিত্বন্তু বিদুষোহত্যন্তমপ্রাপ্তম্ অত্যন্তমূঢ়বিষয়ত্বেনাবগমাৎ। তথা শাস্ত্রবিহিতমপি কর্মাত্মবিদোহপ্রাপ্তং গুরুভারতয়াবগম্যতে; কিমুতা- ত্যন্তাবিবেকনিমিত্তং যথাকামিত্বম্? ন হান্মাদতিমিরদৃষ্ট্যুপলব্ধং বস্তু তদপগমেহপি তথৈব স্যাৎ, উন্মাদতিমিরদৃষ্টিনিমিত্তত্বাদেব তস্য। তস্মা- দাত্মবিদো ব্যুত্থানব্যতিরেকেণ ন যথাকামিত্বম্, ন চান্যৎ কর্তব্যমিত্যেতৎ সিদ্ধম্। ২০
যতু “বিদ্যাঞ্চাবিদ্যাঞ্চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ” ইতি ন বিদ্যাবতো বিদ্যয়া সহাবিদ্যাপি বর্তত ইত্যয়মর্থঃ; কস্তহি? একস্মিন্ পুরুষে এতে ন সহ সম্বধ্যেয়াতামিত্যর্থঃ; যথা শুক্তিকায়াৎ রজত-শুক্তিকাজ্ঞানে একস্য পুরুষস্য। “দুরমেতে বিপরীতে বিষুচী অবিদ্যা যা চ বিদ্যেতি জ্ঞাতা” ইতি হি কাঠকে। তস্মান্ন বিদ্যায়াৎ সত্যামবিদ্যায়াঃ সম্ভবোহস্তি। “তপসা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসস্ব” ইত্যাদি- শ্রুতেঃ। তপআদি বিদ্যোৎপত্তিসাধনং গুরূপাসনাদি চ কৰ্ম্মবিদ্যাত্মকত্বাদ- বিদ্যোচ্যতে; তেন বিদ্যামুৎপাদ্য মৃত্যুৎ কামমতিতরতি। ততো নিষ্কাম- স্ত্যক্তৈষণো ব্রহ্মবিদ্যয়ামৃতত্বমশ্নুত ‘ইত্যেতমর্থং দর্শয়ন্নাহ-“অবিদ্যয়া মৃত্যুন্তীত্বা বিদ্যয়ামৃতমশ্নুতে”।২১ যত্তু পুরুষায়ুঃ সর্ব্বং কর্মণৈব ব্যাপ্তম্ “কুর্ব্বন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিযেচ্ছতৎ সমাঃ” ইতি, তদবিদ্বদ্বিষয়ত্বেন পরিহৃতম্, ইতরণাহসম্ভবাৎ। যত্তু বক্ষ্যমাণ- মপি পূর্ব্বোক্ত-তুল্যত্বাৎ কৰ্ম্মণা অবিরুদ্ধমাত্মজ্ঞানমিতি, তৎ সবিশেষ-নির্বিশেষাত্ম- বিষয়তয়া প্রত্যুক্তম্; উত্তরত্র ব্যাখ্যানে চ দর্শয়িষ্যামঃ। অতঃ কেবলনিষ্ক্রিয়- ব্রহ্মাত্মৈকত্ববিদ্যা প্রদর্শনার্থমুত্তরো গ্রন্থ আরভ্যতে—
আভাস-ভাষ্যানুবাদ।—ওঁ উচ্চারণ পূর্ব্বক পরমাত্মাকে প্রণাম করিতেছি। অপর-ব্রহ্মবিষয়ক নিশ্চয়াত্মক জ্ঞানলাভের সঙ্গে সঙ্গে কর্ম্ম অনুষ্ঠানের প্রয়োজন শেষ হইয়াছে। জ্ঞানের সহিত অনুষ্ঠিত কর্ম্মের যাহা পরম গতি বা সর্বোৎকৃষ্ট ফল, তাহাও উকথ-বিজ্ঞানের নিরূপণপ্রসঙ্গে বর্ণিত হইয়াছে। ইহাই ‘সত্য’ ব্রহ্ম, যাহার নাম প্রাণ। ইনিই(প্রাণই) শ্রেষ্ঠ দেবতা। অপর দেবতাগণ এই দেবতারই বিভূতি বা মহিমাস্বরূপ। যে লোক এই প্রাণাত্মভাব লাভ করেন, তিনিই দেবতাকে প্রাপ্ত হন(প্রাণস্বরূপ হন), এই সমুদয় কথা সেখানে উক্ত হইয়াছে। এই যে, প্রাণ-দেবতাতে বিলয় বা একীভাবপ্রাপ্তি, ইহাই জীবনের পরম পুরুষার্থ; ইহাই মোক্ষ। উল্লিখিত এই মোক্ষ ফলটি এক সঙ্গে অনুষ্ঠিত জ্ঞান ও কর্ম্মরূপ সাধন দ্বারা পাইতে হইবে; ইহার অধিক প্রাপ্তব্য আর কিছু
নাই; যাহারা এই প্রকার বিকৃত জ্ঞানসম্পন্ন, তাহাদিগের ভ্রম দূর করার জন্য অতঃপর কর্মরহিত কেবল আত্মজ্ঞান-বিধানের জন্য ‘আত্মা বা ইদম্’ ইত্যাদি পরবর্তী গ্রন্থ আরম্ভ করা হইতেছে—।১
ভাল, পরবর্তী গ্রন্থ যে কর্মসম্পর্কশূন্য কেবলই আত্মজ্ঞানের বিধানার্থ আরম্ভ করা হইতেছে, তাহা জানা যায় কিরূপে?[উত্তর-] যেহেতু উহার অন্য প্রকার অর্থ বা উদ্দেশ্য জানা যায় না; বিশেষতঃ “তম্ অশনায়াপিপাসাভ্যাম্ অন্ববার্জৎ” ইত্যাদি বাক্যে অশনায়া(ভোজনেচ্ছা-ক্ষুধা) প্রভৃতি দোষ প্রদর্শন দ্বারা পূর্ব্বোক্ত অগ্নিপ্রভৃতি দেবতাগণের সংসারিত্ব ফলও প্রদর্শন করিবেন। ‘পরব্রহ্ম ক্ষুধা-পিপাসার অতীত’ এই শ্রুতিবাক্য হইতে বুঝিতে পারা যায় যে, ক্ষুধা ও পিপাসাদি ধর্ম বা গুণসমূহ সংসারেরই অন্তর্গত। ভাল, কর্মরহিত কেবল আত্মজ্ঞান মোক্ষ-সাধন হয় হউক, তথাপি একমাত্র কৰ্ম্মত্যাগী লোকই যে ইহাতে অধিকারী হইবে, একথা ত বলা যাইতে পারে না; যেহেতু এ বিষয়ে কোনও বিশেষ উক্তি নাই; অর্থাৎ কর্মহীন অপর আশ্রমীর সম্বন্ধে কোন বিশেষ কথা ত এখানে নাই। বিশেষতঃ এই ব্রাহ্মণেও ‘বৃহতীসহস্র’ নামক কর্মের অবতারণা করিয়া, তাহার ঠিক পরেই আত্মজ্ঞানের কথা আরম্ভ করা হইয়াছে। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, কর্মী পুরুষই এই আত্ম-বিদ্যায় অধিকারী (কর্মত্যাগী নহে)।২
আর কর্মের সহিত যে আত্মজ্ঞানের একেবারেই সম্বন্ধ নাই, তাহাও বলিতে পারা যায় না; কারণ, পূর্ব্বের ন্যায় এখানেও কর্মকাণ্ডের শেষেই[আত্মজ্ঞানের] উপসংহার করা হইয়াছে;[আত্মজ্ঞানের সহিত কর্মের সম্বন্ধ না থাকিলে, এরূপ উপসংহার করা সঙ্গত হইত না]। পূর্ব্বে যেমন, সূর্যাত্মভাবাপন্ন(সূর্য্যের স্বরূপপ্রাপ্ত) কর্মী পুরুষকে স্থাবরজঙ্গমাত্মক সমস্ত প্রাণীর আত্মস্বরূপ বলিয়া মন্ত্র ও ব্রাহ্মণভাগে “সূর্য্য আত্মা” ইত্যাদি বাক্যে বলা হইয়াছে, এখানেও ঠিক সেই প্রকারই ‘ইনিই ব্রহ্ম, ইনিই ইন্দ্র’ ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ের উপক্রমের পর[উপাসককে] সর্ব্বপ্রাণীর আত্মভাবাপন্ন বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, এবং পরেও, ‘যাহা স্থাবর পদার্থ, তাহা প্রজ্ঞানেত্র, অর্থাৎ প্রজ্ঞা- শব্দবাচ্য ব্রহ্মকর্তৃক পরিচালিত’ এই বলিয়া প্রকরণের উপসংহার করা হইবে। এইরূপ ঐতরেয় সংহিতার অন্তর্গত উপনিষদেও ‘ঋগ্বেদী পণ্ডিতগণ ইহাকেই মহা-উকৃথে সিদ্ধান্ত করিয়া থাকেন’ ইত্যাদি বাক্যে আত্মার কর্মসম্বন্ধিতা প্রতি- পাদন করিয়া, পরে আবার, ‘ইহাকেই সমস্ত ভূতের অভ্যন্তরে অবস্থিত
ব্রহ্ম বলিয়া থাকেন’ এইরূপে বাক্যের উপসংহার করিয়াছেন। এই প্রকার ‘এই যে শরীরসম্বন্ধহীন প্রজ্ঞাত্মা’-এই বাক্যে[পূর্ব্বে যাহার কথা উক্ত হইয়াছে], তাহারই উপক্রম বা উল্লেখ করিয়া, পশ্চাৎ ‘এবং ঐ যে আদিত্য, উভয়কেই এক বলিয়া জানিবে’ এই বাক্যে উভয়ের একত্ব বা অভিন্নভাব বলা হইয়াছে। পূর্ব্বের ন্যায় এখানেও ‘এই আত্মা বস্তুটি কি?‘-এইরূপে প্রশ্ন করিয়া ‘ব্রহ্ম প্রজ্ঞাস্বরূপ’ বলিয়া আত্মারই প্রজ্ঞাত্মভাব প্রদর্শন করিবেন। অতএব এই আত্মবিদ্যা কখনই কর্মসম্বন্ধশূন্য হইতে পারে না।৩ যদি বল, আত্মবিদ্যা কর্মসম্বদ্ধ হইলে, তাহা ত পূর্ব্বেই কথিত হইয়াছে; [এখানে তাহার] পুনরুক্তি করা নিরর্থক হইয়া পড়ে? অভিপ্রায় এই যে, ‘প্রাণস্বরূপে আমি স্পর্শ করিয়াছি’ ইত্যাদি ব্রাহ্মণবাক্যে, এবং ‘সূর্য্যই [স্থাবর-জঙ্গমের] আত্মা’ ইত্যাদি মন্ত্রে, যে আত্মা নির্ধারিত হইয়াছে, এখানে আবার “আত্মা বৈ ইদম্” ইত্যাদি ব্রাহ্মণ বাক্যে যদি “কোহয়ম্ আত্মা” ইত্যাদি প্রশ্নপূর্ব্বক আবার সেই আত্মারই স্বরূপ নির্ধারণ করা হইয়া থাকে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই পুনরুক্তি দোষ ঘটিত; কিন্তু এখানে সেরূপ পুনরুক্তির কোনও প্রয়োজনই নাই। উত্তর এই যে-না, তাহা বৃথা পুনরুক্তি নহে; কেন না, পূর্ব্বে যে আত্মার সম্বন্ধে কথা বলা হইয়াছে, এখানে তাহারই বিশেষ ধর্মগুলির নির্ধারণার্থ পুনরুক্তি করা হইয়াছে; সুতরাং এরূপ পুনরুক্তি দোষাবহ নহে। কি প্রকার? পূর্ব্বোক্ত কর্মসম্বন্ধী আত্মারই যে সৃষ্টি-স্থিতি-সংহারাদি আরও ধর্ম আছে, সে সমুদায় স্থির করিবার জন্য কিংবা কেবলই আত্মোপাসনার নিরূপণের জন্য প্রকরণ আরম্ভ হওয়ায় এখানে পুনরুক্তি দোষের হইতেছে না। অভিপ্রায় এই যে, আত্মা যখন কর্ম্মের সহিত সংসৃষ্ট, তখন কর্মসম্বন্ধ ভিন্ন অর্থাৎ কর্মাদরূপে বিহিত উপাসনা ভিন্ন আত্মার উপাসনাই সম্ভবপর হইতে পারে না; এমত অবস্থায়, কর্মপ্রস্তাবে বিহিত নয় বলিয়া কর্মসম্বন্ধশূন্য- রূপেও যে আত্মার উপাসনা হইতে পারে, এই অভিপ্রায় জানাইবার জন্যই ‘আত্মা বৈ’ ইত্যাদি পরবর্তী গ্রন্থ আরম্ভ হইয়াছে বলিতে পারা যায়(১)। বিশেষতঃ ভেদাভেদরূপে উপাস্য বলিয়াও উল্লিখিত দোষ ঘটিতে পারে না,
—একই আত্মা কর্মানুষ্ঠান বিষয়ে ভেদদৃষ্টির বিষয় হয়, অর্থাৎ ভিন্নভাবে আরাধনীয় হয়, আবার সেই আত্মাই অকর্ম্মের সময়ে অভিন্নভাবেও(‘অহং’ রূপেও) উপাস্য হইয়া থাকে; এই ভাবে পুনরুক্তি হইতেছে না। ৪
[অতঃপর কর্মত্যাগপক্ষে শ্রুতিবিরোধ প্রদর্শন করিতেছেন-] বাজসনেয়ি উপনিষদে কথিত আছে-‘যে ব্যক্তি বিদ্যা ও অবিদ্যা, এই উভয়কে একসঙ্গে অবগত হন, তিনি অবিদ্যা দ্বারা মৃত্যুভয় অতিক্রম করেন, এবং অবশেষে বিদ্যার সাহায্যে অমৃতত্ব লাভ করেন।’ ‘ইহলোকে কর্মানুষ্ঠান করিয়াই শত বৎসর বাঁচিতে চাহিবে।’ একশত বৎসরের অধিক ত আয়ু হইতে পারে না, যে, শত বৎসর কর্মানুষ্ঠানের পরও কর্মত্যাগ করিয়া অর্থাৎ সন্ন্যাসী হইয়া -আত্মার উপাসনা করিবে। অন্যত্র প্রদর্শিতও হইয়াছে যে, ‘পুরুষের আয়ুষ্কালের দিবস সংখ্যা তত সহস্র অর্থাৎ ছয়ত্রিশ হাজার(৩৬০০০) হইয়া থাকে’(২)। সেই একশত বৎসর আয়ুর সময় ত কৰ্ম্ম দ্বারাই ব্যাপ্ত রহিল। একশত বৎসর যে কৰ্ম্ম করিতেই হইবে, সে বিষয়ে ‘কুর্ব্বন্নেবেহ কর্মাণি’ ইত্যাদি মন্ত্রবাক্য, এবং ‘যাবজ্জীবন অগ্নিহোত্র হোম করিবে’ ‘যাবজ্জীবন দর্শপৌর্ণমাস যাগ করিবে’ ইত্যাদি
বাক্য প্রদর্শিত হইয়াছে। আরও আছে—‘সেই পুরুষকে যজ্ঞপাত্রের সহিত দগ্ধ করিবে’ ইত্যাদি। তিনপ্রকার ঋণবোধক শ্রুতিও এপক্ষে অপর প্রমাণ(৩)। তবে যে সন্ন্যাসবিধায়ক ‘এষণাত্রয় হইতে নিবৃত্ত হইয়া, অনন্তর ভিক্ষাচর্য্য আচরণ করিবে, অর্থাৎ সন্ন্যাস গ্রহণ করিবে’, ইত্যাদি শাস্ত্র আছে, তাহা কেবল আত্মজ্ঞানের প্রশংসাপ্রকাশক স্তুতিমাত্র; অথবা যাহাদের কর্মানুষ্ঠানের অধিকার নাই—অন্ধ, পঙ্গু প্রভৃতি, শাস্ত্র তাহাদের জন্যই সন্ন্যাস বিধান করিতেছে, কিন্তু কর্মক্ষমদিগের সন্ন্যাস বিধানের জন্য নহে।৫[অতঃপর ভাষ্যকার নিজের সিদ্ধান্ত বলিতেছেন যে,] না, এ কথা হইতে পারে না; কারণ, যথার্থ আত্মজ্ঞান উপস্থিত হইলে, কোন ফলই তাহার প্রার্থনীয় থাকিতে পারে না; সুতরাং সেজন্য ক্রিয়াতেও প্রবৃত্তি হইতে পারে না। অভিপ্রায় এই যে, তুমি যে বলিয়াছ, আত্মজ্ঞান কর্মীর পক্ষেই বিহিত এবং কর্মের সহিত সংসৃষ্টও বটে ইত্যাদি, তাহা সঙ্গত নহে; কারণ, ‘আমি হইতেছি-আপ্তকাম সংসারের সর্ব্ববিধ দোষবর্জিত ব্রহ্মস্বরূপ,’ এই প্রকার আত্মজ্ঞান জন্মিলে পর, সে ব্যক্তি কৃত বা কর্তব্য কৰ্ম্ম দ্বারা আপনার লভ্য কোনও ফল দেখিতে পায় না। যে লোক ক্রিয়াতে কোনপ্রকার ফল দর্শন করে না, তাহার পক্ষে ক্রিয়ানুষ্ঠান সম্ভবপরই হয় না। যদি বল, ফল দর্শন না থাকিলেও শাস্ত্র যখন তাহাকে কর্মে নিযুক্ত করিতেছে, তখন তাহাকে অবশ্যই কর্ম করিতে হইবে। না, সে কথাও বলিতে পার না; কেন না, সে যে আত্মার সাক্ষাৎকার লাভ করিয়াছে, সে আত্মা ত কখনও নিয়োগের বিষয়ীভূত নহে অর্থাৎ সে আত্মাকে কখনও কোন কর্মে নিযুক্ত করা যায় না। যে লোক ইষ্টলাভ ও অনিষ্টের অভাব দর্শন করে, সেই লোকই তাহার উপযুক্ত উপায়ের প্রার্থী হইয়া থাকে, এবং সেই প্রকার লোককেই জগতে নিয়োগের বিষয়ীভূত হইতে দেখা যায়; কিন্তু তদ্বিপরীত-নিয়োগের অবিষয়ীভূত ব্রহ্মাত্মদর্শী পুরুষকে নিয়োগের বিষয় হইতে কখনও দেখা যায়
না। পক্ষান্তরে, নিয়োগের অযোগ্যকেও যদি নিযুক্ত বলিয়া ধরা হয়, তাহা হইলে ত নিয়োগের অবিষয়(অযোগ্য) অর্থাৎ অনিযোজ্য হইলেও, কোন ব্যক্তিকেই ‘অনিযুক্ত’ বলিয়া নির্দেশ করিতে পারা যায় না; সুতরাং সকলকেই নিযুক্ত মনে করিতে হয়। তাহার ফলে সকলের পক্ষেই সর্ব্বদা সকল কর্ম্ম অবশ্যকর্তব্য হইয়া পড়ে; তাহা ত কাহারও অভিলষিত নহে। ৬
বিশেষতঃ সেরূপ আত্মাকে কেহ কর্মানুষ্ঠানে নিয়োগ করিতেও পারে না; কেন না, নিয়োগকর্তা স্বয়ং বেদও তাহা হইতেই(চিদ্রূপ আত্মা হইতেই) সমুৎপন্ন; সুতন্নাৎ আত্মবিজ্ঞানের ফলস্বরূপ বেদবাক্য কখনই আত্মাকে নিয়োজিত করিতে পারে না। বিবেক-বিচারবিহীন ভৃত্য কখনই বহুবিষয়ে অভিজ্ঞ প্রভুকে আদেশ করিতে পারে না। যদি বল, বেদ যখন নিত্য(কাহারও দ্বারা রচিত নহে), তখন সকলের উপরই তাহার স্বাতন্ত্র্য(প্রভুত্ব) থাকিতে পারে? না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, এ পক্ষে, যে দোষ ঘটে, তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে,-তাহা হইলেও, বিহিত কৰ্ম্মমাত্রই যে একই ভাবে সকলের পক্ষেই অবশ্যকর্তব্য হইয়া পড়ে, পূর্ব্বে যে এই দোষ উক্ত হইয়াছে, সে দোষের ত নিশ্চয়ই পরিহার হইল না(তাহা রহিয়াই গেল)। যদি বল, ঐরূপ অসঙ্গত ব্যবস্থা ত শাস্ত্র দ্বারাই বিহিত, অর্থাৎ শাস্ত্র যেমন কর্মানুষ্ঠানের বিধান করিয়াছেন, তেমনই কর্মী পুরুষের জন্য আত্মজ্ঞানেরও বিধান করিয়াছেন;[সুতোাৎ শাস্ত্রোক্ত বিষয়ে দোষক্ষেপ করা সম্ভব হয় না।] না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, শাস্ত্র কখনই বিরুদ্ধার্থ বুঝাইতে পারে না; কেন না, একই পুরুষের পক্ষে কৃতাকৃত-সম্বন্ধ অর্থাৎ অনুষ্ঠান ও অননুষ্ঠানযোগ এবং তাহার বিপরীতভাব কখনই উপদেশ হইতে পারে না,-যেমন অগ্নির শীতোষ্ণভাবের উপদেশ, ৭
বিশেষতঃ আত্মার যে অভীষ্টপ্রাপ্তির ও অনিষ্টত্যাগের ইচ্ছা হয়, তাহা শাস্ত্রদ্বারা সৃষ্ট নহে;[উহা স্বাভাবিক]; যেহেতু উহা সর্ব্বপ্রাণীর সাধারণ ধৰ্ম্ম। ইষ্টপ্রাপ্তি ও অনিষ্ট ত্যাগের ইচ্ছা যদি শাস্ত্রজনিতই হইত, তাহা হইলে [শাস্ত্রজ্ঞানশূন্য] গোপালকদিগের সম্বন্ধে উহা কখনই দৃষ্ট হইত না; কারণ, তাহারা ত শাস্ত্রজ্ঞ নহে।[প্রকৃত কথা এই যে,] যাহা স্বভাবপ্রাপ্ত নয়, (উপদেশ-সাপেক্ষ), শাস্ত্র তাহাই বুঝাইয়া দিবে। অতএব শাস্ত্র যদি কর্ম্মের প্রয়োজনীয়তার বিরোধী আত্মজ্ঞানের উপদেশ করিয়া থাকে, তাহা হইলে সেই শাস্ত্রই আবার তাহার বিরোধী—অগ্নিতে শীতলতা ও সূর্য্যে অন্ধকারের সদ্বাক প্রতিপাদনের ন্যায় কর্মানুষ্ঠানের আবশ্যকতা প্রতিপাদন(যুক্তিদ্বারা বুঝান)
করিবে কি প্রকারে? যদি বল, শাস্ত্র নিশ্চয়ই যে ঐরূপ বিরুদ্ধভাব প্রতিপাদন করিতেছে, না, তাহা নহে; কারণ, উপসংহার স্থলে কথিত— ‘ব্রহ্ম প্রজ্ঞানস্বরূপ’, ‘তাহাই আমার আত্মা, এইরূপে জানিবে’ ইত্যাদি। ‘সেই আত্মাকেই জানিবে’, ‘তুমি সেই ব্রহ্মস্বরূপ’, এই জাতীয় বেদান্তবাক্য সমূহের ঐরূপ অর্থেই তাৎপর্য্য। বিশেষতঃ একবার উৎপন্ন ব্রহ্মাত্মবিজ্ঞান যখন অপর কোনও জ্ঞান দ্বারা বাধা প্রাপ্ত হয় না, অর্থাৎ অসত্য বলিয়া প্রতিপন্ন হয় না, তখন ঐরূপ জ্ঞান যে উৎপন্ন হয় না, অথবা ভ্রমাত্মক, তাহাও বলিতে পারা যায় না।৮
যদি বল,[আত্মজ্ঞের প্রয়োজন নাই বলিয়া যেরূপ কর্মপ্রবৃত্তির অসম্ভব, তদ্রূপ] কৰ্ম্মত্যাগেও ত তাহার কোন প্রয়োজন নাই; সুতরাং অপ্রবৃত্তির কারণ উভয় পক্ষেই সমান। কারণ, স্মৃতিতে(ভগবদ্গীতায় উক্ত) আছে-‘কর্মত্যাগেও জ্ঞানীর কোন প্রয়োজন নাই‘। অতএব যাহারা বলেন-ব্রহ্মজ্ঞানের পর ব্যুত্থানই(কর্মত্যাগ) করিতে হইবে, তাহাদের পক্ষেও প্রয়োজনাভাবরূপ দোষ সমানই রহিয়াছে; না, সেকথা বলিতে পার না; কারণ, ‘ব্যুত্থান’ কথার অর্থ-অক্রিয়া-ক্রিয়ানিবৃত্তিমাত্র(কিন্তু কোন প্রকার অনুষ্ঠান নহে)। তাহার পর, প্রয়োজনের যে সম্ভাববোধ অর্থাৎ প্রয়োজন আছে বলিয়া বোধ, তাহাও অবিদ্যারই ফল, উহা কখনই বস্তুধৰ্ম্ম বা বস্তুস্বভাব নহে; কারণ, প্রত্যেক প্রাণীতেই প্রয়োজনবৃদ্ধি দেখা যায়। বিশেষতঃ প্রয়োজনের প্রলোভনে প্রলুব্ধ লোকেরই কায়িক বাচিক ও মানসিক কৰ্ম্ম-প্রবৃত্তি দেখা যায়। বাজসনেয়ি ব্রাহ্মণে-‘সেই আদি পুরুষ কামনা করিয়াছিলেন যে, আমার জয় হউক’ ইত্যাদি বাক্যে স্থির হইয়াছে যে, পুত্র, বিত্ত প্রভৃতি পাঙক্ত(১) কর্মগুলি নিশ্চয়ই কায্য কৰ্ম্ম। এষণা বা কামনা কেবল দুইপ্রকার; এক সাধ্য-ফলবিষয়ক, অপর সাধন-বিষয়ক ইত্যাদি।৯
আত্মজ্ঞ পুরুষের অবিদ্যাদি দোষ বিনষ্ট হইয়া যায়; সুতরাং অবিদ্যা ও কামাদিদোষ হইতে উৎপন্ন পাঙ্ক্ত বৰ্ম্ম-বাক্ মনঃ ও শরীরের প্রবৃত্তি, কখনই
তাহার পক্ষে সম্ভবপর হয় না; সেই কারণেই ‘ব্যুত্থান’ কথার অর্থ—শুদ্ধ ক্রিয়ার অভাবমাত্র, কিন্তু যজ্ঞ ইত্যাদির ন্যায় অনুষ্ঠানযোগ্য কোনও ভাব পদার্থ (বস্তু) নহে। উক্ত ক্রিয়ার অভাবস্বরূপ ব্যুত্থান হইতেছে বিদ্বান্ পুরুষের স্বাভাবিক ধর্ম্ম; অতএব তাহার জন্য অন্য কোনরূপ প্রয়োজনের অন্বেষণ করা আবশ্যক হয় না। অন্ধকারে গমনকারী ব্যক্তির আলোক লাভ হইলে যে গর্ত্ত, পঙ্ক ও কণ্টকাদিতে পতন হয় না, তাহাতেও কি ‘কেন পতন হয় না’ এই প্রশ্ন উঠিতে পারে?১০
ভাল কথা, ব্যুত্থান যদি স্বাভাবিক ধর্মই হয়, তাহা হইলে, সে বিষয়ে ত বিধিও আবশ্যক হয় না; অথচ ব্যুত্থানবিষয়ে যদি কোন বিধিই না থাকে, তাহা হইলে গার্হস্থ্যাশ্রমেই যাহার ব্রহ্মবিষয়ক তত্ত্বজ্ঞান জন্মিয়াছে, তাহার গৃহস্থাশ্রমেই নিষ্ক্রিয় অবস্থায় অবস্থান করা উচিত, অন্যত্র(সন্ন্যাসে) যাইবার প্রয়োজন কি? একথা যদি বল, তদুত্তরে বলিতেছি যে, না, তাহা বলিতে পার না; যেহেতু গার্হস্থ্যাশ্রম গ্রহণ করা হইতেছে কাম্য(কামনার অধীন), অর্থাৎ যাহার হৃদয়ে কামনা আছে, গার্হস্থ্যাশ্রম তাহারই জন্য, নিষ্কামের জন্য নহে। ‘এই পর্যন্ত কামনার বিষয়’ ‘কেবল এই দুই প্রকারই এষণা’ এইরূপ স্থিরনিশ্চয় থাকায় বুঝা যাইতেছে যে, কামনাহেতু যে পুত্র-বিত্তাদির সম্বন্ধ (আমার পুত্র, আমার বিত্ত ইত্যাকার বোধ), তাহার অভাবই ‘ব্যুত্থান’; কিন্তু তাহা পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র গমনকে ‘ব্যুত্থান’ বলা হয় নাই। অতএব যাহার তত্ত্বজ্ঞান জন্মিয়াছে, তাহার পক্ষে কর্ম্ম ত্যাগ করিয়া গার্হস্থ্যাশ্রমে অবস্থান করাই সম্ভব হয় না। একথা দ্বারা বিদ্বান্ পুরুষের পক্ষে যে গুরুশুশ্রূষা ও তপস্যার অনুপপত্তি(অর্থাৎ প্রয়োজন নাই), তাহাও বলা হইল।১১
এ বিষয়ে কোন কোন গৃহস্থ, সন্ন্যাসে ভিক্ষাচর্য্যাদি-ক্লেশের ভয়ে এবং পরকৃত অবজ্ঞাদির ভয়ে সন্ত্রস্ত হইয়া, আপনাদের সূক্ষ্মদর্শিতা(বিচারনৈপুণ্য) প্রদর্শন করত উত্তরে বলিয়া থাকেন যে,—সন্ন্যাসীর যখন দেহধারণের জন্য ভিক্ষাচর্য্যাদির(ভিক্ষা করা ইত্যাদির) নিয়ম প্রতিপালন দেখা যায়, তখন কেবল দেহধারণমাত্র যাহার প্রয়োজন, সেরূপ গৃহস্থেরও সাধ্য-সাধনাত্মক ‘এষণা’(চেষ্টা) পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল দেহরক্ষার নিমিত্ত ভোজন ও আচ্ছাদনমাত্র অবলম্বন করিয়া গৃহেই অবস্থান করা উচিত; গৃহত্যাগ করিয়া অন্যত্র গমনের কোন প্রয়োজন নাই। না, তাহা সঙ্গত হয় না; কেননা, এ কথার উত্তরে পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে যে, নিজের গৃহবিশেষে যে বাস
করা, তাহাও কামনারই ফল; সুতরাং তাহার পক্ষে নিজের গৃহে বাস করা সম্ভবই হইতে পারে না। আর নিজের বলিয়া কোন গৃহবিশেষে বাস না করিয়া যদি কেবলই দেহধারণের উদ্দেশ্যে ভোজন ও আচ্ছাদনের অন্বেষণ করে, এবং ‘আমার’ বলিয়া কোন বিষয় স্বীকার না করে, তাহা হইলে ত ফলতঃ তাহার ভিক্ষুকত্বই সিদ্ধ হইল। ভিক্ষুর যেরূপ শরীর রক্ষার জন্য ভিক্ষা করা ইত্যাদি কার্য্যে ও শুচিতার নিয়ম পরিপালনের আবশ্যকতা আছে, নিষ্কাম বিদ্বান্ গৃহীরও সেইরূপ ‘যাবজ্জীবন অগ্নিহোত্র যাগ করিবে’ ইত্যাদি শ্রুতির বিধান বলে, প্রত্যবায়-পরিহারের(পাপ বর্জ্জনের) নিমিত্ত সন্ধ্যাবন্দনাদি নিত্যকর্মে নিয়মিত ভাবে প্রবৃত্তি হইতে পারে; কিন্তু জ্ঞানী পুরুষ এই প্রকার নিয়োগবিধির বিষয় অর্থাৎ পাত্র নয় বলিয়াই ক্রিয়াতে নিযোজ্য হইতে পারেন না; সুতরাং তাঁহার পক্ষে উহা নিষিদ্ধই হইতেছে।১২
ভাল, এরূপ সিদ্ধান্ত হইলে ত জীবনব্যাপী নিত্যানুষ্ঠানবোধক বাক্যসমূহ নিরর্থক হইয়া পড়ে? না—নিরর্থক হয় না; কারণ, বিবেকজ্ঞানবিহীন লোকদিগের সম্বন্ধেই সেই সমস্ত বিধির সার্থকতা রহিয়াছে। ভিক্ষুর(সন্ন্যাসীর) যে কেবল শরীর রক্ষার জন্য প্রবৃত্তির(ভিক্ষাচর্য্যাদির) নিয়ম, তাহাও তাহার প্রবৃত্তির (কর্মানুষ্ঠানের) প্রযোজক(কারণ) নহে। জল দ্বারা আচমন করিলে যেমন সঙ্গে সঙ্গে পিপাসারও নিবৃত্তি হইয়া থাকে, ভিক্ষুর নিয়ম-প্রতিপালনও ঠিক সেইরূপ; ইহার অন্য কোনও প্রয়োজন বুঝা যায় না। যাবজ্জীবন অগ্নিহোত্রাদি কর্ম্মেও, আচমনে প্রবৃত্ত ব্যক্তির পিপাসা-শান্তির ন্যায় প্রবৃত্তির নিয়মকে অর্থপ্রাপ্ত অর্থাৎ ফলদ্বারা স্বীকৃত বলিলেও সঙ্গত হইতে পারে।১৩
আপত্তি হইতে পারে যে, প্রয়োজন না থাকিলে কেবল অর্থপ্রাপ্ত(ফলস্বরূপে লব্ধ) প্রবৃত্তির নিয়মও নিশ্চয়ই যুক্তিদ্বারা সমর্থিত হয় না। না, সে আপত্তি হইতে পারে না; কারণ, প্রথমতঃ সেরূপ নিয়ম পালনে যে তাঁহার প্রবৃত্তি, তাহা তাঁহার পূর্ব্বপ্রবৃত্তিসিদ্ধ, অর্থাৎ সাধকদশায় তাঁহাকে ঐ সমুদয় নিয়ম প্রতিপালনে এতই অভ্যাস করিতে হইয়াছিল যে, এখন প্রয়োজন না থাকিলেও তাহা আপনা হইতেই আসিয়া পড়ে। দ্বিতীয়তঃ পূর্ব্বাভ্যস্ত নিয়মগুলি পরিত্যাগ করিতে হইলে তাহাকে অতিশয় চেষ্টা করিতে হয়; তৃতীয়তঃ বিনা উপদেশেই ব্যুত্থানের (সমাধিভঙ্গের) প্রাপ্তি সম্ভাবনা সত্ত্বেও ব্যুত্থানের জন্য পুনরুপদেশ করা হইয়াছে! এই সমুদয় কারণেই জ্ঞানী মুমুক্ষু(মুক্তিকামী) ব্যক্তির পক্ষে নিয়ম প্রতিপালনের আবশ্যকতা(যুক্তিযুক্ত) হইতেছে।১৪
‘বিশেষতঃ যাহার হৃদয়ে মুক্তিলাভের ইচ্ছা প্রবল থাকে, বিদ্বান্ না হইলেও যে তাহাকে অবশ্যই সন্ন্যাস গ্রহণ করিতে হইবে, এবিষয়ে ‘শান্ত(শমগুণান্বিত) ও দ্বান্ত(দমগুণান্বিত) হইয়া-’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যই প্রমাণ। আত্ম-দর্শনের উপায়স্বরূপ শমাদি গুণ লাভ করা অন্য আশ্রমে সম্পূর্ণরূপে সম্ভবও হয় না। তাহার পর ‘পরম পবিত্র এবং ঋষিসমূহকর্তৃক সেবিত আত্মতত্ত্ব অত্যাশ্রমীদিগকে (যাঁহারা ব্রহ্মচর্য্যাদি তিনটি আশ্রম অতিক্রম করিয়া সন্ন্যাসী হইয়াছেন, তাঁহাদিগকে) বলিয়াছিলেন’, উক্ত ‘শ্বেতাশ্বতর’ উপনিষদেও এই তত্ত্বই জানা যাইতেছে। কৈবল্যোপনিষদও বলিতেছেন-‘কোন কোন ঋষি-কর্ম দ্বারা নহে, প্রজা দ্বারা নহে, ধন দ্বারা নহে, একমাত্র সন্ন্যাস দ্বারাই অমৃতত্ব(মোক্ষ) উপভোগ করিয়াছিলেন’ ইত্যাদি। স্মৃতিশাস্ত্রেও রহিয়াছে-‘জ্ঞানোদয়ের পর নৈষ্কর্য্য(সন্ন্যাস) অবলম্বন করিবে’ ইত্যাদি, এবং ‘ব্রহ্মাশ্রমপদে(সন্ন্যাসাশ্রমে) অবস্থান করিবে’ ইত্যাদি। ব্রহ্মচর্য্য প্রভৃতি যে সমুদয় বিদ্যা অর্থাৎ জ্ঞানলাভের উপায় বিদ্যমান আছে, একমাত্র অত্যাশ্রমী সন্ন্যাসীতেই সেগুলির সম্পূর্ণরূপে সমাবেশ হইতে পারে; পক্ষান্তরে গার্হস্থ্যাশ্রমে সেগুলির সম্পূর্ণরূপে অনুষ্ঠানও হইতে পারে না।১৫
আর সাধনা অপূর্ণ থাকিলে, তাহা কোন প্রয়োজন সাধনেই সমর্থ হয় না বিশেষতঃ গার্হস্থ্যাশ্রমে করণীয় যে সমস্ত কর্ম বিজ্ঞান-সাধনরূপে বিহিত, উপসংহারে কথিত হইয়াছে যে, সে সমুদয় কর্মেরও শেষ ফল হইতেছে— দেবতাতে লয় প্রাপ্তি; সুতরাং উহাও সংসারেরই অন্তর্গত। যদি কেবল কর্মীর পক্ষেই পরমাত্মবিজ্ঞান বিহিত হইত, তাহা হইলে কখনই সংসারান্তর্গত ফলের উপসংহার করা সঙ্গত হইত না। যদি বল, উহা(দেবতালয়) অঙ্গফল মাত্র অর্থাৎ দেবতাতে যে লয়প্রাপ্তির কথা আছে, তাহা কর্মের মুখ্য ফল নহে, গৌণ ফল মাত্র। না, তাহাও বলিতে পারা যায় না; কারণ, আত্মজ্ঞানের ফল হইতেছে উহার বিরোধী আত্মবস্তু;[সুতরাং উহাদের মধ্যে গৌণ-মুখ্যভাব হইতেই পারে না]। যাহার সম্বন্ধে সর্ব্বপ্রকার নাম, রূপ ও কৰ্ম্মসম্বন্ধ নিষিদ্ধ হইয়াছে, সেই পরমার্থ সত্য আত্মবস্তু-বিষয়ক জ্ঞানই মুক্তিসাধন। বিশেষতঃ অঙ্গফলের সম্বন্ধ কল্পনা করিলে, নির্বিশেষ আত্মবস্তু-বিষয়ক জ্ঞানের সম্ভবই হইতে পারে না; তাহাও ত তোমার অভীষ্ট নহে। কারণ, ‘যে সময় এই মুমুক্ষুর সমস্তই আত্মস্বরূপ হইয়া যায়’, ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যে জ্ঞানীর সম্বন্ধে ক্রিয়া, কারক ও ফল প্রভৃতি সমস্ত ব্যবহারই নিষিদ্ধ হইয়াছে; এবং তাহার
বিপরীত অবিদ্বানের সম্বন্ধে আবার ‘যে অবস্থায় যেন দ্বৈতের ন্যায় হয়’ ইত্যাদি বাজসনেয়ি ব্রাহ্মণে, সাংসারিক ক্রিয়াকারকাদি সমস্ত অবস্থা প্রদর্শিত হইয়াছে। এখানেও ঠিক সেই প্রকারই বুঝিতে হইবে যে, প্রথমতঃ কামনা-সংযুক্ত সংসারবিষয়ক দেবতাপ্যয়(দেবতাতে লয়রূপ) ফলের উপসংহার করিয়া অবশেষে মুক্তিলাভের উপায়স্বরূপ সর্ব্বাত্মক ব্রহ্মবস্তু-বিষয়ক জ্ঞানের উপদেশ করিব—এই উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্যই আলোচ্য শ্রুতিবাক্য আরম্ভ করা হইয়াছে। ১৬
তাহার পর, পূর্ব্বে যে তিনপ্রকার ঋণের কথা বলা হইয়াছে, তাহাও কেবল অজ্ঞ লোকদিগেরই দেবলোক, পিতৃলোক ও মনুষ্যলোক প্রাপ্তির বাধাজনক হইয়া থাকে; কিন্তু তাহা বিদ্বানের সম্বন্ধে কোন প্রকার বাধাই ঘটাইতে পারে না; কারণ, ‘পুত্র দ্বারাই এই মনুষ্যলোক জয় করিতে হইবে’ ইত্যাদি শ্রুতিতে মনুষ্যাদি লোকপ্রাপ্তির পক্ষে পুত্রাদিকেই বলা হইয়াছে সাধন অর্থাৎ উপায়। পক্ষান্তরে, যিনি জ্ঞানী আত্ম-লোকপ্রার্থী, তাহার সম্বন্ধে ‘আমরা সন্তান দ্বারা কি করিব?’ ইত্যাদি শ্রুতিতে প্রদর্শিত হইয়াছে যে, তিন প্রকার ঋণ জ্ঞানীর পক্ষে কোন বাধা ঘটাইতে পারে না। কৌষীতকী শ্রুতিতে আছে—‘যাবতীয় বিদ্বান্ ঋষিগণ এই কথাই বলিয়াছিলেন, এবং এই কারণেই প্রাচীন জ্ঞানিগণ অগ্নিহোত্র হোম করিতেন না’ ইত্যাদি।১৭
ভাল কথা, এইরূপ সিদ্ধান্ত হইলেও, অবিদ্বান্ লোক যতকাল তিনপ্রকার ঋণ হইতে মুক্ত না হয়, তত কাল ত তাহার আর পারিব্রাজ্য বা সন্ন্যাসগ্রহণ হইতেই পারে না। না, এরূপ আপত্তি সঙ্গত হয় না; কেন না, কোন লোকই গার্হস্থ্য ধর্ম্ম অবলম্বন করিবার পূর্ব্বে ঋণগ্রস্ত হইতে পারে না, অর্থাৎ গার্হস্থ্য অবলম্বনই ঋণ-সম্বন্ধের কারণ। আর যদি উপযুক্ত অধিকার লাভ না করিয়াও ঋণগ্রস্ত হয়, তাহা হইলে ত নির্বিশেষে সকলকেই ঋণী হইতে হয়; এরূপ হইলে ত অনিষ্টেরই সম্ভাবনা। তাহার পর ‘গৃহস্থাশ্রম হইতে বানপ্রস্থ অবলম্বনপূর্ব্বক শেষে প্রব্রজ্যা(সন্ন্যাস) গ্রহণ করিবে, অথবা সম্ভব হইলে, ব্রহ্মচর্য্য হইতে, গার্হস্থ্য হইতে, কিংবা বানপ্রস্থ হইতেই প্রব্রজ্যা করিবে’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতেও বেশ বুঝিতে পারা যায় যে, যে লোক গার্হস্থ্য অবলম্বন করিয়াছে, তাহার পক্ষেও আত্মদর্শনের উপায়রূপে সন্ন্যাস গ্রহণ করা অভীষ্টই বটে। আর যে, যাবজ্জীবন অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করিবার বিধান দিয়াছে এমন শ্রুতি দেখিতে পাওয়া যায়, বিদ্যাবিহীন অনুমুক্ষুর সম্বন্ধেই তাহা সার্থক হইতে পারে।
ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণেও কোন কোন শাখাধ্যায়ীর সম্বন্ধে কেবল দ্বাদশরাত্র মাত্র হোমের পরই অগ্নি পরিত্যাগের(বিধিদানকারী) শ্রুতি দেখিতে পাওয়া যায়। অতএব যাবজ্জীবাদি শ্রুতি কখনই সন্ন্যাসের বিরোধিনী হইতে পারে না।১৮
আর যে, কর্মানুষ্ঠানে অনধিকারীদিগের পক্ষেই পারিব্রাজ্য কল্পনা করা হইয়াছে, তাহাও সঙ্গত হয় নাই; কেন না, তাহাদের সম্বন্ধে ‘উৎসন্নাগ্নি কিংবা নিরগ্নি’ ইত্যাদি বিশেষ শ্রুতিরই উল্লেখ রহিয়াছে। তাহার পর, সমস্ত স্মৃতিশাস্ত্রেই সাধারণভাবে আশ্রমের বিকল্পবিধি(যে কোন একটি করা) ও সমুচ্চয়বিধি(সব কয়টি করা) প্রসিদ্ধ রহিয়াছে। আরও যে, বলা হইয়াছে- জ্ঞানীর যে ব্যুত্থান বা সন্ন্যাস-গ্রহণ, তাহা অর্থপ্রাপ্ত অর্থাৎ তাহা আপনা হইতেই হইয়া পড়ে, তাহার জন্য আর বিধানের আবশ্যক হয় না; সুতরাং উহা শাস্ত্রার্থ বা বৈধ নহে; অতএব সেরূপ লোক গৃহে বনে কিংবা যেখানে ইচ্ছা থাকুক না কেন, তাহাতে কিছু মাত্র বিশেষ নাই। সে কথাও সঙ্গত নহে; কারণ, ব্যুত্থান যদি অর্থপ্রাপ্তই(স্বতঃসিদ্ধ) হয়, তাহা হইলে ত জ্ঞানীর পক্ষে অন্য কোন আশ্রম-বিশেষে অবস্থান করাই সম্ভব হইতে পারে না; কেন না, আশ্রমবিশেষে অবস্থানের একমাত্র কারণ হইতেছে কামনা ও তদুচিত কর্মানুষ্ঠান; অথচ এই দুইটির নিবৃত্তির নাম হইতেছে ব্যুত্থান। ১৯
কামচার-প্রবৃত্তি(ইচ্ছা মত কার্য্য করা) যখন অত্যন্ত মুঢ়লোকদিগের বেলাতেই দেখা যায়, তখন জ্ঞানীর সম্বন্ধে ত সেই কামচার-প্রবৃত্তি কখনই সম্ভবপর নহে। শাস্ত্রবিহিত কৰ্ম্মই যখন আত্মজ্ঞের পক্ষে গুরু ভার বলিয়া বিবেচিত হইয়া থাকে, তখন অত্যন্ত অজ্ঞানের ফল কামচার-প্রবৃত্তি যে গুরুভার হইবে, তাহা ত আর বক্তব্যই নহে। উন্মাদ বা তিমির রোগের দরুণ যে বস্তু যে প্রকার দৃষ্ট হইয়া থাকে, সেই উন্মাদ ও তিমির রোগ দূর হইলেও সেই বস্তু সেই প্রকারে কখনই দৃষ্ট হয় না; কেন না, উন্মাদ ও তিমির রোগই ঐ প্রকার বিকৃত দর্শনের কারণ ছিল, এখন তাহার নিবৃত্তি হইয়াছে। অতএব এই সিদ্ধান্ত স্থির হইল যে, আত্মজ্ঞ পুরুষের ব্যুতান ভিন্ন ইচ্ছামত অবস্থান করা হইতেই পারে না, এবং তাহার অন্য কিছু কর্তব্যও অবশিষ্ট থাকে না। ২০
তাহার পর, “বিদ্যাৎ চাবিদ্যাৎ চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ” এই শ্রুতি বচনেরও এরূপ অর্থ নয় যে, জ্ঞানীর সম্বন্ধেও বিদ্যার সহিত অবিদ্যা বিদ্যমান থাকে; পরন্তু উহার অর্থ এই যে, যেমন একই শুক্তিতে একই পুরুষের একই সময়ে রজত(রূপা) ও শুক্তি(ঝিনুক) বিষয়ে জ্ঞান জন্মে না, তেমনি একই পুরুষে
পরস্পর বিরুদ্ধস্বভাব বিদ্যা ও অবিদ্যা একদা কখনও স্থান পাইতে পারে না। কঠোপনিষদে আছে—‘এই যে বিদ্যা ও অবিদ্যা, ইহারা উভয়ে অত্যন্ত বিরুদ্ধ- স্বভাব, ও বিপরীত পথগামী‘। অতএব বিদ্যা থাকিলে কখনও অবিদ্যার সম্ভব হয় না। ‘তপস্যা দ্বারা ব্রহ্মকে জানিবে’ ইত্যাদি শ্রুতিতে ব্রহ্মজ্ঞানের নিমিত্ত তপস্যা ও গুরুশুশ্রূষাদি কর্ম্ম সাধনরূপে উপদিষ্ট হইয়াছে; এরূপ স্থলে শাস্ত্র-বিহিত ও বিদ্যোৎপত্তির উপায়স্বরূপ এই তপঃপ্রভৃতি ও গুরু-শুশ্রূষাদি কর্ম্মগুলিই অবিদ্যাত্মক বলিয়া অবিদ্যা নামে কথিত হইয়া থাকে।[ ইহা দ্বারা প্রমাণিত হইতেছে যে,] লোকে এই তপঃপ্রভৃতি সাধন(উপায়) দ্বারা প্রথমে বিদ্যালাভ করিয়া কামনারূপী মৃত্যুকে অতিক্রম করে, তাহার পর নিষ্কাম হইয়া সর্ব্বপ্রকার এষণা(চেষ্টা বা কর্ম্ম) পরিত্যাগ করিয়া বিদ্যাপ্রভাবে অমৃতত্ব ভোগ করিয়া থাকে। এইরূপ অভিপ্রায় জানাইবার জন্যই বলিয়াছেন যে,—‘অবিদ্যা দ্বারা মৃত্যু অতিক্রম করিয়া বিদ্যা দ্বারা অমৃত(মোক্ষ) ভোগ করিয়া থাকে’ ইতি। ২১
আরও যে, বলা হইয়াছে-“কুর্ব্বন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেৎ শতং সমাঃ।” এই শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, পুরুষের সম্পূর্ণ আয়ুষ্কাল কর্মানুষ্ঠানেই পরিসমাপ্ত অর্থাৎ পুরুষ যতকাল জীবিত থাকিবে, ততকাল কর্মাধিকার হইতে মুক্তি লাভ করিতে পারিবে না, ইত্যাদি।[ইহার উত্তর-] এই শ্রুতি অবিদ্বান্ পুরুষের পক্ষেই প্রযোজ্য, এই বলিয়া সে আপত্তিরও খণ্ডন করা হইয়াছে। এরূপ না বলিলে, ঐ শ্রুতির অর্থসঙ্গতিই সম্ভব হয় না। আর যে উক্ত শ্রুতির অনুরূপ বিষয়ে, বক্ষ্যমাণ(যাহা পরে বলা হইবে) আত্মজ্ঞানকেও কর্মের সহিত অবিরুদ্ধ বলিয়া আপত্তি করা হইয়াছিল, তাহাও সবিশেষ ও নির্বিশেষ আত্মভেদে বিষয়ব্যবস্থা দ্বারা নিষিদ্ধ হইয়াছে; ইহা আমরা পরেও ব্যাখ্যাচ্ছলে প্রদর্শন করিব। অতএব বুঝিতে হইবে যে, কেবল নিষ্ক্রিয় শুদ্ধ ব্রহ্মাত্মৈকত্ব-বিদ্যা প্রকাশনের জন্যই যে পরবর্তী গ্রন্থ আরম্ভ করা হইতেছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই।
আত্মা বা ইদমেক এবাগ্র আসীৎ। নান্যৎ কিঞ্চন মিষৎ। স ঈক্ষত লোকান্ নু সৃজা ইতি ॥ ১ ॥
প্রণম্য গুরুপাদাজং স্মৃতা শঙ্কর-ভাষিতম্। ঐতরেয়শ্রুতি-ব্যাখ্যা সরলাখ্যা বিতন্যতে॥
সরলার্থঃ। ইদং(নামরূপাভ্যামভিব্যক্তং জগৎ) অগ্রে(সৃষ্টেঃ প্রাক্) একঃ(সর্ব্বথা ভেদশূন্যঃ) আত্মা(ব্যাপকং ব্রহ্ম) বৈ(অবধারণে-আত্মৈব) আসীৎ; অন্যৎ(সজাতীয়ং বিজাতীয়ং বা) কিঞ্চন(কিমপি বস্তু) মিষৎ (ব্যাপারবৎ, সক্রিয়ম্) ন(নাসীদিত্যর্থঃ); সঃ(আত্মা) ঈক্ষত(ঐক্ষত- আলোচয়ামাস)-লোকান্(অন্তঃপ্রভৃতীনি ভোগস্থানানি) নু(বিতর্কে) সৃজৈ(সৃজে)[অহম্] ইতি শেষঃ ॥ ১ ॥
মূলানুবাদ। সৃষ্টির পূর্ব্বে এই জগৎ এক মাত্র আত্মাই ছিল, অর্থাৎ নানারূপ বৈচিত্র্যপূর্ণ এই জগৎ সৃষ্টির পূর্ব্বে এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মস্বরূপেই ছিল; তাহা ছাড়া সক্রিয় অন্য কিছুই ছিল না। তিনি আলোচনা(চিন্তা) করিলেন—আমি অন্তঃপ্রভৃতি লোক সৃষ্টি করিব ॥১॥
শাঙ্করভাষ্যম্। আত্মেতি। আত্মা-আপ্নোতেরাদত্তেররত্তেরততের্ব্বা, পরঃ সর্বজ্ঞ: সর্বশক্তিরশনায়াদিসর্বসংসারধর্মবর্জিতো নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাবোহজো- হজরোহমরোহমৃতোহভয়োহদ্বয়ঃ বৈ। ইদং যদুক্তং নামরূপকর্মভেদভিন্নং জগৎ আত্মৈব একঃ, অগ্রে জগতঃ সৃষ্টেঃ প্রাক্ আসীৎ। কিং নেদানীং স এবৈকঃ? ন। কথং তর্হি আসীদিত্যুচ্যতে? যদ্যপীদানীৎ স এবৈকঃ, তথাপ্যন্তি বিশেষঃ- প্রাগুৎপত্তিরব্যাকৃতনাম-রূপভেদমাত্মভূতম্ আত্মৈকশব্দ-প্রত্যয়গোচরং জগৎ, ইদানীং ব্যাকৃতনামরূপভেদত্বাদনেকশব্দ-প্রত্যয়গোচরম্ আত্মৈকশব্দপ্রত্যয়- গোচরঞ্চেতি বিশেষঃ। যথা সলিলাৎ পৃথক্ ফেননামরূপব্যাকরণাৎ প্রাক্ সলিলৈক-শব্দ-প্রত্যয়গোচর এব ফেনঃ, যদা সলিলাৎ পৃথঙ্নামরূপভেদেন ব্যাকৃতো ভবতি, তদা সলিলং ফেনশ্চেতি অনেকশব্দপ্রত্যয়ভাক্ সলিলমেবেতি চৈকশব্দ-প্রত্যয়ভাক্ চ ফেনো ভবতি, তদ্বৎ।১
ন অন্যৎ কিঞ্চন ন কিঞ্চিদপি, মিষৎ নিমিষদ্ব্যাপারবদিতরদ্বা। যথা সাঙ্গ্যানা- মনাত্মপক্ষপাতি স্বতন্ত্রং প্রধানম্, যথা চ কাণাদানামণবঃ, ন তদ্বদিহান্যদাত্মনঃ কিঞ্চিদপি বস্তু বিদ্যতে। কিং তর্হি? আত্মৈবৈক আসীদিত্যভিপ্রায়ঃ। ২
সঃ সর্বজ্ঞস্বাভাব্যাদাত্মা এক এব সন্ ঈক্ষত। ননু প্রাগুৎপত্তেরকার্য্যকরণ- ত্বাৎ কথমীক্ষিতবান্? নায়ং দোষঃ, সর্বজ্ঞস্বাভাব্যাৎ। তথা চ মন্ত্রবর্ণঃ—
“অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা” ইত্যাদিঃ। কেনাভিপ্রায়েণেত্যাহ-লোকান্ অন্তঃপ্রভৃতীন্ প্রাণিকৰ্ম্ম-ফলোপভোগস্থানভূতান্ নু সৃজৈ সৃজেহহমিতি ॥১॥
ভাষ্যানুবাদ। ‘আত্ম’ ইত্যাদি। প্রাপ্তি বা ব্যাপ্তিবোধক ‘আপ’ ধাতু হইতে, বা গ্রহণার্থক আ-দা ধাতু হইতে কিংবা ভক্ষণার্থক ‘অদ’ ধাতু হইতে, অথবা সতত গমনবোধক ‘অৎ’ ধাতু হইতে নিষ্পন্ন ‘আত্মা’ শব্দের অর্থ,-সর্ব্বজ্ঞ, সর্ব্বশক্তি, ক্ষুধাতৃষ্ণা প্রভৃতি সর্ব্বপ্রকার সংসার-ধর্মবজ্জিত, নিত্য শুদ্ধ, নিত্যযুদ্ধ, নিত্যমুক্ত, জরামরণশূন্য, অমৃত, অভয় ও অদ্বয়(দ্বিতীয় শূন্য) পরমেশ্বর। ‘বৈ’ অর্থ[অবধারণ]। ‘ইদং’ অর্থ-নাম রূপ ও কর্মভেদবিশিষ্ট পূর্ব্বোক্ত জগৎ। সৃষ্টির পূর্ব্বে এই জগৎ একমাত্র আত্মাই ছিল। তবে এখন কি তিনি একমাত্র সৎ নহেন? না, সে কথা নয়;[এখনও তিনিই একমাত্র সৎ]। ভাল, তাহা হইলে ‘ছিল’(আসীৎ) বলা হইতেছে কি প্রকারে? হাঁ, যদিও আত্মা এখনও একই বটে, তথাপি কিঞ্চিৎ বিশেষ আছে। সৃষ্টির পূর্ব্বে যখন জগতের নাম-রূপাকারে ভেদ(পার্থক্য) ব্যক্ত হয় নাই, সেই সময় আত্মস্বরূপে বীজভাবে অবস্থিত এই জগৎ একমাত্র আত্মশব্দ ও আত্ম-প্রত্য- য়েরই বিষয় ছিল অর্থাৎ জগৎ বলিয়া কোন শব্দ ছিল না, সে বিষয়ে কোন বোধও ছিল না; আর এখন সেই জগৎই নাম রূপাকারে অভিব্যক্ত (প্রকাশিত) হইয়া কখনও অনেক প্রকার শব্দ ও বোধের বিষয় হইয়া থাকে, আবার কখনও বা কেবলই আত্মশব্দ ও আত্ম-প্রত্যয়েরও বিষয়ী- ভূত হইয়া থাকে;[ইহাই উভয় অবস্থার মধ্যে বিশেষ]; এবং সেই বিশেষ ভাবের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়াই এখানে ‘আসীৎ’ শব্দের প্রয়োগ করা হইয়াছে। যেমন জল হইতে পৃথগ্ভাবে আকৃতি ও নামবিশিষ্ট, ফেন প্রকাশিত হইবার পূর্ব্বে একমাত্র জল শব্দ ও জল বুদ্ধির বিষয়ীভূত হয়, আবার সেই ফেনই যখন আকৃতি ও নাম লইয়া জল হইতে পৃথগ্ভাবে প্রকাশিত হয়, তখন যেমন ‘সলিল’(জল) ও ‘ফেন’ ইত্যাদি বিভিন্নপ্রকার শব্দ ও বোধের বিষয় হইয়া থাকে, কখনও বা কেবল ‘সলিল’ বলিয়াই ব্যবহৃত ও প্রতীত হইয়া থাকে, ইহাও ঠিক সেইরূপ। ১
সে সময়ে মিযৎ—ব্যাপারযুক্ত(ক্রিয়াশীল) কিংবা তাহার বিপরীত(নিষ্ক্রিয়) অন্য কোনও পদার্থ ছিল না।[অভিপ্রায় এই যে,] সাংখ্যমতে যেরূপ আত্মা হইতে ভিন্ন স্বতন্ত্র প্রধান(প্রকৃতি), এবং কণাদমতে যেরূপ পরমাণুসমূহ
[সৃষ্টির অগ্রেও বিদ্যমান ছিল বলা হয়], বেদান্তমতে সেরূপ আত্মাভিন্ন স্বতন্ত্র কোনও বস্তু বিদ্যমান ছিল না। তবে, কি ছিল? না, একমাত্র আত্মাই ছিল। ২
সেই আত্মা স্বভাবতঃই সর্ব্বজ্ঞ; এইজন্য এককই(অন্যের সাহায্য না লইয়াই) ঈক্ষণ(চিন্তা) করিয়াছিলেন-। ভাল কথা, সৃষ্টির পূর্ব্বে যখন জ্ঞানসাধন(জ্ঞানলাভের উপায়) দেহেন্দ্রিয়াদি কিছুই ছিল না, তখন তিনি ঈক্ষণ করিলেন কি প্রকারে? না, ইহা দোষাবহ নহে; কারণ, সর্ব্বজ্ঞতা তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ;[সুতরাং তাঁহার জ্ঞানের জন্য দেহেন্দ্রিয়াদির আবশ্যক হয় না]। দেখ, মন্ত্রও একথা বলিতেছে, ‘তিনি পদরহিত, অথচ দ্রুতগামী; হস্তরহিত, অথচ গ্রহীতা’ ইত্যাদি। তিনি কি অভিপ্রায়ে ঈক্ষণ করিয়াছিলেন, তাহা বলিতেছেন-প্রাণিগণের কর্মানুযায়ী ফলোপভোগের আশ্রয়স্বরূপ অন্তঃপ্রভৃতি লোক(স্থান) সমূহ আমি সৃষ্টি করিব, এই অভিপ্রায়ে ॥১॥
স ইমাল্লোকানসৃজত। অন্তো মরীচীর্মরমাপোহদোহন্তঃ পরেণ দিবং দ্যৌঃ প্রতিষ্ঠান্তরিক্ষং মরীচয়ঃ। পৃথিবী মরো যা অধস্তাত্তা আপঃ ॥ ২॥
সরলার্থঃ। সঃ(আত্মা)[এবমীক্ষিত্বা] ইমান্(বক্ষ্যমাণান্ অন্তঃ, মরীচয়ঃ, মরঃ, আপঃ ইত্যেতান্) লোকান্(ভোগভূমীঃ) অসৃজত(সৃষ্টবান্); [সৃষ্টিরিয়ং ব্রহ্মাণ্ডসৃষ্ট্যনন্তরং বিজ্ঞেয়া]।[অন্তঃপ্রভৃতীনাৎ স্বরূপাণ্যাহ-] অদঃ(পূর্ব্বোক্তং) অন্তঃ(অন্তোধারণাৎ তদাখ্যো লোকঃ) পরেণ দিবৎ (দ্যুলোকাৎ পরস্তাদ উর্দ্ধমিত্যর্থঃ); দ্যৌঃ(দ্যুলোকঃ) প্রতিষ্ঠা(অন্তোলোকস্য আশ্রয়ঃ. দ্যুলোকাশ্রয়োহন্তো লোক ইত্যর্থঃ)।[দ্যুলোকাদধস্তাৎ] অন্তরিক্ষং মরীচয়ঃ(মরীচিসম্বন্ধাৎ মরীচিশব্দবাচ্যম্); পৃথিবী মরঃ(ম্রিয়ন্তে ভূতানি অস্মিন্ ইতি পৃথিবী মর উচ্যতে)। যাঃ অধস্তাৎ(পৃথিব্যা অধোদেশে বর্ত্তন্তে), তাঃ আপঃ(অববাহুল্যাৎ আপ উচ্যন্তে) ॥২॥
মূলানুবাদ। সেই আত্মা[ঐরূপ চিন্তা করিয়া ব্রহ্মাণ্ড নিৰ্ম্মা- ণের পর] অন্তঃ, মরীচি, মর ও অপ্ এই চারিটি লোক সৃষ্টি করিলেন। ঐ অন্তোলোকটি দ্যুলোকের উপরে এবং দ্যুলোকে অবস্থিত; এই
অন্তরিক্ষ বা আকাশই মরীচি। এই পৃথিবী মরলোক, এবং পৃথিবীর নিম্নে (অধঃ) যে সমস্ত লোক, সে সমুদয় ‘অপ্’ লোক নামে অভিহিত ॥২॥
শাঙ্করভাষ্যম্। —এবমীক্ষিত্বা আলোচ্য সঃ আত্মা ইমান্ লোকান্ অসৃজত সৃষ্টবান্। যথেহ বুদ্ধিমান্ তক্ষাদিঃ এবপ্রকারান্ প্রাসাদাদীন্ সৃজে—ইতীক্ষিত্বা, ঈক্ষানন্তরং প্রাসাদাদীন্ সৃজতি, তদ্বৎ ।১
ননু সোপাদানস্তক্ষাদিঃ প্রাসাদাদীন্ সৃজতীতি যুক্তম্; নিরুপাদানস্ত আত্মা কথং লোকান্ সৃজতি? ইতি। নৈষ দোষঃ। সলিলফেনস্থানীয়ে আত্মভূতে নাম-রূপে অব্যাকৃতে আত্মৈকশব্দবাচ্যে ব্যাকৃতফেনস্থানীয়স্য জগত উপাদানভূতে সম্ভবতঃ। তস্মাদাত্মভূত-নামরূপোপাদানভূতঃ সন্ সর্ব্বজ্ঞো জগন্নিৰ্ম্মিমীতে ইত্যবিরুদ্ধম্ ।২
অথবা, যথা বিজ্ঞানবান্ মায়াবী নিরুপাদান আত্মানমেব আত্মান্তরত্বেন আকাশেন গচ্ছন্তমিব নির্ম্মিমীতে, তথা সর্ব্বজ্ঞো দেবঃ সর্ব্বশক্তির্মহামায় আত্মানমেব আত্মান্তরত্বেন জগদ্রূপেণ নির্ম্মিদীভ ইতি যুক্ততরম্। এবঞ্চ সতি কার্য্যকারণোভয়াসদ্বাদ্যাদিপক্ষাশ্চ ন প্রসজ্যন্তে, সুনিরাক্বতাশ্চ ভবন্তি। ৩
কান্ লোকানসৃজতেত্যাহ-অন্তো মরীচীৰ্ম্মরমাপ ইতি। আকাশাদিক্রমে- পাণ্ডমুৎপাদ্য অন্তঃপ্রভৃতীন্ লোকানসৃজত। তত্র অন্তঃপ্রভৃতীন্ স্বয়মেব ব্যাচষ্টে শ্রুতিঃ, -অদঃ তৎ অন্তঃশব্দবাচ্যো লোকঃ, পরেণ দিবং দ্যুলোকাৎ পরেণ পরস্তাৎ, সঃ অন্তঃশব্দবাচ্যঃ, অন্তোভরণাৎ। দ্যৌঃ প্রতিষ্ঠা আশ্রয়ঃ তস্যান্তসো লোকস্য। দ্যুলোকাদধস্তাৎ অন্তরিক্ষং যৎ, তৎ ময়ীচয়ঃ। একোহপ্যনেকস্থানভেদত্বাদ্বহু- বচনভাক্-মরীচয় ইতি, মরীচিভির্বা রশ্মিভিঃ সম্বন্ধাৎ। পৃথিবী মর:- ম্রিয়ন্তেহস্মিন্ ভূতানীতি। যা অধস্তাৎ পৃথিব্যাঃ, তা আপ উচ্যন্তে, আপ্নোতেঃ, লোকাঃ। যদ্যপি পঞ্চভূতাত্মকত্বং লোকানাম্, তথাপি অব্বাহুল্যাৎ অব নামভি- রেব অন্তোময়ীচীৰ্ম্মরমাপ ইত্যুচ্যন্তে ॥২৷৷
ভাষ্যানুবাদ। সেই পূর্ব্বোক্ত আত্মা এই প্রকার আলোচনার পর এই সমুদয় লোক সৃষ্টি করিয়াছিলেন। ব্যবহারিক জগতে বুদ্ধিমান্ সূত্রধর(ছুতার) প্রভৃতি যেমন ‘আমি এইপ্রকার প্রাসাদ প্রভৃতি নির্মাণ করিব’, এই প্রকার ঈক্ষণ (আলোচনা) করিয়া তাহার পর প্রাসাদ প্রভৃতি নির্মাণ করিয়া থাকে, ইহাও ঠিক তদ্রূপ।১
এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, সুবধম প্রভৃতি কর্ম্মকর্তৃগণ যে, কার্য্যোপযোগী
উপকরণ-সহযোগে প্রাসাদ প্রভৃতি নির্মাণ করিয়া থাকে, ইহা যুক্তিসঙ্গতই হয়, কিন্তু আত্মার ত সেরূপ কোনও উপকরণ সংগৃহীত নাই; সুতরাং নিরুপকরণ আত্মা কিরূপে সৃষ্টিকার্য্য করিবেন? না, ইহা দোষাবহ হয় না; কেন না, জল হইতে অভিন্ন অব্যক্ত(অপ্রকাশিত) ফেনের ন্যায় আত্মা হইতে অনতিরিক্ত (অভিন্ন)—সুতরাং আত্মশব্দবাচ্য অব্যাকৃত(সূক্ষ্মরূপে অবস্থিত) নাম ও রূপই, অভিব্যক্ত(প্রকাশিত) ফেনের তুল্য জগতের উপাদান হইতে পারে। অতএব সর্ব্বজ্ঞ আত্মা যে, আপনারই স্বরূপভূত নাম ও রূপকে উপাদানরূপে গ্রহণ করিয়া জগৎ নির্ম্মাণ করিয়া থাকেন, ইহা বিরুদ্ধ হইতেছে না।২
অথবা, বিশিষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন মায়াবী পুরুষ যেরূপ কোনপ্রকার বাহিরের উপাদান না লইয়াই, আপনাকে অপর ব্যক্তিরূপে দেখাইয়া, সেই আত্মা যেন আকাশপথেই গমন করিতেছে, এইরূপে প্রকটিত করিয়া থাকে, সেইরূপ সর্ব্বজ্ঞ সর্ব্বশক্তি মহামায়াসমন্বিত পরমেশ্বরও যে, আপনাকেই জগতের অন্তর্গত অপর আত্মারূপে নির্মাণ(প্রকাশিত) করিয়া থাকেন, একথা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত হইতেছে। এই প্রকার সিদ্ধান্তানুসারে অসৎকার্য্যবাদী, অসৎকারণবাদী ও কার্য্য-কারণ উভয়ের অসত্ত্ববাদী(কার্য্য ও কারণ কিছুই নাই এই মত পোষণ- কারী) প্রভৃতির সিদ্ধান্তেরও আর সম্ভাবনা থাকে না; অধিকন্তু সে সমুদায় ‘বাদ’গুলিও খণ্ডিত হইয়া যায়।৩
তিনি কোন্ কোন্ লোক সৃষ্টি করিয়াছিলেন, তাহা বলিতেছেন— অন্তঃ, মরীচি, মর(মর্ত্য) ও অপ্।[এখানে বুঝিতে হইবে যে,] প্রথমে আকাশ বায়ু প্রভৃতির ক্রমশঃ সৃষ্টির পর ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করিয়া, এই অন্তঃ- প্রভৃতি লোকসমূহ সৃষ্টি করিয়াছিলেন। এখন শ্রুতি নিজেই অন্তঃপ্রভৃতি লোক সমূহের স্বরূপ বর্ণনা করিতেছেন—সেই যে এই অন্তঃশব্দবাচ্য লোক, তাহা দ্যুলোকেরও পরে অর্থাৎ দ্যুলোকেরও উপরে অবস্থিত; অন্তঃ(জল) ধারণ করে বলিয়া উহার নাম ‘অন্তঃ’। দ্যুলোক হইতেছে ঐ অন্তোলোকের প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়। ঐ দ্যুলোকের নিম্নে অবস্থিত যে অন্তরিক্ষ(ভূবর্লোক), তাহাই মরীচিনামক লোক। মরীচি লোকটি এক হইলেও বিভিন্নপ্রকার বহু স্থানযুক্ত বলিয়া উহাতে বহুবচন প্রযুক্ত হইয়াছে—‘মরীচয়ঃ’, অথবা মরীচিসমূহের— বহু সৌর কিরণের সহিত সম্বন্ধ থাকায়[বহুবচন হইয়াছে]। জীব সকল ইহাতে মৃত হয়, এইরূপ ব্যুৎপত্তি অনুসারে এই পৃথিবীই ‘মর’ লোক। পৃথিবীর নিম্নে অবস্থিত যে সমস্ত লোক, সে সমস্ত লোক অপ্ নামে কথিত হইয়া থাকে।
যদিও সমস্ত লোকই পঞ্চভূতাত্মক সত্য, তথাপি জলই বেশীর ভাগ থাকায় জলের নামেই ‘অন্তঃ’ শব্দ কথিত হইয়াছে। মরীচি প্রভৃতি লোক সম্বন্ধেও সেই কথা ॥২॥
স ঈক্ষতেমে নু লোকা লোকপালান্নু সৃজা ইতি।
সোহদ্য এব পুরুষং সমৃদ্ধ, ত্যামূর্চ্ছয়ৎ ॥ ৩ ॥
সরলার্থঃ। সঃ(আত্মা ঈশ্বরঃ)[পুনরপি] ঈক্ষত-ইমে(মরা সৃষ্টাঃ) লোকাঃ, মু(বিতর্কে)[পালকাভাবাৎ বিনশ্যেয়ুঃ; অতঃ] লোকপালান্ (অন্তঃপ্রভৃতিলোকপালান্) সৃজৈ ইতি।[এবমীক্ষিত্বা] সঃ অভ্যঃ(জল- প্রধানেভ্যঃ ভূতেভ্যঃ) এব পুরুষং সমুদ্ধত্য(সমুৎপাদ্য) অমূর্ছয়ৎ(স্বাবয়ব- সংযোজনেন পিণ্ডিতমকরোৎ) ইত্যর্থঃ ॥৩৷৷
মূলানুবাদ। সেই পরমেশ্বর পুনশ্চ ঈক্ষণ(আলোচনা) করিতে লাগিলেনঃ—[পালকের অভাবে এই সমস্ত লোক] বিনষ্ট হইয়া যাইবে; অতএব লোকপালসমূহ সৃষ্টি করিব। তিনি[এইরূপ আলোচনার পর] জলপ্রধান পঞ্চ ভূত হইতেই পুরুষ উৎপাদন করিয়া ও অবয়বাদি-সংযোজন করিয়া তাহার বৃদ্ধি সাধন করিলেন ॥৩৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। সর্ব্বপ্রাণিকর্ম্মকলোপাদানাধিষ্ঠানভূতান্ চতুরো লোকান্ সৃষ্টা স ঈশ্বরঃ পুনরেব ঈক্ষত-ইমে নু অন্তঃপ্রভৃতয়ো ময়া সৃষ্টা লোকাঃ পরিপালয়িতৃবর্জ্জিতা বিনশ্যেয়ুঃ; তস্মাদেষাং রক্ষণার্থং লোকপালান্ লোকানাৎ পালয়িতন্ নু সৃজৈ সৃজেহহমিতি। এবমীক্ষিত্বা সঃ অদ্ভ্যুঃ এব অপ্রধানেভ্য এব পঞ্চভূতেভ্যঃ, যেভ্যোহন্তঃপ্রভৃতীন্ সৃষ্টবান্, তেভ্য এবেত্যর্থঃ। পুরুষং পুরুষাকারং শিরঃপাণ্যাদিমন্তং সমুদ্ধত্য অদ্ভ্যুঃ সমুপাদায়, মৃৎপিণ্ডমিব কুলালঃ পৃথিব্যাঃ, অমূর্ছয়ৎ মূচ্ছিতবান্ সম্পণ্ডিতবান্ স্বাবয়ব- সংযোজনেনেত্যর্থঃ ॥৩॥
ভাষ্যানুবাদ। সেই ঈশ্বর সর্ব্বপ্রাণীর কর্ম্মফল ও তাহার উপায়-সমূহের আশ্রয় স্বরূপ অন্তঃপ্রভৃতি চারিপ্রকার লোক সৃষ্টি করিয়া, আবার ঈক্ষণ (আলোচনা) করিয়াছিলেন—আমি যে, এই অন্তঃপ্রভৃতি লোক-সমূহ সৃষ্টি করিয়াছি, এই সমুদায় লোক নিশ্চয়ই পরিপালকের অভাবে বিনষ্ট হইয়া যাইবে; অতএব এই সমুদায় লোকের রক্ষার জন্য আমি লোকপালসমূহ সৃষ্টি করিব।
এই প্রকার ঈক্ষণ করিয়া তিনি জলসমূহ হইতে অর্থাৎ জলপ্রধান পঞ্চভূত হইতে—তিনি যে সমুদয় ভূত হইতে অন্তঃপ্রভৃতি লোকসৃষ্টি করিয়াছিলেন, সেই সমুদায় লোক হইতেই পুরুষ—হস্তমস্তকাদি পুরুষাকৃতিবিশিষ্ট একটি পিণ্ড— কুম্ভকার যেরূপ পৃথিবী(মাটি) হইতে মৃৎপিণ্ড নির্মাণ করে, সেইরূপ জল হইতে সৃষ্টি করিয়া মূর্চ্ছিত করিয়াছিলেন অর্থাৎ উপযুক্ত অবয়ব-সংযোজনা করিয়া সংপিণ্ডিত(স্কুলভাবাপন্ন আকৃতিবিশিষ্ট) করিয়াছিলেন ॥ ৩ ॥
তমভ্যতপত্তস্যাভিতপ্তস্য মুখং নিরভিদ্যত যথাণ্ডম্, মুখাদ্বাগ্বাচোহগ্নির্নাসিকে নিরভিদ্যেতাং ‘নাসিকাভ্যাং প্রাণঃ প্রাণাদ্বায়ুরক্ষিণী নিরভিদ্যেতাং অক্ষিভ্যাঞ্চক্ষুশ্চক্ষুষ আদিত্যঃ কর্ণৌ নিরভিদ্যেতাং কর্ণাভ্যাং শ্রোত্রং শ্রোত্রাদ্দিশস্তুনি্রভিদ্যত ত্বচো লোমানি লোমভ্য ওষধিবনস্পতয়ো হৃদয়ং নিরভিদ্যত হৃদয়ান্মনো মনসশ্চন্দ্রমা নাভিনিরভিদ্যত নাভ্যা অপানোইপানা- মৃত্যুঃ শিশ্নং নিরভিদ্যত শিশ্নাদ্রেতো রেতস আপঃ ॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ।[স ঈশ্বরঃ] তৎ(পুরুষবিধং পিণ্ডং)[লক্ষ্যীকৃত্য] অভ্যতপৎ(তদ্বিষয়ে ধ্যানং-সঙ্কল্পং কৃতবান্)। অভিতপ্তস্য(ধ্যানপরস্য) তস্য (পুরুষাকারপিণ্ডস্য) যথা অণ্ডং(পক্ষিণঃ অণ্ডমিব) মুখং(মুখাকারং ছিদ্রং) নিরভিদ্যত(নির্ভিন্নম্ অভূৎ, মুখরন্ধ্রম্ অজায়ত ইত্যর্থঃ)। এবং মুখাৎ বাক্ (বাগিন্দ্রিয়ং), বাচঃ অগ্নিঃ(বাগধিষ্ঠাতা)[নিরভিদ্যত]; তথা, নাসিকে (ঘ্রাণেন্দ্রিয়ং) নিরভিদ্যেতাম্; নাসিকাভ্যাং প্রাণঃ(পঞ্চবৃত্ত্যাত্মকঃ); প্রাণাৎ বায়ুঃ(তদধিষ্ঠাত্রী দেবতা);[এবং চ অধিষ্ঠানং, করণং, তদধিদেবতা চেতি ত্রয়ৎ ক্রমেণ নির্ভিন্নমিতি ভাবঃ]। অক্ষিণী(চক্ষুর্গোলকে) নিরভিদ্যেতাং; অক্ষিভ্যাং চক্ষুঃ(ইন্দ্রিয়ং), চক্ষুষঃ আদিত্যঃ(চক্ষুর্দেবতা); তথা কর্ণে নিরভিদ্যেতাম্; কর্ণাভ্যাং শ্রোত্রং(শ্রবণেন্দ্রিয়ং), শ্রোত্রাৎ দিশঃ(কর্ণয়োদেবতাঃ) [নিরভিদ্যন্ত];[অনন্তরং] ত্বক্ নিরভিদ্যত, ত্বচঃ লোমানি, লোমভ্যঃ ওষধি- বনস্পতয়ঃ[নিরভিদ্যন্ত],[ততশ্চ] হৃদয়ং(অন্তঃকরণাধিষ্ঠানং) নিরভিদ্যত; হৃদয়াৎ মনঃ(অন্তঃকরণং), মনসঃ চন্দ্রমাঃ(তদধিদেবতা)[নিরভিদ্যত];
নাভিঃ নিরভিদ্যত; নাভ্যাঃ অপানঃ(পায়ুনামকমিন্দ্রিয়ং), অপানাৎ মৃত্যুঃ (পাযুধিদেবতা)[নিরভিদ্যত]; শিশ্নং নিরভিদ্যত; শিশ্নাৎ রেতঃ(শুক্রং), রেতসঃ আপঃ(তদধিদেবতা বরুণঃ)[নিরভিদ্যন্ত]।[ইহ সর্ব্বত্র অধিষ্ঠানং, তদধিষ্ঠেয়মিন্দ্রিয়ং, তদধিদেবতাশ্চ ক্রমেণ সমজায়ন্ত ইতি বিজ্ঞেয়ম্] ॥ ৪ ॥
ইতি প্রথমখণ্ডব্যাখ্যা ॥ ১ ॥
মূলানুবাদ। পূর্ব্বোক্ত ঈশ্বর সেই পূর্ব্বসৃষ্ট পুরুষাকার পিণ্ডকে লক্ষ্য করিয়া সংকল্প(চিন্তা) করিয়াছিলেন। ঈশ্বরকৃত সংকল্পের ফলে, পক্ষীর ডিম্বের ন্যায় সেই পুরুষাকার পিণ্ডটির প্রথমে মুখ নির্ভিন্ন অর্থাৎ জাত হইল, অর্থাৎ তাহার মুখবিবর দেখা দিল। মুখের পর বাগিন্দ্রিয় এবং বাগিন্দ্রিয়ের পর তাহার দেবতা অগ্নি অভিব্যক্ত (জাত) হইল। পরে নাসিকার ছিদ্র দুইটি প্রকাশ পাইল; নাসিকার পর প্রাণ অর্থাৎ ঘ্রাণেন্দ্রিয় এবং প্রাণের পর তাহার অধিদেবতা বায়ু প্রকাশিত বা জাত হইল। তারপর দুইটি চক্ষুর গোলক দেখা দিল; তাহার পর চক্ষুরিন্দ্রিয় ও তাহার অধিদেবতা আদিত্য প্রকাশ পাইল। অতঃপর দুইটি কর্ণবিবর প্রকাশিত হইল; কর্ণের পর শ্রবণেন্দ্রিয় ও তাহার অধিদেবতা দিক্সমূহ প্রকাশিত হইল। অনন্তর ত্বক্ প্রকাশিত হইল, এবং ত্বকের পর লোমসমূহ(স্পর্শনেন্দ্রিয়) ও তাহা হইতে ওষধি ও বনস্পতিসকল জাত হইল। তাহার পর হৃদয় প্রকাশিত হইল, এবং তাহা হইতে অন্তঃকরণ বা মন ও মনের দেবতা চন্দ্র প্রকাশ পাইল। অনন্তর সমস্ত প্রাণের আশ্রয়স্বরূপ নাভি উৎপন্ন হইল; নাভির পর অপান(পায়ু-মলদ্বার) ও তদধিদেবতা মৃত্যু প্রকাশ পাইল। তাহার পর শিশ্ন(জননেন্দ্রিয়) প্রকাশ পাইল; শিশ্নের পর রেতঃ অর্থাৎ শুক্রসমন্বিত ইন্দ্রিয় ও তাহার অধিদেবতা অপ্(জল) উৎপন্ন হইল ॥৪॥
শাঙ্করভাষ্যম্। তং পিণ্ডং পুরুষবিধমুদ্দিশ্য অভ্যন্তপৎ, তদভিধ্যানং সঙ্কল্পং কৃতবানিত্যর্থঃ, “যস্য জ্ঞানময়ং তপঃ” ইত্যাদিশ্রুতেঃ। তস্যাভিতপ্তস্য ঈশ্বরসঙ্কল্পেন তপসাভিতপ্তস্য পিণ্ডস্য মুখং নিরভিদ্যত মুখাকারং শুষিরমজায়ত;
যথা পক্ষিণোহণ্ডং নির্ভিদ্যতে, এবম্। তস্মাচ্চ নির্ভিন্নান্মুখাৎ বাক্ করণমিন্দ্রিয়ং নিরবর্তত; তদধিষ্ঠাতা অগ্নিঃ, ততো বাচঃ, লোকপালঃ। তথা নাসিকে নিরভিদ্যেতাম্। নাসিকাভ্যাং প্রাণঃ, প্রাণাদ্বায়ুঃ; ইতি সর্ব্বত্রাধিষ্ঠানং করণং দেবতা চ ত্রয়ং ক্রমেণ নির্ভিন্নমিতি। অক্ষিণী, কর্ণো’, ত্বক্, হৃদয়ম্ অন্তঃকরণাধিষ্ঠানং মনঃ অন্তঃকরণং; নাভিঃ সর্ব্বপ্রাণবন্ধনস্থানম্, অপানসংযুক্তত্বাদপান ইতি পাযিন্দ্রিয়মুচ্যতে; তস্মাৎ তস্যাধিষ্ঠাত্রী দেবতা মৃত্যুঃ। যথান্যত্র, তথা শিশ্নং নিরভিদ্যত প্রজননেন্দ্রিয়স্থানম্। ইন্দ্রিয়ৎ রেতঃ রেতোবিসর্গার্থত্বাৎ সহ রেতসোচ্যতে। রেতস আপ ইতি ॥৪॥
ইতি প্রথমখণ্ডভাষ্যম্ ॥ ১ ॥
ভাষ্যানুবাদ। পরমেশ্বর সেই পুরুষকার পিণ্ডকে লক্ষ্য করিয়া তপস্যা করিয়াছিলেন, অর্থাৎ সেবিষয়ে ধ্যান(সংকল্প) করিয়াছিলেন। এখানে ‘তপস্যা’ অর্থ—সংকল্প(ধ্যান); কারণ, অন্য শ্রুতিতে আছে—‘জ্ঞানই যাঁহার তপস্যা’ ইত্যাদি। সেই পিণ্ডটি অভিতপ্ত অর্থাৎ ঈশ্বরের সংকল্লাত্মক ধ্যানের বিষয়ীভূত হইলে পর, তাহার মুখ বিভিন্ন হইল, অর্থাৎ মুখাকার গর্ত্ত উৎপন্ন হইল; পক্ষীর অণ্ড যেরূপ ভিন্ন হয়, ঠিক সেইরূপ।
সেই উৎপন্ন মুখবিবর হইতে বাক্-করণ বাগিন্দ্রিয় এবং সেই ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতা বা পরিচালক অগ্নি প্রকাশ পাইল; সেই বাগিন্দ্রিয় হইতে প্রকাশিত অগ্নিই এখানে লোকপাল। সেইরূপ নাসিকারন্ধ্রদ্বয় নির্ভিন্ন অর্থাৎ উৎপন্ন হইল; নাসিকা হইতে প্রাণ(ঘ্রাণেন্দ্রিয়) এবং লোকপাল বায়ু প্রকাশ পাইল। এখানে সর্ব্বত্রই প্রথমে অধিষ্ঠান(ইন্দ্রিয়গোলক), পরে ইন্দ্রিয়, এবং তাহার পর অধিষ্ঠাত্রী দেবতা, এই তিনটির পর পর প্রকাশ বুঝিতে হইবে। অক্ষিদ্বয়, কর্ণদ্বয়, ত্বক্,[ইহারা ইন্দ্রিয়স্থান-গোলক]; হৃদয় অন্তঃকরণের আশ্রয়স্থান; মন হইতেছে অন্তঃকরণ। নাভি হইতেছে সমস্ত প্রাণের আশ্রয়স্থান। ‘অপান’ অর্থ ‘পায়ু’(মলদ্বার) ইন্দ্রিয়; কারণ, অপানবায়ুর সহিত উহার সম্বন্ধ রহিয়াছে; অপান হইতেই উহার অধিদেবতা মৃত্যু[প্রকটিত হইল]। অন্যান্যস্থানের ন্যায় ক্রমে শিশ্নও নির্দিষ্ট হইল; শিশ্ন অর্থ জননেন্দ্রিয়স্থান, ‘রেতঃ’ অর্থ শিশ্নের ইন্দ্রিয়। রেতঃ ত্যাগ করাই উহার উদ্দেশ্য; এইজন্য ‘রেতঃ’ শব্দে উহার উল্লেখ করা হইয়াছে। সেই রেত ইন্দ্রিয় হইতে অপ্ অর্থাৎ অধিদেবতা জল হইল ॥ ৪ ॥
তা এনা দেবতাঃ সৃষ্টি অস্মিন্ মহত্যর্ণবে প্রাপতংস্তমশ- নায়া-পিপাসাভ্যামন্ববার্জৎ তা এনমব্রুবন্নায়তনং নঃ প্রজানীহি, যস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতা অন্নমদামেতি ॥৫৷১৷৷
সরলার্থঃ। তাঃ(পূর্ব্বোক্তাঃ লোকপালরূপেণ) সৃষ্টিাঃ এতাঃ (অগ্নিপ্রভৃতয়ঃ) দেবতাঃ অস্মিন্ মহতি(দুষ্পারে) অর্ণবে(সংসারসাগরে) প্রাপতন(পতিতবত্যঃ)। তং(প্রথমোৎপন্নং পিণ্ডং) অশনায়াপিপাসাভ্যাম্ অন্ববার্জৎ(ক্ষুধা-পিপাসাভ্যাং সংযোজিতবান্)[পরমেশ্বরঃ]। তাঃ(অগ্ন্যাদয়ো দেবতাঃ) এনং(পরমকারণং পরমেশ্বরম্) অব্রুবন্(কথিতবত্যঃ)-নঃ (অস্মভ্যৎ) আয়তনং(আশ্রয়স্থানং) প্রজানীহি(বিধেহি);[বয়ং] যস্মিন্ (আয়তনে) প্রতিষ্ঠিতাঃ(অবস্থিতাঃ সত্যঃ) অন্নং(ভোগ্যম্) অদাম (ভক্ষয়াম) ইতি ॥৫॥১৷৷
মূলানুবাদ। সেই এই অগ্নি প্রভৃতি দেবতাগণ পরমেশ্বরকর্তৃক সৃষ্ট হইয়া মহার্ণবে অর্থাৎ অপার সংসার-সাগরে নিপতিত হইলেন। তখন পরমেশ্বর তাঁহাদিগকে ক্ষুধা ও পিপাসার সহিত সংযোজিত করিলেন, অর্থাৎ সৃষ্টির পর তাঁহাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণা উপস্থিত হইল। ক্ষুধা-পিপাসাসমন্বিত সেই দেবতাগণ পরমেশ্বরকে বলিলেন—“আপনি আমাদের জন্য উপযুক্ত আশ্রয়স্থান নির্মাণ করুন, যে স্থানে অবস্থান করিয়া আমরা অন্ন ভক্ষণ করিতে সমর্থ হইতে পারি।” ইতি ॥৫॥১৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। তা এতা অগ্ন্যাদ্বয়ো দেবতা লোকপালত্বেন সঙ্কল্প্য সৃষ্টা ঈশ্বরেণ, অস্মিন্ সংসারার্ণবে সংসারসমুদ্রে মহতি অবিদ্যা- কামকর্মপ্রভব-দুঃখোদকে তীব্ররোগজরামৃত্যুমহাগ্রাহে অনাদাবনন্তে অপারে নিরালম্বে বিষয়েন্দ্রিয়জনিত-সুখলবলক্ষণবিশ্রামে পঞ্চেন্দ্রিয়ার্থতৃণ মারুত- বিক্ষোভোত্থিতানর্থশত-মহোর্ম্মৌ মহারৌরবাদ্যনেকনিরয়গত-হাহেত্যাদি- কুজিতাক্রোশনোভূতমহারবে সত্যার্জ্জব দানদয়াহিংসাশমদমধৃত্যাদ্যাত্মগুণ- পাথেয়পূর্ণ-জ্ঞানোডুপে, সৎসঙ্গ-সর্ব্বত্যাগমার্গে মোক্ষতীরে এতস্মিন্মহত্যর্ণবে প্রাপতন পতিতবত্যঃ ।১
তস্মাদগ্যাদিদেবতাপ্যয়লক্ষণাপি যা গতির্ব্ব্যাখ্যাতা জ্ঞান-কর্মসমুচ্চয়ানুষ্ঠান- ফলভূতা, সাপি নালং সংসারদুঃখোপশমায়েত্যয়ৎ বিবক্ষিতোহর্থোহত্র। যত এবম্, তস্মাদেবৎ বিদিত্বা, পরং ব্রহ্ম, আত্মা আত্মনঃ সর্বভূতানাঞ্চ, যো বক্ষ্যমাণ- বিশেষণঃ প্রকৃতশ্চ জগদুৎপত্তিস্থিতিসংহারহেতুত্বেন, স সর্বসংসারদুঃখো- পশমনায় বেদিতব্যঃ। তস্মাৎ “এষ পন্থা এতৎ কৰ্ম্মৈতদ্ব হ্মৈতৎ সত্যম্” যদেতৎ পরব্রহ্মাত্মজ্ঞানম্, “নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহয়নায়” ইতি মন্ত্রবর্ণাৎ।২
তং স্থান-করণ-দেবতোৎপত্তিবীজভূতৎ পুরুষং প্রথমোৎপাদিতং পিণ্ডমাত্মান- মশনায়াপিপাসাভ্যাম্ অন্ববার্জৎ অনুগমিতবান্ সংযোজিতবানিত্যর্থঃ। তস্য কারণভূতস্য অশনায়াদিদোষবত্ত্বাৎ তৎকার্য্যভূতানামপি দেবতানামশনায়াদি- মত্ত্বম্। তাঃ ততঃ অশনায়াপিপাসাভ্যাং পীড্যমানা এনৎ পিতামহং স্রষ্টারম্ অব্রুবন্ উক্তবত্যঃ। আয়তনম্ অধিষ্ঠানং নঃ অস্মভ্যৎ প্রজানীহি বিধৎস্ব, যস্মিন্নায়তনে প্রতিষ্ঠিতাঃ সমর্থাঃ সত্যঃ অন্নম্ অদাম ভক্ষয়াম ইতি ॥৫॥১৷৷
ভাষ্যানুবাদ। সেই এই অগ্নিপ্রভৃতি দেবতা, পরমেশ্বর যাঁহাদিগকে লোকপাল করিবার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিয়াছিলেন; তাঁহারা এই সংসাররূপ মহাসাগরে—অবিদ্যা ও তজ্জনিত কাম-কৰ্ম্ম হইতে উৎপন্ন দুঃখরাশি যাহার জলপ্রবাহ, ভীষণ ব্যাধি ও জরা-মরণ যাহার গ্রাহ(জলচর হিংস্র জন্তু), যাহার আদি, অন্ত বা পার নাই, বিষয়েন্দ্রিয়সম্বন্ধজনিত ক্ষুদ্র সুখই যেখানে বিশ্রাম-স্থান, শব্দস্পর্শাদি বিষয়ে কর্ণপ্রভৃতি পঞ্চবিধ ইন্দ্রিয়ের তৃষ্ণারূপ প্রবল বায়ুর তাড়নে সমুৎপন্ন শত শত অনর্থরাশি যাহার তরঙ্গমালা; মহারৌরব প্রভৃতি নরকগত প্রাণিগণের হাহাকার ও ক্রন্দনাদি ধ্বনিই যাহার মহানির্ঘোষ (শব্দ); সত্য, সরলতা, দান, দয়া, অহিংসা, শম, দম ও ধৃতি প্রভৃতি আত্মগুণ- রূপ পাথেয়পূর্ণ জ্ঞান যাহার ভেলা অর্থাৎ পারগমনের উপায়, সাধুসঙ্গ ও সর্ব্বস্ব-ত্যাগই যাহা পার হইবার প্রকৃষ্ট পথ, এবং মুক্তি যাহার তীর বা শেষ, সেই আশ্রয়বিহীন মহাসমুদ্রে পতিত হইয়াছিলেন, অর্থাৎ সংসারে আসক্ত হইয়াছিলেন।১
অতএব, এখানে এইরূপ অর্থই শ্রুতির অভিপ্রেত বলিয়া বোধ হইতেছে যে, পূর্ব্বে যে, জ্ঞান ও কর্ম্মের একযোগে অনুষ্ঠানের ফলে অগ্নিপ্রভৃতি দেবতাতে অপ্যয় বা লয়ের কথা বর্ণিত হইয়াছে, তাহাও প্রকৃতপক্ষে সংসার-দুঃখ দূর করার উপায় নহে। যেহেতু জ্ঞান ও কর্ম্মের একত্র অনুষ্ঠানের ফল এই প্রকার,
সেই হেতুই যথোক্ত প্রকারে ব্রহ্মের স্বরূপ জানিয়া, নিজের এবং সমস্ত ভূতের (প্রাণীর) যে আত্মা, যাহার পরিচয় বা লক্ষণ পরে বলা হইবে, এবং এখানেও জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও সংহারের কারণরূপে যাহার বিষয় বলিতে আরম্ভ করা হইয়াছে, সর্ব্বদুঃখ দূর করার জন্য তাহাকেই জানিতে হইবে। অতএব ‘ইহাই প্রকৃত পথ, ইহাই কৰ্ম্ম, ইহাই ব্রহ্ম, এবং ইহাই সত্য’ যাহা এই শ্রুতিতে ব্রহ্মাত্ম-জ্ঞান বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে,(তাহাই দুঃখনিবৃত্তির যথার্থ উপায়]। মন্ত্রেও আছে—‘মোক্ষধামে যাইবার আর দ্বিতীয় পথ নাই’। ২
যথোক্ত স্থান(ইন্দ্রিয়-গোলক), ইন্দ্রিয় ও দেবতাগণের উৎপত্তির মূল সেই প্রথমোৎপাদিত পিণ্ডাকার পুরুষকে তিনি অশনায়া(ক্ষুধা) ও পিপাসা দ্বারা অনুগত অর্থাৎ সংযোজিত করিয়াছিলেন। কারণস্বরূপ সেই পিণ্ডে অশনায়াদি দোষ থাকায় তৎকার্য্য(সেই পিণ্ড হইতে উৎপন্ন) দেবতা- গণেরও অশনায়াদি দোষ উপস্থিত হইয়াছিল। সেই দেবতাগণ অশনায়া ও পিপাসা দ্বারা পীড়িত হইয়া নিজের স্রষ্টা পিতামহকে বলিয়াছিলেন যে, আমাদের নিমিত্ত সেইরূপ আয়তন অর্থাৎ অবস্থানের যোগ্য স্থানের ব্যবস্থা করুন, যে স্থানে থাকিয়া আমরা শক্তিলাভ করিব ও অম্ল ভক্ষণ করিব ॥৫॥১॥
তাভ্যো গামানয়ৎ তা অক্রবন্ ন বৈ নোইয়মলমিতি। তাভ্যোহশ্বমানয়ৎ তা অক্রবন্ ন বৈ নোইয়মলমিতি ॥৬৷৷২৷৷
সরলার্থঃ।[এবমুক্ত ঈশ্বরঃ] তাভ্যঃ(দেবতাভ্যঃ) গাম্ আনয়ৎ (গবাকৃতিং পিণ্ডং দর্শিতবান্)। তাঃ(দেবতাঃ) অক্রবন্(উক্তবত্যঃ) অয়ং(ত্বয়া আনীতঃ গবাকৃতিঃ পিণ্ডঃ) নঃ(অস্মভ্যং) ন বৈ(নৈব) অলং (ভোগায় পর্য্যাপ্তঃ) ইতি।[অনন্তরং] তাভ্যঃ অশ্বং(অশ্বাকৃতিং পিণ্ডং) আনয়ৎ; তাঃ(দেবতাঃ)[পুনঃ] অক্রবন্—অয়ং নঃ(অস্মভ্যং) ন বৈ অলম্ ইতি ॥৬৷৷২॥
মূলানুবাদ।[দেবতাগণের প্রার্থনা শ্রবণের পর, ঈশ্বর] তাহাদের জন্য গো‘র আকৃতিবিশিষ্ট(গরুর মত) একটি পিণ্ড আনয়ন করিলেন;[তাহা দেখিয়া] দেবতারা বলিলেন, এটি
আমাদের পক্ষে যথেষ্ট[ভোগোপযুক্ত] নহে। অনন্তর তাঁহাদের জন্য অশ্ব আনয়ন করিলেন; তাহা দেখিয়া দেবতাগণ বলিলেন— ইহাও আমাদের পক্ষে যথেষ্ট নহে ॥৬॥২॥
শাঙ্করভাষ্যম্। এবমুক্ত ঈশ্বরঃ তাভ্যো দেবতাভ্যো গাৎ গবাকৃতি- বিশিষ্টং পিণ্ডং তাভ্য এবাস্ত্যঃ পূর্ব্ববৎ পিণ্ডং সমুদ্ধত্য মুচ্ছয়িত্বা আনয়ৎ দর্শিতবান্। তাঃ পুনর্গবাকৃতিং দৃষ্টা অক্রবন্-ন বৈ নঃ অস্মদর্থম্ অধিষ্ঠায় অন্নমত্তুময়ম্ পিণ্ডঃ অলম্ ন বৈ। অলং পর্য্যাপ্তঃ। অত্তুং ন যোগ্য ইত্যর্থঃ। গবি প্রত্যাখ্যাতে তথৈব তাভ্যঃ অশ্বমানয়ৎ। তা অক্রবন্-ন বৈ নোহয়মলমিতি, পূর্ব্ববৎ ॥ ৬। ২॥
ভাষ্যানুবাদ। দেবতাগণ এইরূপ বলিলে পর, ঈশ্বর সেই দেবতাগণের নিমিত্ত একটি গো—গরুর মত আকৃতিসম্পন্ন দেহ-পিণ্ড পূর্ব্বের ন্যায় জল হইতেই উদ্ধৃত করিয়া এবং সংবর্দ্ধিত করিয়া আনয়ন করিলেন, অর্থাৎ তাঁহা-- দিগকে দেখাইলেন। তাঁহারা সেই গবাকৃতি পিণ্ডটি’ দেখিয়া বলিলেন— এই গবাকৃতি পিণ্ডটি আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিতে অর্থাৎ আমাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য অন্ন ভক্ষণ করিতে সমর্থ নহে। এইরূপে গোপিণ্ডটি গ্রহণ না করিলে পর, ঈশ্বর পুনশ্চ তাঁহাদের জন্য পূর্ব্ববৎ অশ্ব আনয়ন করিলেন। তদ্দর্শনে দেবগণ বলিলেন, না, ইহাও আমাদের জন্য যথেষ্ট নহে ॥৬৷২॥
তাভ্যঃ পুরুষমানয়ৎ তা অব্রবন্ সু কৃতং বতেতি পুরুষো বাব সুকৃতম্। তা অব্রবীদ্যথায়তনং প্রবিশতেতি ॥৭৷৷৩৷৷
সরলার্থঃ।[এবং প্রত্যাখ্যানানন্তরম্ ঈশ্বরঃ] তাভ্যঃ(দেবতাভ্যঃ) [পূর্ব্ববৎ] পুরুষম্ আনয়ৎ;[তৎ দৃষ্টা] তাঃ(দেবতাঃ) অব্রুবন্-সু কৃতং (শোভনম্ ইদমধিষ্ঠানং কৃতম্), বত(হর্ষে) ইতি।[তস্মাৎ হেতোঃ] পুরুষঃ বাব(এব) সুকৃতং(পুণ্যকৰ্ম্মহেতুত্বাৎ পুণ্যাত্মকম্)।[অনন্তরম্ ঈশ্বরঃ] তাঃ (দেবতাঃ) অব্রবীৎ—যথায়তনং(যস্য স্বকৰ্ম্মযোগ্যং যদায়তনং, তৎ) প্রবিশত [যুয়ম্, ইতি॥ ৭॥৩॥
মূলানুবাদ। অনন্তর, ঈশ্বর সেই দেবতাগণের উদ্দেশ্যে একটি পুরুষাকৃতি পিণ্ড(দেহ) আনয়ন করিলেন; তাহা দেখিয়া দেবতাগণ আহলাদ-সহকারে বলিলেন, সু কৃত—সুন্দর অধিষ্ঠান করা হইয়াছে;
সৎকর্ম-সাধনের নিদান(যাহা দ্বারা সৎকৰ্ম্ম করা যায়) বলিয়া পুরুষই যথার্থ সুকৃত। অতঃপর ঈশ্বর তাঁহাদিগকে বলিলেন— তোমরা নিজ নিজ কর্মোপযোগী অধিষ্ঠানে(স্থানে) প্রবেশ কর ॥ ৭॥৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—সর্ব্বপ্রত্যাখ্যানে তাভ্যঃ পুরুষমানয়ৎ স্বযোনিভূতম্। তাঃ স্বযোনিং পুরুষং দৃষ্ট্বা অখিন্নাঃ সত্যঃ সু কৃতং শোভনং কৃতম্ ইদমধিষ্ঠানং বত ইত্যব্রুবন্। তস্মাৎ পুরুষো বাব পুরুষ এব সুকৃতম্, সর্ব্বপুণ্যকৰ্ম্মহেতুত্বাৎ; স্বয়ং বা স্বেনৈবাত্মনা স্বমায়াভিঃ কৃতত্বাৎ সুকৃতমিত্যুচ্যতে। তা দেবতাঃ ঈশ্বরোহব্রবীৎ—ইষ্টমাসামিদমধিষ্ঠানমিতি মত্বা—সর্ব্বে হি স্বযোনিষু রমন্তে; অতঃ যথায়তনং যস্য যৎ বদনাদিক্রিয়াযোগ্যমায়তনম্, তৎ প্রবিশতেতি ॥৭॥৩৷৷
ভাষ্যানুবাদ। গো অশ্ব প্রভৃতি সমস্ত প্রত্যাখ্যান করা হইলে পর, পরমেশ্বর তাঁহাদের জন্য বিরাট্ পুরুষের সজাতীয় পুরুষমূর্ত্তি আনয়ন করিলেন। তখন দেবতাগণ আপনাদের উৎপত্তির মূল(বিরাটপুরুষের সজাতীয়) পুরুষদেহ দর্শন করিয়া বিষাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক আহলাদ-সহকারে বলিলেন— ‘সু কৃত’ অর্থাৎ আমাদের জন্য এটি উত্তম অধিষ্ঠান(আশ্রয়স্থান) করিয়া- ছেন। দেবতাগণ পুরুষ-দেহকে লক্ষ্য করিয়া ‘সুকৃত’ শব্দ প্রয়োগ করায়, এখনও পুরুষই যথার্থ ‘সুকৃত’ পদবাচ্য; কারণ, পুরুষই সমস্ত পুণ্য কর্ম সম্পাদনের মূল; অথবা, পরমেশ্বর স্বয়ংই অপরের সাহায্য না লইয়া নিজ মায়াশক্তিপ্রভাবে নির্মাণ করিয়াছিলেন বলিয়া পুরুষকে সুকৃত বলা হইয়াছে(১)। সাধারণতঃ সকলেই স্বকারণে(নিজের যাহা হইতে উৎপত্তি তাহার প্রতি) বা সজাতীয় বস্তুতে সন্তুষ্ট হইয়া থাকে; অতএব উক্ত অধিষ্ঠানটি দেবতাগণের মনোমত হইয়াছে, বুঝিতে পারিয়া, পরমেশ্বর দেবতাগণকে বলিলেন—ইহা যেহেতু তোমাদের মনঃপূত হইয়াছে, সেই হেতু তোমরা যথায়তনে অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যাহার যেটি শব্দোচ্চারণ প্রভৃতি নিজ নিজ কৰ্ম্মযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হয়, সে তাহার মধ্যে প্রবেশ কর ॥৭॥৩॥
অগ্নির্ব্বাগ্ভূত্বা মুখং প্রাবিশদ্বায়ুঃ প্রাণো ভূত্বা নাসিকে প্রাবিশদাদিত্যশ্চক্ষুভূত্বাক্ষিণী প্রাবিশদ্দিশঃ শ্রোত্রং ভূত্বা কর্ণে। প্রাবিশন্নোষধিবনস্পতয়ো লোমানি ভূত্বা ত্বচং প্রাবিশংশ্চন্দ্রমা মনো ভূত্বা হৃদয়ং প্রাবিশন্ মৃত্যুরপানো ভূত্বা নাভিং প্রাবিশ- দাপো রেতো ভূত্বা শিশ্নং প্রাবিশন্ ॥৮৷৷৪৷৷
সরলার্থঃ।[এবমীশ্বরাজ্ঞালাভানন্তরম্] অগ্নিঃ(বাগভিমানিনী দেবতা) বাক্ ভূত্বা(বাগিন্দ্রিয়মাশ্রিত্য) মুখং(স্বগোলকং) প্রাবিশৎ(প্রবিষ্টঃ); তথা বায়ুঃ প্রাণঃ ভূত্বা নাসিকে প্রাবিশৎ; আদিত্যঃ চক্ষুঃ ভূত্বা অক্ষিণী (চক্ষুর্গোলকদ্বয়ং) প্রাবিশৎ; দিশঃ(দিগ-দেবতাঃ) শ্রোত্রং ভূত্বা কর্ণেী প্রাবিশন্; ওষধি-বনস্পতয়ঃ লোমানি ভূত্বা ত্বচৎ প্রাবিশন্; চন্দ্রমাঃ(চন্দ্রঃ) মনঃ ভূত্বা হৃদয়ং প্রাবিশৎ; মৃত্যুঃ(যমঃ) অপানঃ ভূত্বা নাভিং প্রাবিশৎ; আপঃ রেতঃ ভূত্বা শিশ্নং প্রাবিশন্।[অত্র ইন্দ্রিয়ৈর্বিনা দেবতানামনবস্থিতেঃ, ইন্দ্রিয়াণাং চ দেবতাভিবিনা কার্য্যকরণানুপপত্তেঃ দেবতেন্দ্রিয়য়োঃ সহোল্লেখো দ্রষ্টব্য:] ॥৮॥৪॥
মূলানুবাদ। পরমেশ্বরের এই প্রকার আদেশ প্রাপ্ত হইয়া, বাগিন্দ্রিয়ের অধিদেবতা অগ্নি মুখে প্রবেশ করিলেন, ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের দেবতা বায়ু প্রাণরূপে অর্থাৎ ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের সহযোগে নাসিকাদ্বয়ে প্রবেশ করিলেন; চক্ষুর দেবতা আদিত্য অক্ষিরন্ধে(চোখের গর্তে) প্রবিষ্ট হইলেন; শ্রবণেন্দ্রিয়ের দেবতা দিক্সমূহ কর্ণদ্বয়ে প্রবেশ করিলেন; ত্বগিন্দ্রিয়ের দেবতা ওষধি ও বনস্পতিসমূহ ত্বকের মধ্যে প্রবেশ করিলেন; মনের দেবতা চন্দ্র হৃদয়ে প্রবিষ্ট হইলেন; অপান-দেবতা মৃত্যু নাভিতে প্রবেশ করিলেন; উপস্থের দেবতা অপ, রেতঃসহযোগে শিশ্নমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন ॥৮॥৪৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। তথাস্ত্বিত্যনুজ্ঞাং প্রতিলভ্য ঈশ্বরস্য নগর্যামিব বলাধিকৃতাদয়ঃ, অগ্নিঃ বাগভিমানী বাগেব ভূত্বা স্বং যোনিং মুখং প্রাবিশৎ। তথোক্তার্থমন্যৎ। বায়ুর্নাসিকে, আদিত্যোহক্ষিণী, দিশঃ কর্ণে, ওষধিবনস্পতয়ঃ স্বচম্, চন্দ্রমা হৃদয়ম্, মৃত্যুঃ নাভিম্, আপঃ শিশ্নং প্রাবিশন্ ॥৮৷৷৪৷
ভাষ্যানুবাদ। এইরূপে পরমেশ্বরের অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া, রাজ-
৩
পুরুষগণ যেরূপ রাজাজ্ঞায় নগরমধ্যে প্রবেশ করে, সেইরূপ অগ্নি-বাগিন্দ্রিয়ের দেবতা বাক্স্বরূপ হইয়া, অর্থাৎ বাগিন্দ্রিয়ের সহিত মিলিত হইয়া স্বকারণ (নিজের উৎপত্তিস্থল) মুখবিবরে প্রবেশ করিলেন। অন্যান্য অংশের অর্থও এই প্রকারই। বায়ু নাসিকা-রন্ধ্র দুইটিতে, আদিত্য অক্ষিরন্ধ্রে; দিক্সমূহ উভয় কর্ণে; ওষধি ও বনস্পতিসমূহ ত্বকে; চন্দ্র হৃদয়ে, মৃত্যু নাভিতে এবং অপদেবতা শিশ্নে(জননেন্দ্রিয়) প্রবেশ করিলেন ॥৮॥৪॥ তমশনায়া-পিপাসে অক্রতামাবাভ্যামভিপ্রজানীহীতি। সতে অব্রবীদেতাস্বেব বাং দেবতাস্বাভজাম্যেতাসু ভাগিন্যৌ করোমীতি। তস্মাদ্যস্যৈ কস্যৈ চ দেবতায়ৈ হবিগৃহ্যতে ভাগিন্যাবেবাস্যাম- শনায়াপিপাসে ভবতঃ ॥৯৷৫৷৷
সরলার্থঃ।[এবং দেবতাসু লব্ধাধিষ্ঠানাসু সতীযু) অশনায়া-পিপাসে তম্(ঈশ্বরম্) অব্রতাম্(উক্তবত্যৌ)—আবাভ্যাৎ অভিপ্রজানীহি (আবয়োরধিষ্ঠানং চিন্তয় বিধৎস্ব বা) ইতি।[এবমুক্ত ঈশ্বরঃ] তে(অশনায়া- পিপাসে) অব্রবীৎ—এতাসু(অগ্নিপ্রভৃতিষু) দেবতাসু এব বাৎ(যুবাম্) আভজামি(বৃত্তিব্যবহয়া অনুগৃহ্লামি); এতাসু এব ভাগিন্থৌ(এতাসু মধ্যে, যস্যা দেবতায়া যো হবির্ভাগঃ স্যাৎ, তস্যাঃ তেনৈব ভাগেন যুবামপি ভাগবত্যৌ করোমি; ন পুনরুষ্বয়োঃ পৃথগ্ভাগং বিদধামি ইতি ভাবঃ) ইতি। তস্মাৎ (হেতোঃ) যস্যৈ কস্যৈ চ দেবতায়ৈ হবিঃ(চরুপুরোডাশাদিকং) গৃহ্যতে (অর্প্যতে), অস্যাৎ(তস্যাৎ দেবতায়াং) অশনায়া-পিপাসে ভাগিন্থৌ(ভাগবত্যৌ) এব ভবতঃ,(ন পুনঃ পৃথগ্ভাগমর্হতঃ) ইত্যর্থঃ ॥৯৷৷৫॥
মূলানুবাদ। অতঃপর অশনায়া(ক্ষুধা) ও পিপাসা পরমেশ্বরকে বলিল—আমাদের জন্যও অধিষ্ঠান(আশ্রয়স্থান) চিন্তা করুন। [তদুত্তরে পরমেশ্বর] তাহাদিগকে বলিলেন—তোমাদিগকে এই অগ্নিপ্রভৃতি দেবতার মধ্যেই ভাগযুক্ত করিতেছি—ইহাদের মধ্যে যে দেবতার জন্য যে ভাগ নির্বাচিত হইবে, তোমরাও সেই দেবতার সেই ভাগের অধিকারী হইবে;[তোমাদের জন্য আর পৃথক্ ভাগ বিধানের আবশ্যক নাই]। এই কারণেই, যে কোন দেবতার উদ্দেশ্যে যে ভাগ
অর্পিত হইয়া থাকে, অশনায়া-পিপাসাও সেই দেবতার সেই ভাগই গ্রহণ করিয়া থাকে ॥৯৷৷৫৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। এবং লব্ধাধিষ্ঠানাসু দেবতাসু নিরধিষ্ঠানে সত্যৌ অশনায়া-পিপাসে তমীশ্বরমক্রতাম্ উক্তবত্যৌ-আবাভ্যামধিষ্ঠানম্ অভি- প্রজানীহি চিন্তয় বিধৎস্বেত্যর্থঃ। স ঈশ্বর এবমুক্তঃ তে অশনায়া-পিপাসে অব্রবীৎ, নহি যুবয়োর্ভাবরূপত্বাৎ চেতনাবদ্বত্ত্বনাশ্রিত্য অন্নাতৃত্বং সম্ভবতি। তস্মাৎ এতাস্বেবাগ্ন্যাদ্যাসু বাৎ যুবাং দেবতাসু অধ্যাত্মাধিদেবতাসু আভজামি বৃত্তিসংবিভাগেনানুগৃহ্লামি। এতাসু ভাগিন্যৌ যদ্দেবত্যো যো ভাগঃ হবিরাদি- লক্ষণঃ স্যাৎ, তস্যাস্তেনৈব ভাগেন ভাগিন্যৌ ভাগবত্যৌ বাং করোমীতি। সৃষ্ট্যাদাবীশ্বর এবং ব্যদধাৎ যস্মাৎ, তস্মাদিদানীমপি যস্যৈ কস্যৈ চ দেবতায়ৈ দেবতায়া অর্থায় হবিগৃহাতে চরু-পুরোডাশাদিলক্ষণম্, ভাগিন্যৌ এব ভাগ- বত্যাবেব অস্যাৎ দেবতায়াম্ অশনায়া-পিপাসে ভবতঃ ॥৯৪৫৷৷
ভাষ্যানুবাদ। এইপ্রকারে অগ্নিপ্রভৃতি দেবতা অধিষ্ঠান(আশ্রয়স্থান) লাভ করিলে পর, অশনায়া(ক্ষুধা) ও পিপাসা অধিষ্ঠানশূন্য থাকিয়া অর্থাৎ স্বতন্ত্র কোন আশ্রয় স্থান লাভ করিতে না পারিয়া সেই পরমেশ্বরকে বলিল- আমাদের জন্য অধিষ্ঠান(ভোগস্থান) চিন্তা করুন-বিধান করুন। সেই পরমেশ্বরকে এই প্রকার বলা হইলে তিনি তাহাদিগকে বলিলেন-তোমরা যখন গুণাদির ন্যায় পরাশ্রিত সৎ-পদার্থ, তখন অপর কোনও চেতন পদার্থকে আশ্রয় না করিয়া অন্নভোগ তোমাদের সম্ভবপর হইবে না; অতএব অধ্যাত্ম ও অধিদৈবতভাবাপন্ন উক্ত অগ্নিপ্রভৃতি দেবতাতেই বৃত্তি-ব্যবস্থা করিয়া তোমাদিগকে বৃত্তিভাগী করিতেছি, অর্থাৎ অনুগ্রহ করিতেছি; উক্ত দেবতাগণের মধ্যেই তোমাদিগকে ভাগী(অংশী) করিতেছি, অর্থাৎ যে দেবতার উদ্দেশ্যে চরু, পুরোডাশ প্রভৃতি যে হবির্ভাগ কল্পিত হইবে(যজ্ঞের ভাগ ভোজন করার ব্যবস্থা হইবে), সেই দেবতার সেই ভাগ দ্বারাই তোমাদিগকে ভাগসম্পন্ন করিতেছি। যেহেতু পরমেশ্বর সৃষ্টির আদিতে এইরূপ ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, সেই হেতুই এখনও, যে কোন দেবতার উদ্দেশ্যে চরু ও পুরোডাশ প্রভৃতি হবিঃ দান করা হয়, ক্ষুধা-পিপাসাও সেই দেবতার সেই ভাগই গ্রহণ করিয়া থাকে ॥৯৷৫॥
ইতি দ্বিতীয় খণ্ডের ভাষ্যানুবাদ ॥২॥
স ঈক্ষতেমে নু লোকাশ্চ লোকপালাশ্চান্নমেভ্যঃ সৃজা ইতি ॥১০॥১॥
সরলার্থঃ। সঃ(পরমেশ্বরঃ)[পুনরপি] ঈক্ষত(চিন্তয়ামাস)—ইমে লোকাঃ(অন্তঃপ্রভৃতয়ঃ) চ লোকপালাঃ(অগ্নিপ্রভৃতয়ঃ) চ[ময়া সৃষ্টাঃ] নু। এভ্যঃ(লোকপালেভ্যঃ) অন্নং(ভোগ্যৎ) সৃজৈ(সৃজে)[অহম্] ইতি ॥১০॥১॥
মূলানুবাদ। সেই পরমেশ্বর আবার চিন্তা করিলেন যে, আমি এই সমুদয় লোক ও লোকপাল সৃষ্টি করিয়াছি; এখন ইহাদের জন্য অন্ন(ভোগ্য) সৃষ্টি করিব ॥১০৷১৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। স এবমীশ্বর ঈক্ষত। কথম্? ইমে নু লোকাশ্চ লোকপালাশ্চ ময়া সৃষ্টাঃ; অশনায়া-পিপাসাভ্যাং চ সংযোজিতাঃ। অতো নৈষাৎ স্থিতিরন্নমন্তরেণ; তস্মাদন্নমেভ্যো লোকপালেভ্যঃ, সৃজৈ সৃজে ইতি। এবং হি লোকে ঈশ্বরাণামনুগ্রহে নিগ্রহে চ স্বাতন্ত্র্যং দৃষ্টৎ স্বেযু। তদ্বন্মহেশ্বরস্যাপি সর্ব্বেশ্বরত্বাৎ সর্ব্বান্ প্রতি নিগ্রহে অনুগ্রহে চ স্বাতন্ত্র্যমেব ॥১০৷৷১৷৷
ভাষ্যানুবাদ। সেই পরমেশ্বর আবার এইপ্রকার আলোচনা করিয়া- ছিলেন। কি প্রকার? না, এই সকল লোক ও লোকপালকে আমি সৃষ্টি করিয়াছি, এবং তাহাদিগকে অশনায়া(ক্ষুধা) ও পিপাসাযুক্ত করিয়াছি। অন্ন ছাড়া ইহাদের অবস্থিতি সম্ভবপর নহে; অতএব এই সকল লোকপালের জন্য অন্ন সৃষ্টি করিব। জগতে এইরূপই দেখিতে পাওয়া যায় যে, ঈশ্বরগণ(প্রভুগণ) স্ববিষয়ে(নিজ জনগণের প্রতি) স্বেচ্ছামত নিগ্রহ বা অনুগ্রহ করিতে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকেন; সেইরূপ পরমেশ্বরও যখন সকলের প্রভু, তখন তাঁহারও যে, সকলের প্রতি নিগ্রহ বা অনুগ্রহ প্রকাশ করিতে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে,[ইহা স্বীকার করিতেই হইবে] ॥১০৷৷১৷৷
সোহপোহভ্যতপৎ তাভ্যোহভিতপ্তাভ্যো। মূর্ত্তিরজায়ত যা বৈ সা মূর্ত্তিরজায়তান্নং বৈ তৎ ॥১১॥২॥
সরলার্থঃ। সঃ(অন্নং সিসৃক্ষুঃ পরমেশ্বরঃ) অপঃ(স্বসৃষ্টো অপঃ)
অভি(লক্ষ্যীকৃত্য) অতপৎ(অচিন্তয়ৎ)। অভিতপ্তাভ্যঃ(চিন্তিতাভ্যঃ) তাভ্যঃ(অদ্যঃ) মূর্ত্তিঃ(ঘনসংস্থানং চরাচরম্) অজায়ত(উৎপন্নম্)। যা বৈ সা মূর্ত্তিঃ অজায়ত, তৎ বৈ(এব) অন্নম্[অভূৎ] ॥১১৷২৷৷
মূলানুবাদ। সেই ঈশ্বর[অন্নসৃষ্টির ইচ্ছায়] পূর্ব্বে সৃষ্ট অপকে লক্ষ্য করিয়া তপস্যা(চিন্তা) করিয়াছিলেন। সেই অভিতপ্ত(চিন্তার বিষয়ীভূত) অপ্, হইতে মূর্ত্তি(ঘনীভূত রূপ) উৎপন্ন হইল। সেই যে মূর্ত্তি উৎপন্ন হইল, তাহাই অন্নরূপে পরিণত হইল ॥১২৷৷২৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। স ঈশ্বরোহন্নং সিসৃক্ষুঃ তা এব পূর্ব্বোক্তা অপঃ উদ্দিশ্য অভ্যতপৎ। তাভ্য অভিতপ্তাভ্য উপাদানভূতাভ্যঃ মূর্ত্তিঃ ঘনরূপৎ ধারণসমর্থং চরাচরলক্ষণম্ অজায়ত উৎপন্নম্। অন্নং বৈ তন্মূর্ত্তিরূপং, যা বৈ সা মূর্ত্তিরজায়ত ॥১১॥২৷৷
ভাষ্যানুবাদ। সেই পরমেশ্বর অন্নসৃষ্টির ইচ্ছা করিয়া সেই পূর্ব্বকথিত অপকে উদ্দেশ্য করিয়া তপস্যা করিয়াছিলেন। অভিতপ্ত সেই জলরূপ উপাদান হইতে মূর্ত্তি—ধারণসমর্থ ঘনীভূত স্থাবর-জঙ্গম বস্তু উৎপন্ন হইল। সেই যে মূর্ত্তি হইল, তাহাই অন্ন ॥১১৷২॥
তদেনদভিসৃষ্টং পরাঙত্যজিঘাংসৎ তদ্বাচাজিঘৃক্ষৎ, তন্না- শক্লোদ্বাচা গ্রহীতুম্ স যদ্ধৈনদ্বাচাগ্রহৈষ্যদভিব্যাহৃত্য হৈবান্ন- মত্রপ্স্যৎ ॥১২॥৩৷৷
সরলার্থঃ। তৎ এনৎ(এতৎ) অন্নম্ অভিসৃষ্টং(লোকপালান্নত্বেন সৃষ্টং সৎ) পরাঙ্(পরাক্ পশ্চান্মুখং যথা তথা) অত্যজিঘাংসৎ(লোকপালান্ অতীত্য গন্তুম্ ঐচ্ছৎ, পলায়িতুম্ ঐচ্ছৎ ইত্যর্থঃ)।[লোকপালসমষ্টিলক্ষণঃ পিণ্ডস্তু] বাচা(বাগিন্দ্রিয়েণ বচনেনেত্যর্থঃ) অজিঘৃক্ষৎ(তৎ গ্রহীতুম্ ঐচ্ছৎ); [কিন্তু] বাচা তৎ গ্রহীতুৎ ন অশক্রোৎ(শক্তঃ ন বতূব)। সঃ(প্রথমজঃ পুরুষঃ) যৎ(যদি) হ এনৎ(অন্নং) বাচা অগ্রহৈষ্যৎ(গ্রহীতুৎ সমর্থ: অভবিষ্যৎ), [তর্হি সর্ব্বো লোকঃ] অন্নম্ অভিব্যাহৃত্য(অন্নশব্দমাত্রম্ উচ্চার্য্য) এব হ অত্রপ্স্যৎ(তৃপ্তোহভবিষ্যৎ),[নতু তথা তৃপ্তো ভবতি ইতি ভাবঃ] ॥১২৷৷৩৷৷
মূলানুবাদ।[লোকপালদিগের ভক্ষণার্থ] সৃষ্ট সেই এই অন্ন পিছন দিকে ফিরিয়া তাঁহাদিগকে অতিক্রম করিতে ইচ্ছা করিয়াছিল
(অর্থাৎ সেখান হইতে পলায়ন করিতে চেষ্টা করিয়াছিল)।[এই দেখিয়া আদিপুরুষ] বাক্যদ্বারা সেই অন্ন গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিয়া- ছিলেন; কিন্তু বাক্যদ্বারা তাহা গ্রহণ করিতে পারিলেন না। আদিপুরুষ যদি কেবল বচনমাত্রেই অন্নগ্রহণ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে পরবর্তী লোকেরাও কেবল বচনপ্রয়োগেই(কথা দ্বারাই) তৃপ্তিলাভ করিতে পারিত(অন্নভক্ষণের আবশ্যক হইত না) ॥১২৷৷৩৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। তদেনৎ অন্নং লোক-লোকপালান্মার্থ্যভিমুখে সৃষ্টং সৎ, যথা মুষিকাদিৰ্ম্মার্জারাদিগোচরে সন্, মম মৃত্যুরন্নাদ ইতি মত্বা, পরাগঞ্চতীতি পরাঙ্, পরাক্ সৎ অত্তুন্ অতীত্য অজিঘাংসৎ অতিগন্তমৈচ্ছৎ, পলায়িতুৎ প্রারভতেত্যর্থঃ। তমন্নাভিপ্রায়ং মত্ত্বা স লোকলোকপালসংঘাতকার্য্যকরণলক্ষণঃ পিণ্ডঃ প্রথমজত্বাদন্যাংশান্নাদানপশ্যন্, তৎ অন্নং বাচা বদনব্যাপারেণ অজিঘৃক্ষৎ গ্রহীতুমৈচ্ছৎ। তৎ অন্নং নাশক্লোৎ ন সমর্থোহভবৎ বাচা বদনক্রিয়য়া গ্রহীতুম্ উপাদাতুম্। স প্রথমজঃ শরীরী যৎ যদি হ এনৎ বাচা অগ্রহৈষ্যৎ গৃহীতবান্ স্যাৎ অন্নম্, সর্ব্বোহপি লোকস্তৎকার্য্যভূতত্বাদ অভিব্যাহৃত্য হৈবান্নম্, অত্রপ্স্যৎ তৃপ্তোহভবিষ্যৎ; ন চৈতদন্তি; অতো নাশক্লোৎ বাচা গ্রহীতুমিত্যবগচ্ছামঃ পূর্ব্বজোহপি। সমানমুত্তরম্ ॥১২৷৷৩৷৷
ভাষ্যানুবাদ। সেই এই অন্নলাভে ইচ্ছুক লোক ও লোকপালদিগের সম্মুখে অন্ন আনিয়া দিলে পর, বিড়াল প্রভৃতির সম্মুখে পতিত ইঁদুর প্রভৃতি যেরূপ —‘ইহারা আমার ভক্ষক—মৃত্যুস্বরূপ’ এইরূপ মনে করিয়া সেখান হইতে পলায়ন করিতে থাকে সেইরূপ সেই অন্নও পরাক্—পিছন দিকে ফিরিয়া ভক্ষকদিগকে অতিক্রম করিয়া যাইতে ইচ্ছা করিয়াছিল, অর্থাৎ পলায়ন করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। সমস্ত লোক ও লোকপালগণের সমষ্টিভূত সেই পিণ্ড (আদিপুরুষ), তিনি প্রথমোৎপন্ন বলিয়া, তখন অন্য কোনও অন্নভোক্তা না দেখিয়া, নিজেই বাক্যদ্বারা—বাগিন্দ্রিয়ের কার্য্য বচনের সাহায্যে সেই পলায়মান অন্নকে ধরিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু তিনি কেবল বচন-দ্বারা অর্থাৎ কথামাত্রে সেই অন্ন গ্রহণ করিতে পারিলেন না। সেই প্রথমজ শরীরী যদি শুধু বচন দ্বারা অন্নগ্রহণ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে, তাহা হইতে উৎপন্ন সকল লোকই কেবল অন্ন-শব্দ উচ্চারণ করিয়াই তৃপ্তিলাভ করিত; প্রকৃতপক্ষে কিন্তু সেরূপ হয় না। আমাদের মনে হয়, এই নিমিত্তই প্রথমজ
পুরুষও কেবল বচন দ্বারা অন্ন গ্রহণ করিতে পারেন নাই। পরবর্তী শ্রুতিগুলির অর্থও এই প্রকার ॥১২৷৷৩৷৷
তৎ প্রাণেনাজিবৃক্ষং তন্নাশক্রোৎ প্রাণেন গ্রহীতুম্। স যদ্ধৈনৎ প্রাণেনাগ্রহৈষ্যদভিপ্রাণ্য হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ॥১৩৪॥
সরলার্থঃ। তথা, প্রাণেন(ঘ্রাণেন) তৎ অন্নম্ অজিঘৃক্ষৎ[প্রথমজঃ পুরুষঃ]; প্রাণেন তৎ গ্রহীতুং ন অশক্রোৎ। সঃ(প্রথমজঃ পুরুষঃ) যৎ (যদি) প্রাণেন এনৎ অগ্রহৈষ্যৎ,[তদা সর্ব্বো লোকঃ] অন্নম্ অভিপ্রাণ্য (অন্নে প্রাণব্যাপারং কৃত্বা) এব অত্রপ্স্যৎ ॥১৩৷৷৪৷৷
মূলানুবাদ। আগের মত প্রাণব্যাপার দ্বারাও সেই অন্নগ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন, কিন্তু প্রাণদ্বারা অন্নগ্রহণ করিতে পারিলেন না। তিনি যদি প্রাণের কার্য্য দ্বারাই অন্নগ্রহণ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে, অপর সকলেও কেবল প্রাণব্যাপার করিয়াই তৃপ্তিলাভ করিতে পারিত ॥১৩৷৪৷৷
তচ্চক্ষুষাজিবৃক্ষৎ তন্নাশক্রোচ্চক্ষুষা গ্রহীতুম্। স যদ্ধেন- চ্চক্ষুষাগ্রহৈষ্যদ্ দৃষ্ট্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ॥১৪॥৫॥
সরলার্থঃ। তৎ(অন্নং) চক্ষুষা অজিঘৃক্ষৎ[প্রথমজঃ পুরুষঃ] চক্ষুষা তৎ(অন্নং) গ্রহীতুং নাশক্লোৎ। সঃ[প্রথমজঃ] যৎ(যদি) চক্ষুষা (চক্ষুর্ব্যাপারমাত্রেণ) এনৎ(অন্নম্) অগ্রহৈষ্যৎ,[তদা সর্ব্বো লোকঃ] অন্নং দৃষ্ট্বা এব হ অত্রপ্স্যৎ।
মূলানুবাদ। প্রথমজ পুরুষ আবার চক্ষুদ্বারা অর্থাৎ কেবল দর্শনমাত্রে সেই অন্ন গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন; কিন্তু চক্ষু দ্বারা অন্ন গ্রহণ করিতে পারিলেন না। প্রথমজ পুরুষ যদি কেবল চক্ষু দ্বারা অন্ন গ্রহণ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে অপর সকলেও কেবল অন্ন দর্শন করিয়াই তৃপ্তি লাভ করিত ॥১৪৷৫৷৷
তচ্ছ্রোত্রেণাজিখৃৎ তন্নাশক্রোচ্ছ্রোত্রেণ গ্রহীতুম্। স যদ্ধৈনচ্ছ্রোত্রেণাগ্রহৈষ্যচ্ছ্রুত্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ॥১৫॥৬॥
সরলার্থঃ। শ্রোত্রেণ(শ্রবণমাত্রেণ) তৎ(অন্নম্) অজিঘৃক্ষৎ শ্রোত্রেণ তৎ গ্রহীতুং ন অশক্রোৎ।[সঃ প্রথমজঃ পুরুষঃ] যৎ(যদি) শ্রোত্রেণ এনৎ অগ্রহৈষ্যৎ,[তদা সর্ব্বোহপি লোকঃ] অন্নং শ্রুত্বা এব হ অত্রপ্স্যৎ ॥১৫৷৷৬৷৷
মূলানুবাদ। প্রথমজ পুরুষ শ্রোত্র(শ্রবণেন্দ্রিয়) দ্বারা সেই অন্ন গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন; কিন্তু শ্রবণ দ্বারা সে অন্নগ্রহণ করিতে পারিলেন না। প্রথমজ পুরুষ যদি কেবল শ্রবণমাত্রেই অন্ন গ্রহণ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে, অপর সকলেও কেবল শ্রবণ দ্বারাই তৃপ্তি লাভ করিত ॥১৫৷৬৷৷
তত্ত্বচাজিবৃক্ষৎ তন্নাশক্রোৎ ত্বচা গ্রহীতুম্। স যদ্ধেনৎ ত্বচাগ্রহৈষ্যৎ স্পৃষ্ট্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ॥১৬॥৭॥
সরলার্থঃ। তৎ(অন্নং) ত্বচা অজিঘৃক্ষৎ; ত্বচা তৎ গ্রহীতুং ন অশক্লোৎ। সঃ(প্রথমজঃ পুরুষঃ) যৎ(যদি) ত্বচা এনৎ অগ্রহৈষ্যৎ,[তদা সর্ব্বো লোকঃ] অন্নং স্পৃষ্টা এব হ অত্রপ্স্যৎ ॥১৬৷৷৭৷৷
মূলানুবাদ। প্রথমজ পুরুষ ত্বকের দ্বারা অর্থাৎ কেবল স্পর্শ দ্বারা সেই অন্ন গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন; কিন্তু ত্বকের দ্বারা অন্নগ্রহণ করিতে পারিলেন না। প্রথমজ পুরুষ যদি ত্বক দ্বারাই অন্ন গ্রহণ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে অপর সকলেও অন্ন স্পর্শ করিয়াই তৃপ্তিলাভ করিত ॥১৬৷৭৷৷
তন্মনাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্রোন্মনা গ্রহীতুম্। স যদ্ধৈ- নন্মনসাগ্রহৈষ্যদ্ধ্যাত্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ॥১৭॥৮॥
সরলার্থঃ। মনসা তৎ অজিঘৃক্ষৎ; মনসা(মনোব্যাপারমাত্রেণ) তৎ গ্রহীতুং ন অশক্রোৎ। সঃ(প্রথমজঃ পুরুষঃ) যৎ(যদি) মনসা এনৎ(অন্নম্) অগ্রহৈষ্যৎ,[তদা সর্ব্বো লোকঃ] অন্নং ধ্যাত্বা(চিন্তয়িত্বা) এব হ অত্রপৃস্যৎ ॥১৭৷৷৮॥
মূলানুবাদ। প্রথম পুরুষ মন দ্বারা অর্থাৎ মানসিক
সংকল্পের সাহায্যে সেই অন্ন গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন; কিন্তু মন দ্বারা তাহা গ্রহণ করিতে পারেন নাই। প্রথমজ পুরুষ যদি কেবল মন দ্বারা অন্ন গ্রহণ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে অপর সকল লোকও কেবল অন্ন চিন্তা করিয়াই তৃপ্তিলাভ করিতে পারিত(ভোজন করিবার আবশ্যক হইত না) ॥১৭৷৮৷৷ তচ্ছিন্নাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্রোচ্ছিন্না গ্রহীতুম্। স যদ্ধেন- চ্ছিন্নাগ্রহৈষ্যদ্বিসৃজ্য হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ॥১৮॥৯॥
সরলার্থঃ। শিশ্নেন(পুংশ্চিহ্নে) তৎ অজিঘৃক্ষৎ; শিশ্নেন তৎ গ্রহীতুং ন অশক্রোৎ। সঃ(প্রথমজঃ পুরুষঃ) যৎ(যদি) শিশ্নেন এনৎ অগ্রহৈষ্যৎ,[তদা সর্ব্বো লোকঃ] অন্নং বিসৃজ্য(বিসর্গং কৃত্বা) এব হ অত্রপ্স্যৎ ॥১৮৷৷॥
মূলানুবাদ। প্রথমজ পুরুষ তখন শিশুর দ্বারা(জননেন্দ্রিয়ের দ্বারা) সেই অন্ন গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন; কিন্তু শিশ্ন দ্বারা অন্ন গ্রহণ করিতে পারিলেন না। প্রথমজ পুরুষ যদি শিশ্ন দ্বারা অন্ন গ্রহণ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে অপর লোকও কেবল অন্ন বিসর্গ (দান) করিয়াই তৃপ্তিলাভ করিত ॥১৮৷৯৷৷
তদপানেনাজিবৃক্ষৎ তদাবয়ৎ। সৈষোহমস্য গ্রহো যদ্বায়ু- রন্নায়ুর্ব্বা এষ যদ্বায়ুঃ॥১৯৷১০॥
সরলার্থঃ। তথা, অপানেন তৎ(অন্নম্) অজিঘৃক্ষৎ; তৎ(অন্নম্) আবয়ৎ(জগ্রাহ—অশিতবান্);[তেন হেতুনা] স এষঃ(বক্ষ্যমাণঃ) অন্নস্য গ্রহঃ(গ্রাহকঃ), যৎ(সঃ) বায়ুঃ(অপানঃ বায়ুঃ)। যৎ(যঃ) বায়ুঃ (অপানঃ), এষঃ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) অন্নায়ুঃ(অন্নজীবনঃ অন্নোপ- জীবীত্যর্থঃ) ॥১৯৷৷১০॥
মূলানুবাদ।[প্রথমজ পুরুষ আবার] অপান দ্বারা(অপান বায়ুর কার্য্য অধঃকরণ দ্বারা) সেই অন্ন গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন; এবং তাহা দ্বারাই অন্ন গ্রহণ করিতে অর্থাৎ ভোজন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। এই যে অপান বায়ু, ইহাই অন্নের গ্রহ অর্থাৎ অন্নের গ্রহণ বা ভোজনকারী; কারণ, এই যে বায়ু, ইহাই অন্নজীবন বলিয়া প্রসিদ্ধ ॥১৯৷৷১০৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। তৎ প্রাণেন তচ্চক্ষুষা তচ্ছ্রোত্রেণ তত্ত্বচা তন্মনসা তচ্ছিন্নেন —তেন তেন করণব্যাপারেণান্নং গ্রহীতুমশক্রুবন্ পশ্চাদপানেন বায়ুনা মুখচ্ছিদ্রেণ তদন্নমজিঘৃক্ষৎ, তদাবয়ৎ তদন্নমেবং জগ্রাহাশিতবান্। তেন স এষঃ অপান- বায়ুরন্নস্য গ্রহঃ অন্নগ্রাহক ইত্যেতৎ। যদ্বায়ুঃ যো বায়ুঃ অন্নায়ুঃ অন্নবন্ধনোহন্ন- জীবনঃ বৈ প্রসিদ্ধঃ, স এষঃ, যো বায়ুঃ ॥১৩—১৯৷৪—১০॥
ভাষ্যানুবাদ। এইরূপ প্রাণ(ঘ্রাণ), চক্ষু, শ্রোত্র(কর্ণ), ত্বক্, মন ও শিশ্নদ্বারা—অধিক কি, কোন ইন্দ্রিয়ব্যাপারদ্বারাই সেই অন্ন গ্রহণ করিতে না পারিয়া, শেষে অপান বায়ুদ্বারা মুখরন্ধ্রের(মুখের গর্ত্তের) সাহায্যে সেই অন্ন গ্রহণ করিয়াছিলেন; এই প্রকারে সেই অন্ন ভক্ষণ করিয়াছিলেন। সেই কারণে এই অপানবায়ু ‘অন্নের গ্রহ’ অন্নের গ্রাহক ও অন্নায়ুঃ—অন্নবন্ধন বা অন্নজীবী বলিয়া যে বায়ু প্রসিদ্ধ, ইহাই সেই বায়ু ॥৪॥১০॥
স ঈক্ষত কথং ন্বিদং মদৃতে স্যাদিতি; স ঈক্ষত কতরেণ প্রপদ্যা ইতি। স ঈক্ষত যদি বাচাভিব্যাহৃতং যদি প্রাণে- নাভিপ্রাণিতং যদি চক্ষুষা দৃষ্টং যদি শ্রোত্রেণ শ্রুতং যদি ত্বচা স্পৃষ্টং যদি মনসা ধ্যাতং যদ্যপানেনাভ্যপানিতং যদি শিশ্নেন বিসৃষ্টমথ কোহহমিতি ॥২০॥১১৷৷
সরলার্থঃ। সঃ(পরমেশ্বরঃ)[এবং লোকস্থিতিহেতুভূতম্ অন্নং সৃষ্টা] ঈক্ষত-ইদং(ময়া সৃষ্টং দেহেন্দ্রিয়াদি-সংঘাতরূপৎ কার্য্যং) মৎ ঋতে(মাং স্বামিনং বিনা) কথং(কেন প্রকারেণ) স্যাৎ(সার্থকং ভবেৎ? ন হি ভোক্তারমন্তরেণ ভোগ্যং বস্তু সার্থকং ভবতীতি ভাবঃ) ইতি; পুনঃ সঃ ঈক্ষত -যদি বাচা অভিব্যাহৃতং(মামনুপাদায় কেবলং বাচৈব বাগব্যবহারাদিকৎ সম্পন্নং ভবেৎ; এবমুত্তরত্রাপি), যদি প্রাণেন অভিপ্রাণিতৎ, যদি চক্ষুষা দৃষ্টং, যদি শ্রোত্রেণ শ্রুতং, যদি ত্বচা স্পৃষ্টং, যদি মনসা ধ্যাতং, যদি অপানেন অভ্যপানিতং, যদি শিন্নেন বিসৃষ্টম্, অথ(তদা) অহং(পরমেশ্বরঃ) কঃ?(দেহেন্দ্রিয়াদি- সংঘাতেন মম কিয়ান্ সম্বন্ধঃ)।[অতঃ পুনরপি] সঃ ঈক্ষত-কতরেণ(দ্বয়োঃ প্রবেশদ্বারয়োঃ মূর্দ্ধ-পাদাশ্রয়য়োমধ্যে কেন দ্বারেণ) প্রপদ্যৈ(প্রবেশং কুৰ্যাম)? ইতি ॥২০॥১১॥
মূলানুবাদ। সেই পরমেশ্বর চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, আমার অভাবে অর্থাৎ আমি ইহার ভিতরে প্রবিষ্ট না থাকিলে, আমার সৃষ্ট এই দেহেন্দ্রিয়সমষ্টি কি প্রকারে থাকিবে? অর্থাৎ সম্পূর্ণ নিরর্থক হইয়া যাইবে। বিশেষতঃ যদি বাগিন্দ্রিয়ই শব্দোচ্চারণ করিল, যদি প্রাণ প্রাণন(জীবন কার্য্য সম্পাদন) করিল, যদি চক্ষুই দর্শন করিল, যদি শ্রবণেন্দ্রিয়(কর্ণই) শ্রবণ কার্য্য করিল, যদি ত্বগিন্দ্রিয়(চর্ম্মই) স্পর্শন কার্য্য করিল, মনই যদি চিন্তা করিল, অপান যদি অধোনয়ন (নিম্নদিকে চালনা) করিল, এবং শিশ্নই যদি শুক্রত্যাগ করিল, তাহা হইলে,[এই দেহে] আমি কে? অর্থাৎ দেহের সহিত আমার আর কি সম্বন্ধ রহিল?[অতএব এই দেহে আমার প্রবেশ করা উচিত। এইরূপ স্থির করার পর] তিনি চিন্তা করিতে লাগিলেন যে,[দেহমধ্যে প্রবেশের দুইটি পথ আছে—একটি মূর্দ্ধা(মস্তকের উপরিভাগ), অপরটি চরণের অগ্রভাগ, এই দুই পথের কোন্ পথে আমি প্রবেশ করিব? ॥২০॥১১৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। স এবং লোকলোকপালসঙ্ঘাতস্থিতিম্ অন্ননিমিত্তাং কৃত্বা পুরপৌর-তৎপালয়িতৃস্থিতিসমাং স্বামীর ঈক্ষত-কথং নু কেন প্রকারেণ, নু ইতি বিতর্কয়ন্, ইদং মৎ ঋতে মামন্তরেণ পুরস্বামিনং; যদিদং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতকাৰ্য্যৎ বক্ষ্যমাণং, কথং নু খলু মামন্তরেণ স্যাৎ পরার্থং সৎ। যদি বাচাভিব্যাহৃতমিত্যাদি কেবলমেব বাগব্যবহরণাদি, তন্নিরর্থকং ন কথঞ্চন ভবেৎ বলিস্তত্যাদিবৎ; পৌরবন্দ্যাদিভিঃ প্রযুজ্যমানং স্বাম্যর্থং সৎ স্বামিনমন্তরেণ অসত্যেব স্বামিনি, তদ্বৎ। তস্মান্ময়া পরেণ স্বামিনাধিষ্ঠাত্রা কৃতাকৃতফলসাক্ষিভূতেন ভোক্ত্রা ভবিতব্যং পুরস্যেব রাজ্ঞা।
যদি নামৈতৎ সংহতকার্য্যস্য পরার্থত্বম্, পরার্থিনং মাং চেতনং ত্রাতারমন্তরেণ ভবেৎ, পুরপৌরকার্য্যমিব তৎস্বাধিনম্। অথ কোহহং কিংস্বরূপঃ কস্য বা স্বামী? যদ্যহং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতমনুপ্রবিশ্য বাগাদ্যভিব্যাহৃতাদিফলং নোপলভেয়, রাজেব পুরমাবিশ্যাধিকৃতপুরুষ-কৃতাক্বতাদিলক্ষণং, ন কশ্চিন্মাম্ অয়ং সন্ এবংরূপশ্চেতি অধিগচ্ছেদ্বিচারয়েৎ। বিপর্যরে তু, যোহয়ং বাগাদ্যভিব্যাহৃতাদি ইদমিতি
বেদ, স সন্ বেদনরূপশ্চেত্যধিগন্তব্যোহহং স্যাম্, যদর্থমিদৎ সংহতানাং বাগাদীনামভিব্যাহৃতাদি। যথা স্তম্ভকুড্যাদীনাং প্রাসাদাদিসংহতানাং স্বাবয়বৈরসংহত-পরার্থত্বং তদ্বদিতি। এবমীক্ষিত্বা, অতঃ কতরেণ প্রপদ্যা ইতি। প্রপদং চ মুর্দ্ধা চাস্য সংঘাতস্য প্রবেশমার্গো; অনয়োঃ কতরেণ মার্গেণেদং কার্য্যকরণসংঘাতলক্ষণং পুরং প্রপদ্যৈ প্রপদ্যে ইতি ॥২০॥১১৷
ভাষ্যানুবাদ। নগরাধিপতি যেরূপ নগর, নগরবাসী ও নগররক্ষকদিগের স্থিতির উপায় বিধান করেন, পরমেশ্বরও সেইরূপ বিভিন্ন লোক(স্থান) ও লোকপালদিগের শরীর রক্ষার জন্য অন্ন সৃষ্টি করিয়া(নগরাধিপতির ন্যায়) বিচারপূর্ব্বক এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন-(নু শব্দটি বিতর্কবোধক); নগরাধিপতির মত আমার অভাবে ইহা(আমার সৃষ্ট দেহ) কিপ্রকারে থাকিবে? এই যে দেহেন্দ্রিয়সংঘাত, ইহা যখন পরার্থ(১) তখন আমার অভাবে ইহা কি প্রকার হইবে? বাক্ প্রাণ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণ যে, শব্দোচ্চারণ প্রভৃতি কার্য্য সম্পাদন করে, তাহা ত লোকপ্রসিদ্ধ পূজা ও স্তুতিপ্রভৃতির ন্যায় উদ্দেশ্যহীনভাবে কোনমতেই থাকিতে পারে না। অভিপ্রায় এই যে, নগরবাসী ও বন্দিপ্রভৃতিরা যে প্রভুর উদ্দেশ্যে স্তুতিপাঠ করে ও উপহার প্রদান করে, তাহা যেরূপ প্রভুর অভাবে বৃথা হয়, দেহব্যবহারও ঠিক সেইরূপ বৃথা হইবে। অতএব নগরস্বামীর ন্যায় দেহস্বামী আমাকেও কৃত ও অকৃত কর্মের সাক্ষিরূপে অধিষ্ঠান করিয়া ভোক্তারূপে অবস্থান করিতে হইবে। পক্ষান্তরে, অবয়ব-সংঘাতময়(অবয়বসমষ্টি দ্বারা গঠিত) এই দেহ যখন নিশ্চয়ই পরার্থ অর্থাৎ পরের প্রয়োজন সিদ্ধির নিমিত্তই রচিত, তখন নগরের স্বামী অর্থাৎ অধিপতির উদ্দেশ্যে কৃত নগর ও
নগরবাসীদিগের অনুষ্ঠিত কার্য্য যেমন স্বামীর অভাবে বিফল হয়, তেমনি পরার্থে রচিত এই দেহও রক্ষা করিতে সমর্থ চেতন কর্তার অভাবে বিফল হইবে। তাহার পর এই দেহে আমিই বা কে? আমি কাহার স্বামী? রাজা যদি নিজ নগরে প্রবেশ করিয়া কর্মচারিগণের কৃত ও অকৃত কৰ্ম্ম নিজ চোখে না দেখেন, তাহা হইলে, তাহার যেরূপ অবস্থা হয়, সেইরূপ আমিও যদি দেহেন্দ্রিয়সংঘাতের মধ্যে প্রবেশ করিয়া বাক্ প্রভৃতির কৃত শব্দাদি ব্যাপার উপলব্ধি না করি, তাহা হইলে, কেহই আমার স্বরূপ ও প্রভাব এই ভাবে জানিতে পারিবে না--আমার সম্বন্ধে বিচার করিতে পারিবে না। ইহার বিপরীত হইলেই লোকে বুঝিতে পারিবে যে, যিনি বাক্ প্রভৃতির শব্দোচ্চারণাদি কার্য্য ঠিকমত অনুভব করেন, তিনি সৎ ও জ্ঞানস্বরূপ; তাঁহার উদ্দেশ্যেই সংঘাতময় বাক্প্রভৃতির শব্দোচ্চারণাদি কার্য্য নির্দিষ্ট হইয়াছে। স্তম্ভ কুড্য(কুটীর) প্রভৃতি অবয়ব- সমষ্টির সম্মেলনে নির্মিত প্রাসাদ প্রভৃতি অবয়ববিশিষ্ট পদার্থসমূহ যেরূপ অসংহত অপর কোনও বস্তুর উপকারে লাগে, এই দেহসংঘাতও ঠিক সেইরূপ।
এই প্রকার আলোচনার পর, তিনি চিন্তা করিলেন যে, এই দেহমধ্যে প্রবেশ করিবার দ্বার দুইটি—এক প্রপদ(পায়ের অগ্রভাগ), দ্বিতীয় মূর্দ্ধা(মস্তকের উপরিভাগ); অতএব আমি এই দুইটির মধ্যে কোন্ পথে ইন্দ্রিয়াদি-সংঘাতময় (ইন্দ্রিয় ইত্যাদির সমষ্টিস্বরূপ) এই দেহ-পুরে প্রবেশ করিব? ॥২০॥১১॥
স এতমেব সীমানং বিদার্য্যৈতয়া দ্বারা প্রাপদ্যত। সৈষা বিদৃতির্নাম দ্বাস্তদেতন্নানন্দনম্। তস্য ত্রয় আবসথাস্ত্রয়ঃ স্বপ্না অয়মাবসথোহয়মাবসথোহয়মাবসথ ইতি ॥২১৷৷১২৷৷
সরলার্থঃ। সঃ(পরমেশ্বরঃ),[এবমীক্ষিত্বা] এতং সীমানৎ(মূর্দ্ধানং) বিদার্য্য(দ্বিধা কৃত্বা), এতয়া দ্বারা(মূর্দ্ধলক্ষণেন দ্বারেণ) প্রাপদ্যত(ইমৎ দেহৎ প্রবিবেশ)। সা এষা(মূর্দ্ধরূপা) বিদৃতিঃ নাম(বিদারণাৎ বিদৃতিনাম্না প্রসিদ্ধা) দ্বাঃ(দ্বারম্); তৎ এতৎ(মূর্দ্ধাখ্যং দ্বারং) নান্দনং(নন্দতি অনেনেতি নন্দনং, নন্দনমেব নান্দনম্)।
তস্য(মূর্ধানং বিদার্য্য জীবভাবেন দেহং প্রবিষ্টস্য পরমেশ্বরস্য) ত্রয়ঃ আবসথাঃ (বাসস্থানানি—জাগরণকালে দক্ষিণং চক্ষুঃ স্বপ্নসময়ে অন্তর্মনঃ সুষুপ্তিসময়ে চ হৃদয়াকাশঃ; অথবা পিতৃশরীরং, মাতৃগর্ভাশয়ঃ, স্বশরীরঞ্চেতি), তথা ত্রয়ঃ স্বপ্নাঃ
(প্রসিদ্ধা জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্ত্যাখ্যাঃ)। অয়ম্ আবসথঃ, অয়ম আবসথঃ, অয়ম্ আবসথঃ ইতি(পূর্ব্বোক্তানামেবাবসথানাং অঙ্গুল্যা নির্দেশঃ) ॥২১৷৷১২৷৷
মূলানুবাদ। পরমেশ্বর এইরূপ চিন্তার পর এই মূর্দ্ধদেশ বিদীর্ণ করিয়া সেই পথে দেহে প্রবেশ করিলেন। সেই দ্বারটি বিদৃতি নামে প্রসিদ্ধ;(কারণ, ইহা পরমেশ্বর কর্তৃক বিদারিত দ্বার)। সেই এই দ্বারটি নান্দন—আনন্দদায়ক। এইরূপ জীবভাবে দেহে প্রবিষ্ট পরমেশ্বরের বাসস্থান তিনটি—(১) জাগরণ-কালে দক্ষিণ চক্ষুঃ, (২) স্বপ্নকালে অন্তঃকরণ—মনঃ,(৩) সুষুপ্তিসময়ে(গভীর নিদ্রাকালে) হৃদয়াকাশ; অথবা পিতৃশরীর, মাতৃগর্ভ ও নিজ দেহ, এই তিনটি। তাহার স্বপ্নও তিন প্রকার(১) জাগরণ,(২) স্বপ্ন ও(৩) সুষুপ্তি। ইহা আবসথ, ইহা আবসথ, ইহা আবসথ বলিয়া উক্ত বাসস্থান তিনটিকেই পুনর্ব্বার নির্দেশ করা হইয়াছে ॥২১৷৷১২৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। এবমীক্ষিত্বা ন তাবদ্ মদ্ভৃত্যস্য প্রাণস্য মম সর্ব্বার্থাধিকৃতস্য প্রবেশমার্গেণ প্রপদাভ্যামধঃ প্রপদ্যে। কিং তর্হি, পারিশেষ্যাদস্য মূর্দ্ধানং বিদার্য্য প্রপদ্যে ইতি লোক ইব ঈক্ষিতকারী যঃ স্রষ্টেশ্বরঃ, স এতমেব মূর্দ্ধসীমানং কেশবিভাগাবসানং বিদার্য্য ছিদ্রৎ কৃত্বা এতয়া দ্বারা মার্গেণ ইমং কার্য্যকরণসংঘাতং প্রাপদ্যত প্রবিবেশ। ১
সেয়ং হি প্রসিদ্ধা দ্বাঃ, মুন্নি তৈলাদিধারণকালে অন্তস্তদ্রসাদিসংবেদনাৎ। সৈষা বিদৃতিঃ বিদারিতত্বাদ বিদৃতির্নাম ‘প্রসিদ্ধা দ্বাঃ। ইতরাণি তু শ্রোত্রাদিদ্বারাণি ভৃত্যাদিস্থানীয়সাধারণমার্গত্বাৎ ন সমৃদ্ধীনি নানন্দহেতুনি। ইদং তু দ্বারং পরমেশ্বরস্যৈব কেবলস্যেতি। তদেতৎ নানন্দনং নন্দনমেব নান্দনমিতি, দৈর্ঘ্যং ছান্দসম্। নন্দত্যনেন দ্বারেণ গত্বা পরস্মিন্ ব্রহ্মণীতি। ২
তস্যৈবং সৃষ্ট্বা প্রবিষ্টস্য অনেন জীবেনাত্মনা রাজ্ঞ ইব পুরম্, ত্রয় আবসথাঃ- জাগরিতকালে ইন্দ্রিয়স্থানং দক্ষিণং চক্ষুঃ, স্বপ্নকালে অন্তর্মনঃ, সুষুপ্তিকালে হৃদয়াকাশ ইত্যেতে; বক্ষ্যমাণা বা ত্রয় আবসথাঃ-পিতৃশরীরৎ, মাতৃগর্ভাশয়ঃ, স্বঞ্চ শরীরমিতি। ত্রয়ঃ স্বপ্নাঃ-জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্ত্যাখ্যাঃ। ননু জাগরিতং
প্রবোধরূপত্বাৎ ন স্বপ্নঃ। নৈবং, স্বপ্ন এব। কথম্? পরমার্থস্বাত্ম- প্রবোধাভাবাৎ স্বপ্নবদসদ্বস্তুদর্শনাচ্চ। অয়মেবাবসথশ্চক্ষুদ্দক্ষিণং প্রথমঃ। মনোহন্তরৎ দ্বিতীয়ঃ। হৃদয়াকাশস্তৃতীয়ঃ। অয়মাবসথ ইত্যুক্তানুকীর্ত্তনমেব। তেষু হ্যয়মাবসথেযু পর্যায়েণাত্মভাবেন বর্তমানোহবিদ্যয়া দীর্ঘকালং গাঢ়ৎ প্রসুপ্তঃ স্বাভাবিক্যা, ন প্রবুধ্যতেহনেকশতসহস্রানর্থসন্নিপাতজদুঃখ-মুদগরা- ভিঘাতানুভবৈরপি ॥২১৷৷১২৷৷
ভাষ্যানুবাদ। এই প্রকার আলোচনার পর পরমেশ্বর স্থির করিলেন যে, আমার সর্ব্বকর্মে অধিকারপ্রাপ্ত ভৃত্যস্থানীয় প্রাণ যে পথে প্রবেশ করিয়াছে, সেই নিম্নে অবস্থিত চরণের অগ্রভাগ দ্বারা প্রবেশ করিব না; তবে কি? না, চরণের অগ্রভাগ ত্যাগ করিয়া, অবশিষ্ট মূর্দ্ধভাগ বিদারণ করিয়া(মস্তক ভেদ করিয়া) প্রবেশ করিব। জগতে বিবেচক পুরুষ যেরূপ করিয়া থাকেন, যিনি সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বর, তিনিও সেইরূপই চিন্তা করিয়া, এই মূর্দ্ধসীমা—যেখান হইতে কেশরাশি বিভক্ত হইয়াছে, সেই স্থানটি বিদীর্ণ করিয়া, সেই স্থানে ছিদ্র করিয়া, সেই দ্বারপথে এই দেহেন্দ্রিয়-সংঘাতে প্রবেশ করিলেন। ১
সেই এই রন্ধ্রটি একটি প্রসিদ্ধ দ্বার; কেননা, মস্তকে তৈলাদি তরল দ্রব্য ধারণ করিলে, তাহা ঐ পথেই ভিতরে প্রবেশ করিয়া থাকে। ইহার আর এক নাম বিদৃতি; ঈশ্বরকর্তৃক বিদারিত হইয়াছে বলিয়া এই দ্বারদেশ বিদৃতি নামে প্রসিদ্ধ। ইহা ছাড়া কর্ণ প্রভৃতি দ্বারগুলি ভৃত্যাদিস্থানীয় সাধারণ দ্বার মাত্র; এই কারণে সে সমুদয় দ্বার আনন্দদায়ক নহে; এটি কিন্তু কেবল পরমেশ্বরেরই প্রবেশ-দ্বার; সুতরাং অসাধারণ; এই জন্যই নান্দন(নন্দন) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আনন্দদায়ক। বৈদিক ব্যাকরণের নিয়মে ‘নন্দন’ শব্দের অকার দীর্ঘ(‘নান্দন’) হইয়াছে। লোক যে পথে ব্রহ্ম লাভ করিয়া আনন্দিত হয়, তাহার নাম নান্দন।২
নগরাধিপতি রাজার ন্যায় এই প্রকারে জীবভাবে প্রবিষ্ট সেই পরমেশ্বরের আবসথ-বাসস্থান তিনটি।(১) জাগ্রদবস্থায় ইন্দ্রিয়স্থান দক্ষিণ চক্ষুঃ,(২) স্বপ্ন-সময়ে ভিতরে অবস্থিত মনঃ,(৩) সুষুপ্তি-সময়ে হৃদয়াকাশ, এই তিনটি; অথবা বক্ষ্যমাণ(পরে যাহাদের কথা বলা হইবে, সেই) তিনটি আবসথ- (১) পিতৃশরীর(২) মাতৃগর্ভাশয়(৩) নিজ শরীর। তিনটি স্বপ্ন অর্থে- (১) জাগ্রৎ,(২) স্বপ্ন,(৩) সুষুপ্তি(গভীর নিদ্রা) গ্রহণ করিতে হইবে। এখন প্রশ্ন হইতেছে এই যে, জাগ্রদবস্থা যখন প্রবোধাত্মক(জ্ঞান স্বরূপ)
তখন উহা ত স্বপ্ন(নিদ্রা) হইতেই পারে না? না, এরূপ প্রশ্ন হইতে পারে না; উহা স্বপ্নই বটে। উহা স্বপ্ন কি প্রকারে?[উত্তর-] যেহেতু উহাতে পরমার্থ- সত্য আত্মবিষয়ক বোধ থাকে না, এবং স্বপ্নের মত অসত্য পদার্থ ই দৃষ্ট হইয়া থাকে। তিনটি আবসথের মধ্যে এই দক্ষিণ চক্ষুই প্রথম, অন্তঃকরণ মনঃ দ্বিতীয়, এবং হৃদয়াকাশ তৃতীয় আবসথ। শ্রুতিতে যে, তিনবার ‘আবসথ’ শব্দের উল্লেখ রহিয়াছে, তাহা কথিতেরই অনুবাদ(পুনরুক্তি) মাত্র। সেই এই পরমেশ্বর জীবভাবে উক্ত তিনটি স্থানে যথাক্রমে অবস্থান করিয়া স্বাভাবিক বা অনাদি অবিদ্যা দ্বারা দীর্ঘকাল গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত থাকেন, বহু শত সহস্র অনিষ্টপাতের ফলে দুঃখময় মুদগরের আঘাত অনুভব করিয়াও জাগরিত (আত্মজ্ঞান সম্পন্ন) হন না ॥২১৪৷৷
স জাতো ভূতান্যভিব্যখ্যাৎ কিমিহান্যং বাবদিষদিতি। স এতমেব পুরুষং ব্রহ্ম ততমমপশ্যদিদমদর্শমিতী ৩॥২২৷৷১৩৷৷
সরলার্থঃ। সঃ(পরমেশ্বরঃ) জাতঃ(দেহপ্রবেশেন জীবভাবং গতঃ সন্) ভূতানি(আকাশাদীনি) অভিব্য্যেখ্যৎ(জ্ঞাতবান, ‘মনুষ্যোহহম্’ ইত্যাদি প্রকারেণ জ্ঞাতবান্। ভূতানাম্ আকাশাদীনাং প্রাণিদেহানাং চ সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়ান্ চিন্তিতবান্)। সঃ(জীবঃ) ইহ(শরীরে) অন্যং(স্বব্যতিরিক্তং) কিং বাবদিষৎ(উক্তবান, নান্যৎ কিমপীতি ভাবঃ), ইতি(এতস্মাৎ হেতোঃ, ভূতানি অভিব্যৈখ্যৎ ইতি সম্বন্ধঃ)। সঃ(জীবঃ)[কদাচিৎ শাস্ত্রাচার্য্যোপদেশবশেন] এতং(প্রকৃতং সৃষ্ট্যাদিকর্তারং) পুরুং(পুরি হৃদয়পুণ্ডরীকে শয়ানং) এব ততমং(তততমং অতিশয়েন ব্যাপকং) ব্রহ্ম(ব্রহ্মস্বরূপৎ) অপশ্যৎ(প্রত্যবুধ্যত) ইদং(ব্রহ্ম) অদর্শম্(দৃষ্টবান্ অস্মি) ইত্যর্থঃ ॥২২৷৷১৩৷৷
মূলানুবাদ। সেই পরমেশ্বর জন্মগ্রহণ করিয়া অর্থাৎ জীবরূপে দেহে প্রবিষ্ট হইয়া সমস্ত ভূতকে ও প্রাণিদেহকে নিজস্বরূপে জানিয়াছিলেন, এবং আমি মনুষ্য ব্রাহ্মণ ইত্যাদি রূপে উক্তিও করিয়াছিলেন। এই শরীরে তিনি অন্য কাহারই বা কথা বলিবেন? তিনি[জীবরূপে অবস্থান করিয়া] সৃষ্টি স্থিতি সংহারের কারণস্বরূপ উক্ত পুরুষকেই পরিপূর্ণ বা সর্বব্যাপী ব্রহ্মরূপে দর্শন করিয়াছিলেন— আমি আমার স্বরূপ(ব্রহ্মভাব) দর্শন করিয়াছি বলিয়া প্রতিবোধ (জ্ঞান) লাভ করিয়াছিলেন ॥২২৷৷১৩৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। স জাতঃ শরীরে প্রবিষ্টো জীবাত্মনা ভূতানি অভিব্য্যেখ্যৎ ব্যাকরোৎ। স কদাচিৎ পরমকারুণিকেনাচার্য্যেণ আত্মজ্ঞানপ্রবোধকৃচ্ছবিকায়াং বদান্ত-মহাভের্য্যাৎ তৎকর্ণমূলে তাড্যমানায়াম্, এতমেব সৃষ্ট্যাদিকর্তৃত্বেন প্রকৃতং পুরুষং পুরি শয়ানমাত্মানং ব্রহ্ম-বৃহৎ ততমং-তকারেণৈকেন লুপ্তেন তততমং ব্যাপ্ততবং পরিপূর্ণমাকাশবৎ প্রত্যবুধ্যত অপশ্যৎ। কথম্? ইদং ব্রহ্ম মম আত্মনঃ স্বরূপমদর্শং দৃষ্টবানস্মি। অহো ইতি। বিচারণার্থা প্লুতিঃ পূর্ব্বম্ ॥২২৷১৩৷৷
ভাষ্যানুবাদ। সেই পরমেশ্বর জন্মগ্রহণ করিয়া অর্থাৎ জীবাত্মা-রূপে দেহমধ্যে প্রবেশ করিয়া ভূত-সমূহকে(জীব সকলকে) ব্যাকৃত করিয়াছিলেন, অর্থাৎ সমস্ত ভূতকে নিজের সহিত একাত্মক বলিয়া জানিয়াছিলেন। সেই জীব কোন সময় পরম দয়ালু আচার্য্য কর্তৃক—যাহার শব্দে আত্ম-জ্ঞান জাগরিত হয়, সেই বেহান্ত বাক্যরূপ মহাভেরি কানের কাছে বাজান হইতে থাকিলে, সেই জীব সৃষ্টিপ্রভৃতির কর্তারূপে বর্ণিত এই পুরুষকে অর্থাৎ হৃদয়-পুরে অবস্থিত আত্মাকে ততম(ততম) সর্ব্বব্যাপী পরিপূর্ণ ব্রহ্মরূপে দর্শন করিয়াছিলেন। ‘ততমম্’ শব্দে একটি ‘ত’ লোপ হইয়াছে; বস্তুতঃ ‘তততমম্’ বুঝিতে হইবে। তিনি কি প্রকারে আত্মদর্শন করিয়াছিলেন? এই ব্রহ্মই আমার আত্মার যথার্থ স্বরূপ, এই ভাবে দর্শন করিয়াছিলেন,[এইরূপ প্রতিবোধ লাভ করিয়া- ছিলেন]। জ্ঞানবিষয়ে বিচার প্রকাশের জন্য ‘ইতী’ শব্দে প্লুতি তিনমাত্রার স্বর ব্যবহার হইয়াছে।[অভিপ্রায় এই যে, আমার ব্রহ্মজ্ঞান যথার্থ হইল কি না, এইরূপ বিচারের শেষে জ্ঞানের সত্যতা স্থির করিয়া আপনার কৃতার্থতা জানান হইয়াছে] ॥২২৷৷১৩৷৷
তস্মাদিদন্দ্রো নামেদন্দ্রো হ বৈ নাম তমিদন্দ্রং সন্তমিন্দ্র ইত্যাচক্ষতে পরোক্ষেণ। পরোক্ষপ্রিয়া ইব হি দেবাঃ পরোক্ষপ্রিয়া ইব হি দেবাঃ ॥২৩৷১৪৷৷
ইতি তৃতীয়ঃ খণ্ডঃ ॥১॥৩৷৷ ইত্যৈতরেয়োপনিষদি প্রথমোহধ্যায়ঃ ॥১॥ ইত্যৈতরেয়ব্রাহ্মণারণ্যকাণ্ডে দ্বিতীয়ারণ্যকে চতুর্থোহধ্যায়ঃ ॥৪॥
সরলার্থঃ। তস্মাৎ(যস্মাৎ ইদম্ ইত্যপরোক্ষতয়ৈব ব্রহ্ম দৃষ্টবৎ। জীবরূপি ব্রহ্ম, তস্মাৎ হেতোঃ), ইদন্দ্রঃ(ইদৎ পশ্যতীতি প্রত্যক্ষদর্শিত্বাৎ পরমাত্মা ইদন্দ্র- শব্দবাচ্যঃ)। ইদন্দ্রঃ হ বৈ নাম(ইত্যেতে নিপাতাঃ প্রসিদ্ধ্যর্থাঃ)।[এবঞ্চ] ইদন্দ্রং সন্তং(ইদন্দ্রনাম্না প্রসিদ্ধমপি) তৎ(পরমাত্মানং) পরোক্ষেণ (পরোক্ষার্থাভিধায়কেন পদেন) ইন্দ্র ইতি আচক্ষতে(ব্যবহারন্তি)[ব্রহ্মবিদ্বঃ; পরমপূজনীয়স্য প্রত্যক্ষনামগ্রহণস্যান্যাষ্যত্বাদিতি ভাবঃ]। হি(যতঃ) দেবাঃ (সুরাঃ) পরোক্ষপ্রিয়াঃ ইব(পরোক্ষনামগ্রহণে এব প্রীতাঃ)[ভবন্তি; তস্মাদেবং ব্যাচক্ষতে ইতি ভাবঃ। দ্বিরুক্তিরধ্যায়সমাপ্ত্যর্থ।] ॥২৩৷১৪৷
মূলানুবাদ। সেই হেতু—(যে হেতু পরমাত্মা জীবভাবে দেহে প্রবিষ্ট হইয়া আপনাকে ‘এই’(ইদম্) বলিয়া প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করিয়াছিলেন; সেই হেতু) তিনি ইদন্দ্র, ‘ইদন্দ্র’ নামে জগতে প্রসিদ্ধ। তিনি ইদন্দ্র হইলেও, ব্রহ্মবিদ্গণ তাঁহাকে পরোক্ষভাবে (ভঙ্গিক্রমে) ইন্দ্র নামে ব্যবহার করিয়া থাকেন। কারণ, দেবগণ সাধারণতঃ পরোক্ষ নাম গ্রহণেই সন্তুষ্ট হইয়া থাকেন।[অধ্যায়- সমাপ্তির জন্য শেষাংশের দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে] ॥২৩৷১৪৷
শাঙ্করভাষ্যম্। যস্মাদিদমিত্যেব যৎ সাক্ষাদপরোক্ষাদ্ব হ্ম সর্বান্তরমপশ্যৎ, ন পরোক্ষেণ; তস্মাদিদং পশ্যতীতি ইদন্দ্রো নাম পরমাত্মা। ইদন্দ্রো হ বৈ নাম প্রসিদ্ধো লোকে ঈশ্বরঃ। তমেবং ইদন্দ্রম্ সন্তম্ ইন্দ্র ইতি পরোক্ষেণ পরোক্ষাভিধানেনাচক্ষতে ব্রহ্মবিদঃ সংব্যবহারার্থম্, পূজ্যতমত্বাৎ প্রত্যক্ষনাম- গ্রহণভয়াৎ। তথাহি পরোক্ষপ্রিয়াঃ পরোক্ষ-নামগ্রহণপ্রিয়া ইব এব হি যস্মাৎ দেবাঃ। কিমুত সর্ব্বদেবানামপি দেবো মহেশ্বরঃ। দ্বিব্বচনং প্রকৃতাধ্যায়- পরিসমাপ্ত্যর্থম্ ॥২৩৷১৪৷৷
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দভগবৎ-পূজ্যপাদ-শিষ্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ ঐতরেয়োপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমোহধ্যায়ঃ ॥১॥
ভাষ্যানুবাদ। যে হেতু ‘ইদম্’(এই) ইত্যাকারে, অর্থাৎ সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ ভাবেই সকলের অন্তরে অবস্থিত, ব্রহ্মকে দর্শন করিয়াছিলেন, কিন্তু পরোক্ষভাবে নহে, সেই হেতু ‘ইহাকে দর্শন করেন’ এইরূপ অর্থে এই পরমাত্মা ইদন্দ্র নামে প্রসিদ্ধ। পরমেশ্বর জগতে ইদন্দ্রনামেই প্রসিদ্ধ। তিনি এই প্রকারে ইদন্দ্র হইলেও, ব্রহ্মবিদ্গণ ব্যবহার কালে তাঁহাকে পরোক্ষবাচক ইন্দ্রনামে অভিহিত করিয়া থাকেন; কারণ, তিনি পরম পূজনীয়, এইজন্যই তাঁহার সাক্ষাৎ নাম গ্রহণে ভয় আছে। দেবগণ যখন সাধারণতঃ পরোক্ষপ্রিয় অর্থাৎ পরোক্ষ নাম গ্রহণই ভালবাসেন, তখন সর্ব্বদেবতার অধিপতি পরমেশ্বরের আর কথা কি? আরব্ধ- অধ্যায়ের সমাপ্তি বুঝাইতে দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে ॥২৩৷১৪৷৷
প্রথম অধ্যায়ে তৃতীয় খণ্ডের ভাষ্যানুবাদ ॥১॥৩॥
আভাষভাষ্যম্। অস্মিন্নধ্যায়ে এষ বাক্যাথঃ-জগদুৎপত্তিস্থিতিপ্রলয়- কৃদসংসারী সর্বজ্ঞঃ সর্ব্বশক্তিঃ সর্ব্ববিৎ সর্ব্বমিদং জগৎ স্বতোহন্যদ্বত্ত্বন্তরম্ অনুপাদায়ৈব আকাশাদিক্রমেণ সৃষ্ট্বা স্বাত্মপ্রবোধনার্থং সর্ব্বাণি চ প্রাণাদি- মচ্ছরীরাণি স্বয়ং প্রবিবেশ। প্রবিশ্য চ স্বমাত্মানং যথাভূতমিদং ব্রহ্মাত্মীতি সাক্ষাৎ প্রত্যবুধ্যত; তস্মাৎ স এব সর্ব্বশরীরেষক এবাত্মা, নান্য ইতি। অন্যোহপি “স ম আত্মা-ব্রহ্মাস্মীত্যেবং বিদ্যাৎ” ইতি, “আত্মা বা ইদমেক এবাগ্র আসীৎ” “ব্রহ্ম ততমম্” ইতি চোক্তম্। অন্যত্র চ সর্ব্বগতস্য সর্ব্বাত্মনো বালাগ্রমাত্রমপ্যপ্রবিষ্টং নাস্তি ইতি কথং সীমানং বিদার্য্য প্রাপদ্যত পিপীলিকের সুষিরম্? ১
ননু অত্যল্পমিদং চোদ্যম্; বহু চাত্র চোদয়িতব্যম্,—‘অকরণঃ সমীক্ষত।’ ‘অনুপাদায় কিঞ্চিলোকানসৃজত।’ ‘অভ্যঃ পুরুষৎ সমুদ্ধত্যামুচ্ছয়ৎ।’ তস্যাভি- ধ্যানান্মুখাদি নির্ভিন্নম্, মুখাদিভ্যশ্চাগ্ন্যাদয়ো লোকপালাঃ; তেষাঞ্চ অশনায়াদি- সংযোজনম্, তদায়তন-প্রার্থনম্, তদর্থং গবাদিপ্রদর্শনম্, তেষাঞ্চ যথায়তন- প্রবেশনম্, সৃষ্টস্যান্নন্য পলায়নম্, বাগাদিভিস্তজ্জিঘৃক্ষা, এতৎ সর্ব্বং সীমাবিদারণ- প্রবেশসমমেব ॥২
অস্ত তহি সর্বমেবেদমনুপপন্নম্। ন, অত্রাত্মাববোধমাত্রস্য বিবক্ষিতত্বাৎ সর্ব্বোহয়মর্থবাদ ইত্যদোষঃ। মায়াবিবদ্বা;—মহামায়াবী দেবঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ব্বশক্তিঃ সর্ব্বমেতচ্চকার, সুখাববোধপ্রতিপত্যর্থং লোকবদাখ্যায়িকাদিপ্রপঞ্চ ইতি যুক্ততরঃ পক্ষঃ। নহি সৃষ্ট্যাখ্যায়িকাদিপরিজ্ঞানাৎ কিঞ্চিৎ ফলমিষ্যতে। ঐকাত্ম্যস্বরূপ- পরিজ্ঞানাত্তু অমৃতত্বং ফলং সর্ব্বোপনিষৎপ্রসিদ্ধম্। স্মৃতিষু চ গীতাদ্যানু—“সমৎ সর্ব্বেযু তৃতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্” ইত্যাদি ॥৩
ননু ত্রয় আত্মানঃ, ভোক্তা কর্তা সংসারী জীব একঃ সর্ব্বলোকশাস্ত্রপ্রসিদ্ধঃ। অনেকপ্রাণিকর্ম্মফলোপভোগযোগ্যানেকাধিষ্ঠানবল্লোকদেহনির্মাণেন লিদেন যথাশাস্ত্রপ্রদর্শিতেন—পুরপ্রাসাদাদিনির্মাণলিদেন তদ্বিষরকৌশলজ্ঞানবান্ তৎকর্তা তক্ষাদিরিব ঈশ্বরঃ সর্ব্বজ্ঞো জগতঃ কর্তা দ্বিতীয়শ্চেতন আত্মা অবগম্যতে। “যতো বাচো নিবর্তন্তে।” “নেতি নেতি” ইত্যাদিশাস্ত্রপ্রসিদ্ধ ঔপনিষদঃ
পুরুষস্তৃতীয়ঃ। এবমেতে ত্রয় আত্মানোহন্যোহন্যবিলক্ষণাঃ। তত্র কথমেক এবাত্মা অদ্বিতীয়োহসংসারীতি জ্ঞাতুং শক্যতে? তত্র জীব এব তাবৎ কথং জ্ঞায়তে? নম্বেবং জ্ঞায়তে শ্রোতা মন্তা দ্রষ্টা আদেষ্টাঘোষ্টা বিজ্ঞাতা প্রজ্ঞাতেতি ॥৪
ননু বিপ্রতিষিদ্ধং জ্ঞায়তে—যঃ শ্রবণাদিকর্তৃত্বেন অমতো মন্তা অবিজ্ঞাতো বিজ্ঞাতেতি চ। তথা “ন মতেৰ্ম্মন্তারং মন্ত্রীথা ন বিজ্ঞাতের্বিজ্ঞাতারং বিজানীয়াঃ” ইত্যাদি চ। সত্যং বিপ্রতিষিদ্ধম্, যদি প্রত্যক্ষেণ জ্ঞায়তে সুখাদিবৎ। প্রত্যক্ষ- জ্ঞানঞ্চ নিবার্য্যতে “ন মতেৰ্ম্মন্তারম্” ইত্যাদিনা। জ্ঞায়তে তু শ্রবণাদিলিঙ্গেন; তত্র কুতো বিপ্রতিষেধঃ? ॥৫
ননু শ্রবণাদিলিঙ্গেনাপি কথং জ্ঞায়তে, যাবতা যদা শূণোতি আত্মা শ্রোতব্যং শব্দম্, তদা তস্য শ্রবণাদিক্রিয়য়ৈব বর্তমানত্বাৎ মনন-বিজ্ঞানক্রিয়ে ন সম্ভবত আত্মনি পরত্র বা। তথা অন্যত্রাপি মননাদিক্রিয়াসু। শ্রবণাদিক্রিয়াশ্চ স্ববিষয়েষের। নহি মন্তব্যাদন্যত্র মস্তুৰ্ম্মননক্রিয়া সম্ভবতি ॥৬
ননু মনসঃ সর্বমেব মন্তব্যম্। সত্যমেবম্; তথাপি সর্ব্বমপি মন্তব্যং মন্তারমস্তরেণ ন মন্ত্রৎ শক্যম্। যদ্যেবং কিং স্যাৎ? ইদমত্র স্যাৎ-সর্ব্বস্য যোহয়ং মস্তা, স মন্তৈবেতি ন মন্তব্যঃ স্যাৎ। ন চ দ্বিতীয়ো মন্তর্মন্তাস্তি। যদা স আত্মনৈব মন্তব্যঃ, তদা যেন চাত্মনা মন্তব্যঃ, যশ্চ মন্তব্য আত্মা, তৌ দ্বৌ প্রসজ্যেয়াতাম্। এক এবাত্মা দ্বিধা মন্ত-মন্তব্যত্বেন দ্বিশকলীভবেৎ বংশাদিবৎ, উভয়থাপ্যনুপপত্তিরেব। যথা প্রদীপয়োঃ প্রকাশ্য-প্রকাশকত্বানুপপত্তিঃ, সমত্বাৎ, তদ্বৎ ॥৭
ন চ মস্তুর্মন্তব্যে মননব্যাপারশূন্যঃ কালোহস্ত্যাত্মমননায়। যদাপি লিঙ্গেনাত্মানং মনুতে মস্তা, তদাপি পূর্ব্ববদেব লিঙ্গেন মন্তব্য আত্মা, যশ্চ তস্য মন্তা, তৌ দ্বৌ প্রসজ্যেয়াতাম্; এক এব বা দ্বিধেতি পূর্ব্বোক্তো দোষঃ। ন প্রত্যক্ষেণ, নাপ্যনুমানেন জ্ঞায়তে চেৎ, কথমুচ্যতে “স ম আত্মেতি বিদ্যাৎ” ইতি? কথং বা শ্রোতা মত্তেত্যাদি? ॥৮
ননু শ্রোতৃত্বাদিধর্মবানাত্মা, অশ্রোতৃত্বাদি চ প্রসিদ্ধমাত্মনঃ; কিমত্র বিষমং পশ্যসি? যদ্যপি তব ন বিষমম্, মম তু বিষমং প্রতিভাতি। কথম্? যদাসৌ শ্রোতা, তদা ন মন্তা; যদা মন্তা, তদা ন শ্রোতা। তত্রৈবং সতি পক্ষে শ্রোতা মন্তা, পক্ষে ন শ্রোতা নাপি মন্তা। তথান্যত্রাপি চ। যদৈবম্, তদা শ্রোতৃত্বাদি- ধৰ্ম্মবানাত্মা অশ্রোতৃত্বাদিধর্মবান্ বেতি সংশয়স্থানে কথং তব ন রৈষম্যম্?
যদা দেবদত্তো গচ্ছতি, তদা ন স্থাতা গন্তৈব। যদা তিষ্ঠতি, তদা ন গন্তা স্থাতৈব, তদাস্য পক্ষ এব গন্তৃত্বং স্থাতৃত্বঞ্চ, ন নিত্যৎ গন্তৃত্বং স্থাতৃত্বং বা, তদ্বৎ ॥৯
তথৈবাত্র কাণাদাদয়ঃ পশ্যন্তি। পক্ষে প্রাপ্তেনৈব শ্রোতৃত্বাদিনা আত্মোচ্যতে শ্রোতা মন্তেত্যাদিবচনাৎ। সংযোগজত্বমযৌগপদ্যঞ্চ জ্ঞানস্য হ্যাচক্ষতে। বর্ষয়ন্তি চ ‘অন্যত্রমনা অভুবং নাদর্শম্’ ইত্যাদি যুগপজজ্ঞানানুৎপত্তিৰ্ম্মনসো লিঙ্গমিতি চ ন্যায্যম্। ভবত্বেবং; কিং তব নষ্টম্ যদ্যেবং স্যাৎ? অস্ত্বেবং তবেষ্টং চেৎ; শ্রুত্যর্থস্তু ন সম্ভবতি। কিং ন শ্রোতা মন্তেত্যাদিঃ শ্রুত্যর্থঃ? ন, ন শ্রোতা ন মন্তেত্যাদিবচনাৎ ॥১০
ননু পাক্ষিকত্বেন প্রত্যুক্তং ত্বয়া; ন, নিত্যমেব শ্রোতৃত্বাদ্যভ্যুপগমাৎ; “ন হি শ্রোতুঃ শ্রুতের্বিপরিলোপো বিদ্যতে” ইত্যাদিশ্রুতেঃ। এবং তর্হি নিত্যমেব শ্রোতৃত্বাদ্যভ্যুপগমে প্রত্যক্ষবিরুদ্ধা যুগপজ্জ্ঞানোৎপত্তি-জ্ঞানাভাবশ্চাত্মনঃ কল্পিতঃ স্যাৎ? তচ্চানিষ্টমিতি। নোভয়দোষোপপত্তিঃ, আত্মনঃ শ্রুত্যাদিশ্রোতৃত্বাদি- ধর্মবত্ত্বশ্রুতেঃ। অনিত্যানাৎ মূর্তানাঞ্চ চক্ষুরাদীনাৎ দৃষ্ট্যাদ্যনিত্যত্বমেব সংযোগবিয়োগধর্মিণাম্। যথা অগ্নের্জলনং তৃণাদিসংযোগজত্বাৎ, তদ্বং। ন তু নিত্যস্যামূর্ত্তস্যাসংযোগ-বিভাগধৰ্ম্মিণঃ সংযোগজ-দৃষ্ট্যাদ্যনিত্যধর্মত্বৎ সম্ভবতি। তথা চ শ্রুতিঃ “ন হি দ্রষ্টুদৃষ্টৈব্বিপরিলোপো বিদ্যতে” ইত্যাদ্যা ॥১১
এবং তর্হি দ্বে দৃষ্টী-চক্ষুষোহনিত্যা দৃষ্টিঃ, নিত্যা চাত্মনঃ। তথা চ দ্বে শ্রুতী- শ্রোত্রস্যানিত্যা, নিত্যা চাত্মস্বরূপস্য। তথা দ্বে মতী বিজ্ঞাতী বাহ্যাবাহ্যে। এবং হ্যেব চেয়ং শ্রুতিরুপপন্না ভবতি-“দৃষ্টের্ডষ্টা শ্রুতেঃ শ্রোতা” ইত্যাদ্যা। লোকেহপি প্রসিদ্ধৎ চক্ষুষস্তিমিরাগমাপায়য়োঃ নষ্টা দৃষ্টির্জাতা দৃষ্টিরিতি চক্ষুর্দষ্টৈর্নিত্যত্বম্। তথাচ শ্রুতিমত্যাদীনামাত্মদৃষ্ট্যাদীনাঞ্চ নিত্যত্বং প্রসিদ্ধমেব লোকে। বদতি হি উদ্ধৃতচক্ষুঃ স্বপ্নেহদ্য ময়া ভ্রাতা দৃষ্ট ইতি। তথা অবগতবাধির্য্যঃ স্বপ্নে শ্রুতো মন্ত্রোহদ্যেত্যাদি। যদি চক্ষুঃসংযোগজৈবাত্মনো নিত্যা দৃষ্টিস্তন্নাশে নশ্যেত, তদা উদ্ধৃতচক্ষুঃ স্বপ্নে নীলপীতাদ্বীনি ন পশ্যেৎ। “ন হি দ্রষ্টুদৃষ্টে”- রিত্যাদ্যা চ শ্রুতিরমুপপন্না স্যাৎ। “তচ্চক্ষুঃ পুরুষে যেন স্বপ্নং পশ্যতি” ইত্যাদ্যা চ শ্রুতিঃ ॥১২
নিত্য আত্মনো দৃষ্টিব্যাহানিতাদৃষ্টেগ্রাহিকা। বাহ্যদৃষ্টেশ্চ উপজনাপায়ান্ত- নিত্যধর্ম্মবত্ত্বাদ গ্রাহিকায়া আত্মদৃষ্টেস্তদ্বদবভাসত্বম্ অনিত্যত্বাদি ভ্রান্তি নিমিত্তং
লোকস্যেতি যুক্তম্। যথা ভ্রমণাদিধর্মবদলাতাদিবস্তুবিষয়দৃষ্টিরপি ভ্রমতীব, তদ্বৎ। তথা চ শ্রুতিঃ “ধ্যায়তীব লেলায়তীবেতি”। তস্মাদাত্মদৃষ্টেনিত্যত্বান্ন যৌগপদ্যম- যৌগপদ্যং বাস্তি। বাহ্যানিত্যদৃষ্ট্যুপাধিবশাত্তু লোকস্য তার্কিকাণাঞ্চ আগম- সম্প্রদায়বর্জিতত্বাৎ অনিত্যা আত্মনো দৃষ্টিরিতি ভ্রান্তিরুপপন্নৈব। জীবেশ্বর- পরমাত্মভেদকল্পনা চৈতন্নিমিত্তৈব ॥১৩
তথা অস্তি নাস্তীত্যাদ্যাশ্চ যাবন্তো বাষ্মনসয়োর্ভেদা যত্রৈকং ভবন্তি, তদ্বিষয়ায়া নিত্যায়া দৃষ্টেনির্বিশেষায়াঃ। অস্তি মাস্তি, একং নানা, গুণবদগুণম্, জানাতি ন জানাতি, ক্রিয়াবদক্রিয়ম্, ফলবদফলম্, সবীজং নির্ব্বীজম্, সুখৎ দুঃখম্, মধ্যমমধ্যম্, শূন্যমশূন্যম্, পরোহহমন্যঃ, ইতি বা সর্ব্ববাক্প্রত্যয়াগোচরে স্বরূপে যো বিকল্পয়িতুমিচ্ছতি, স নূনং খমপি চৰ্ম্মবদ্বেষ্টয়িতুমিচ্ছতি সোপানমিব চ পস্ত্যামারোঢ়ুম্; জ্বলে থে চ মীনানাং বয়সাং চ পদং দিদৃক্ষতে; “নেতি নেতি” “যতো বাচো নিবর্তন্তে” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ, “কো অদ্ধা বেদ” ইত্যাদিমন্ত্রবর্ণাৎ ॥১৪
কথং তহি তস্য স ম আত্মেতি বেদনম্; ব্রূহি কেন প্রকারেণ তমহং স ম আত্মেতি বিদ্যাম্। অত্রাখ্যায়িকামাচক্ষতে-কশ্চিৎ কিল মনুষ্যো মুগ্ধঃ কৈশ্চিদুক্তঃ কম্মিংশ্চিদপরাধে সতি, ‘ধিক্ ত্বাম্, নাসি মনুষ্যঃ’ ইতি। স মুগ্ধতয়া আত্মনো মনুষ্যত্বং প্রত্যায়রিতুৎ কঞ্চিদপেত্যাহ-ব্রবীতু ভবান্ কোহহমস্মীতি। স তস্য মুগ্ধতাং জ্ঞাত্বাহ-ক্রমেণ বোধয়িষ্যামীতি। স্থাবরাদ্যাত্মভাবমপোহ্য ন ত্বমমনুষ্য ইত্যুক্তা উপররাম। স তৎ মুগ্ধং প্রত্যাহ-ভবান্ মাং বোধয়িতুৎ প্রবৃত্তস্থূষ্ণীং বভূব, কিং ন বোধয়তীতি। তাদৃগেব তদ্ভবতো বচনম্। নাশ্যমনুষ্যঃ ইত্যুক্তেহপি মনুষ্যত্বমাত্মনো ন প্রতিপদ্যতে যঃ, স কথৎ মনুষ্যোহসীত্যুক্তেহপি মনুষ্যত্বমাত্মনঃ প্রতিপদ্যেত। তস্মাৎ যথাশাস্ত্রোপদেশ এবাত্মাববোধবিধিঃ, নান্ধঃ। নহি অগ্নের্দাহ্যং তৃণাদি অন্যেন কেনচিদ্দগ্ধুৎ শক্যম্ ॥১৫
অতএব শাস্ত্রম্ আত্মস্বরূপং বোধয়িতুং প্রবৃত্তং সৎ অমনুষ্যত্ব-প্রতিষেধেনেব “নেতি নেতি” ইত্যুক্তোপররাম। তথা “অনন্তরমবাহ্যম্” “অয়মাত্মা ব্রহ্ম সর্ব্বানুভূঃ” ইত্যনুশাসনম্; “তত্ত্বমসি” “যত্র ত্বস্য সর্ব্বমাত্মৈবাভূৎ তৎ কেন কং পশ্যেৎ” ইত্যেবমাদ্যপি চ ॥১৬
যাবদয়মেবং যথোক্তমিমমাত্মানং ন বেত্তি, তাবদয়ং বাহ্যানিত্যদৃষ্টিলক্ষণ -
মুপাধিমাত্মত্বেনোপেত্য অবিদ্যা উপাধিধর্ম্মানাত্মনো মন্যমানো ব্রহ্মাদিস্ত্বপর্য্যন্তেষু স্থানেষু পুনঃ পুনরাবর্ত্তমানঃ অবিদ্যাকামকর্ম্মবশাৎ সংসরতি ॥১৭
স এবং সংসরন্ উপাত্তদেহেন্দ্রিয়সঙ্ঘাতং ত্যজতি; ত্যক্তা অন্যমুপাদত্তে। পুনঃ পুনরেবমেব নদীস্রোতোবজ্জন্মমরণ-প্রবন্ধাবিচ্ছেদেন বর্তমানঃ কাভিরবস্থাভির্বর্ত্ততে —ইত্যেতমর্থং দর্শয়ন্ত্যাহ শ্রুতিঃ বৈরাগ্যহেতোঃ—
আভাসভাষ্যের অনুবাদ। দ্বিতীয় অধ্যায় আরম্ভ হইতেছে, তাহার সমস্ত বাক্যের তাৎপর্য্য হইতে, প্রাপ্ত অর্থ এইরূপ-জগতের সৃষ্টি-স্থিতি- সংহারকারী অসংসারী সর্ব্ববিদ্ ও সর্বশক্তিসম্পন্ন পরমেশ্বর নিজস্ব ভিন্ন অন্য কোন বস্তুর সাহায্য না লইয়াই আকাশাদিক্রমে এই জগৎ সৃষ্টি করিয়া, তিনি নিজেই আপনাকে জানিবার উদ্দেশ্যে প্রাণ ও ইন্দ্রিয়াদি বিশিষ্ট সমস্ত শরীরের মধ্যে প্রবেশ করিলেন; এবং প্রবেশ করিয়া(জীবভাবাপন্ন হইয়া)-‘ইদং ব্রহ্ম অস্মি’ অর্থাৎ আমি হইতেছি এই ব্রহ্ম স্বরূপ, এইরূপে নিজের আত্মাকে ঠিকভাবে প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। অতএব বুঝা যাইতেছে যে, সমস্ত প্রাণি- শরীরে তিনিই একমাত্র আত্মা, তাহা ছাড়া দ্বিতীয় কোন আত্মা নাই। অন্য স্থানেও বলা হইয়াছে যে, ‘আমি সর্ব্বভূতে(সকল জীবে) সমান-ব্রহ্মাত্মস্বরূপ এইরূপ জানিবে’ এবং ‘সৃষ্টির অগ্রে ইহা একমাত্র আত্ম-স্বরূপই ছিল’, ‘ব্রহ্ম সর্বব্যাপী‘। ভালকথা, অন্য শ্রুতি হইতে যখন জানিতে পারা যাইতেছে যে, সর্বব্যাপী ও সর্ব্বাত্মক(সর্ব্বময়) আত্মার ক্ষুদ্র কেশাগ্রপরিমাণ অংশও কোথায়ও অপ্রবিষ্ট নাই, তখন পিপীলিকা যেরূপ গর্তে প্রবেশ করে, আত্মাও সেইরূপ মূর্দ্ধনীমা অর্থাৎ মস্তকের উপরিভাগ বিদীর্ণ করিয়া প্রবেশ করিল কিরূপে(১)? ॥১
হাঁ, ইহা অতি সামান্য আপত্তি; এ বিষয়ে আরও বহু আপত্তির বিষয় আছে—‘তিনি ইন্দ্রিয়বিহীন হইয়াও ঈক্ষণ করিলেন’, ‘কোন কিছু না লইয়াই লোকসমূহ সৃষ্টি করিলেন।’ ‘জন্ম হইতে পুরুষদেহ সৃষ্টি করিয়া তাহাকে বর্দ্ধিত করিয়াছিলেন‘। তাঁহার সংকল্প হইতে পুরুষের মুখাদি অভিব্যক্ত অর্থাৎ উৎপন্ন
হইয়াছিল, এবং মুখাদি হইতে অগ্নি প্রভৃতি লোকপালগণ উৎপন্ন হইয়াছিলেন; সেই লোকপালদিগের আবার অশনায়া(ক্ষুধা) প্রভৃতির সহিত যোগ এবং তাহাদের আয়তনের(বাসস্থানের) প্রার্থনা; তদনুসারে গবাদির(গোরু প্রভৃতি) দেহ প্রদর্শন; তাহার পর লোকপালগণের যথাযোগ্য আয়তনে প্রবেশ; সৃষ্ট অন্নের আবার ভয়ে পলায়ন ও বাগাদিকর্তৃক সেই পলায়মান অন্নকে ধরিবার চেষ্টা—এ সমস্তই ত সীমাবিদারণ ও প্রবেশের তুল্য;[সুতরাং আপত্তির যোগ্য] ॥২
আচ্ছা, ভাল কথা, উপরে যে সমস্ত বিষয় বলা হইল, সে সমস্ত বিষয় অসঙ্গতই হউক; ক্ষতি কি? না, তাহা হইতে পারে না; কারণ, এখানে আত্মবোধই শ্রুতির একমাত্র বক্তব্য; সুতরাং তাহা ছাড়া সমস্ত কথাই অর্থবাদ-আত্মবোধের স্তুতিবাক্য মাত্র; কাজেই ইহাতে কোন দোষ নাই। অথবা মায়াবীর দৃষ্টান্তেও ঐ আপত্তির খণ্ডন হইতে পারে; অর্থাৎ মহামায়াসম্পন্ন সর্ব্বজ্ঞ সর্ব্বশক্তি পরমেশ্বর এই সমস্ত কার্য্য করিয়াছেন; ইহা জানিলে তাঁহাকে বুঝিতে সুবিধা হইবে বলিয়া লৌকিক রীতি অনুসারে ঐ সমস্ত আখ্যায়িকা(গল্প) বিস্তার করা হইয়াছে মাত্র,(প্রকৃতপক্ষে ঐ সমস্ত ঘটনা সত্য নহে); এই পক্ষ অর্থাৎ মত অধিকতর যুক্তিসম্মত হয়। কেন না, সৃষ্টিবিষয়ক আখ্যায়িকাদি জানিলে যে অন্য কোনও ফল হয়, ইহা ত শ্রুতির অভিমত নহে; পরন্তু আত্মার একত্ব ও যথার্থ স্বরূপ জানিলে যে, মোক্ষ ফল লাভ হয়, ইহা সমস্ত উপনিষদে প্রসিদ্ধ রহিয়াছে এবং ভগবদ্গীতা প্রভৃতি স্মৃতিশাস্ত্রেও ‘সর্ব্বভূতে সমভাবে বিদ্যমান পরমেশ্বরকে’ ইত্যাদি বাক্যে ঐ কথাই বলা হইয়াছে ॥৩
[আত্মার একত্বের বিরুদ্ধে আশঙ্কা প্রকাশ করা হইতেছে।] ভাল; তিনপ্রকার আত্মার অস্তিত্ব জানা যাইতেছে—[এক জীব, দ্বিতীয় ঈশ্বর ও তৃতীয় পরব্রহ্ম।] তাহার মধ্যে কর্তা ভোক্তা ও সংসারী জীব বলিয়া প্রথম আত্মা সমস্ত লোকে ও শাস্ত্রে প্রসিদ্ধ রহিয়াছে। নগর ও প্রাসাদ ইত্যাদি নির্মাণরূপ কার্য্য দেখিয়া সে বিষয়ে উত্তম জ্ঞানসম্পন্ন সূত্রধর(ছুতার) প্রভৃতি যেমন সেই নগরাদির নির্মাণকারী বলিয়া বোঝা যায়, তেমনি শাস্ত্রোক্ত নানাবিধ প্রাণীর কর্মফলভোগের উপযুক্ত নানাপ্রকার স্বর্গাদি লোক(ভুবন) ও দেহ ইত্যাদি নির্মাণরূপ হেতুদ্বারা, তাহার কর্তারূপে সর্ব্বজ্ঞ চেতন পরমেশ্বরও আছেন বলিয়া বোঝা যায়; তিনিই দ্বিতীয় আত্মা। তাহার
পর, ‘বাক্যসমূহ যাঁহার নিকট হইতে ফিরিয়া আইসে’(যিনি বর্ণনার অতীত) ও ‘নেতি নেতি’ ইত্যাদি শাস্ত্রসিদ্ধ যে পুরুষ(পরব্রহ্ম) যাঁহার বিষয় উপনিষদ্ হইতে জানা যায়; তিনি হইতেছেন তৃতীয়। এই প্রকার পরস্পর বিভিন্নস্বভাব তিনটি আত্মা[প্রমাণিত হইতেছে]। তবে কি প্রকারে বুঝিতে পারা যায় যে, অদ্বিতীয় অসংসারী আত্মা একই বটে? এবং তাহাতে জীবেরই বা অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় কি প্রকারে?[কেন?] জীবের অস্তিত্ব ত- জীব শ্রোতা মন্তা(চিন্তাকারী) দ্রষ্টা, আদেশকারী, বিঘোষণকারী, বিজ্ঞাতা ও প্রজ্ঞাতা এই প্রকারেই জানা যাইতেছে ॥৪
হাঁ, জীববিষয়ক এই প্রকার যে জ্ঞান, তাহা বিরুদ্ধ জ্ঞানই; কারণ, শ্রবণাদির কর্তারূপে, যে জীবকে জানা যায়, সেই জীবই আবার শ্রুতিতে ‘অমত অথচ মন্তা, অবিজ্ঞাত অথচ বিজ্ঞাতা’ বলিয়া কথিত হইয়াছে;[সুতরাং তদ্বিষয়ক জ্ঞান শ্রুতিবিরুদ্ধই হইতেছে]।[জীব যে জ্ঞানের অতীত সে সম্বন্ধে] আরও আছে—‘মতির(মনের) মননকারীকে চিন্তা করিও না, এবং বিজ্ঞানের জ্ঞাতাকে জানিও না’ ইত্যাদি। হাঁ, তাহা হইলেই উক্ত জ্ঞান বিরুদ্ধ হইত, যদি সুখদুঃখাদির মত আত্মাও প্রত্যক্ষজ্ঞানের বিষয়ীভূত হইত; তাহা ত হয় না; কেননা; “ন মতেমন্তারম্” ইত্যাদি শ্রুতি কেবল জীববিষয়ে প্রত্যক্ষ- জ্ঞানেরই নিবারণ করিয়াছেন। আত্মা যখন শ্রবণাদি জ্ঞানের বিষয়ীভূত বিজ্ঞাত বা অনুমিত; তখন আর বিরোধ কিসের? ॥৫
ভাল কথা, শ্রবণাদি উপায় দ্বারাই বা আত্ম-বিজ্ঞান সম্ভব হয় কিরূপে? কেননা, আত্মা যে সময় শ্রোতব্য(শুনিবার যোগ্য) শব্দ শ্রবণ করে, সে সময়ে, আত্মা কেবল শ্রবণ-ক্রিয়া লইয়াই বর্তমান থাকে; সুতরাং সে সময়ে আপনাতে বা অন্যত্র কোথাও তাহার মনন ও বিজ্ঞানক্রিয়া সম্ভবপর হয় না; মননাদি ক্রিয়া- স্থলেও এইরূপই ব্যবস্থা। শ্রবণাদি ক্রিয়াগুলি নিজ নিজ বিষয়েই(শব্দাদি বিষয়েই) নিবদ্ধ; সুতরাং মননকর্তার যে মননক্রিয়া(চিন্তা), তাহা, কখনই মন্তব্য(চিন্তাযোগ্য) বিষয় ভিন্ন অন্যত্র—আত্মাতে হয় না বা হইতে পারে না ॥৬
কেন, মনের ত সমস্ত বিষয়ই মন্তব্য(চিন্তাযোগ্য)? হাঁ, এ কথা যদিও সত্য; তথাপি মননের কর্তা থাকা আবশ্যক; কর্তা ছাড়া কোন মন্তব্য বিষয়ই মনন করিতে পারা যায় না। এরূপ হইলেই বা কি হইবে? ইহাতে এই হইবে যে, এই যিনি সকলের মন্তা(মননের অর্থাৎ চিন্তার কর্ত্তা), তিনি মস্তাই
থাকিবেন, কখনও মন্তব্য(চিন্তার বিষয়বস্তু) হইতে পারিবেন না; অথচ- মন্তার মননকারী দ্বিতীয় আর কেহ নাই। সেই মন্তা যদি নিজেই নিজের মন্তব্য(চিন্তনীয় বস্তু) হইত, তাহা হইলেই, যে আত্মা দ্বারা মনন করা হইত, এবং যে আত্মা মননের বিষয়ীভূত হইত, তাহাদের দ্বিত্ব বা ভেদ সম্ভবপর হইত; অথবা দুইভাগে বিভক্ত একই বংশখণ্ড প্রভৃতির ন্যায়, এক আত্মাই মননের কর্তা ও মননের বিষয়রূপে দুইভাগে বিভক্ত হইয়া পড়িত; কিন্তু এই উভয় প্রকার কল্পনাই ত অসঙ্গত হইতেছে; যেমন দুইটি প্রদীপের মধ্যে একটি অপরটির প্রকাশক হয় না; কারণ, উভয়ই সমান; ইহাও ঠিক সেইরূপ ॥৭
বিশেষতঃ আত্মা, যে সময় মন্তব্য বিষয় মনন করে, সে সময় উক্ত মনন- ক্রিয়ার সহিত সম্পর্কশূন্য এমন একটুকু ক্ষুদ্র কালও নাই যে, যে কালে আলাদা ভাবে আত্মার নিজের বিষয়েও মনন হইতে পারে;[অথচ একই সময়ে দুইটি পৃথক্ জ্ঞান হওয়া যুক্তিবিরুদ্ধ]। আর যদি ক্রিয়া প্রভৃতি কোনপ্রকার লিঙ্গ (চিহ্নজ্ঞাপক হেতু) দ্বারা আত্মা আত্মার মনন করে বলিয়া অনুমান কর, তাহা হইলেও পূর্ব্বের ন্যায় মন্তা ও মন্তব্যভেদে আত্মার দুইটি ভাগ হইয়া পড়ে, অথবা দুই ভাগে বিভক্ত বংশখণ্ডাদির ন্যায় এক আত্মারই দ্বিত্বপ্রাপ্তিরূপ পূর্ব্বোক্ত দোষ হইতে পারে। ভাল, প্রত্যক্ষ বা অনুমান দ্বারাও যদি আত্মাকে জানিতে পারা না যায়, তাহা হইলে কিরূপে বলা হয় যে, ‘তিনিই আমার আত্মা’ এইরূপে জানিবে এবং কিরূপেই বা ‘শ্রোতা মন্তা’ ইত্যাদি প্রকারের আত্মাকে বিশেষিত করা হয়? ॥৮
ভাল কথা, আত্মার শ্রোতৃত্বাদি(শোনা দেখা ইত্যাদি) ধৰ্ম্ম শ্রুতিতে কথিত আছে, এবং তাহার অশ্রোতৃত্বাদি স্বভাবও শ্রুতিপ্রসিদ্ধ রহিয়াছে; সুতরাং ইহাতে তুমি কি অসঙ্গতি দেখিতেছ? হাঁ, যদিও তোমার নিকট বিষম বলিয়া মনে না হউক, তথাপি আমার নিকট কিন্তু ইহা বিষম বা অসঙ্গত বলিয়াই মনে হইতেছে। যদি বল কেন?[বলিতেছি-] এই আত্মা যে সময়ে শ্রোতা হয়, ঠিক সেই সময়েই মস্তা হয় না; আবার যে সময়ে মন্তা হয়, ঠিক সেই সময়েই শ্রোতা হয় না;[কারণ, একই সময়ে দুই প্রকার জ্ঞান হয় না]। এইরূপ হইলে এই দাঁড়াইল যে, আত্মা একপক্ষে শ্রোতাও বটে, মন্তাও বটে, আবার পক্ষান্তরে শ্রোতাও নহে, মন্তাও নহে। অন্যান্য জ্ঞানসম্বন্ধেও এই ব্যবস্থা। যখন এইরূপ অবস্থা, তখন, আত্মা কি শ্রোতৃত্বাদি ধর্মযুক্ত, অথবা শ্রোতৃত্বাদি ধর্মরহিত? এই প্রকার সংশয়ের সম্ভাবনা থাকায় তোমার নিকটই বা বৈষম্য
(অসঙ্গতি) বোধ হইতেছে না কেন? কেননা, দেবদত্ত(কোন ব্যক্তি) যে সময় গমন করিতে থাকে, সে সময় সে স্থাতা(অবস্থানকারী, দাঁড়ান আছে এমন) হয় না, কিন্তু গন্তাই(গমনকারীই) হয়; আবার যখন অবস্থান করে, তখনও গন্তা হয় না, পরন্তু স্থাতাই(স্থিতিশীলই) হইয়া থাকে। সে সময় যেমন ইহার গস্তত্ব(গতি) ও স্থাতৃত্ব(স্থিতি), উভয়ই পাক্ষিক, অর্থাৎ একটি হইলে অন্যটি হয় না, কোনটিই নিত্য নহে; ইহাও সেইরূপ ॥৯
কণাদমতাবলম্বী ও অন্যান্য দার্শনিক সম্প্রদায়ভুক্ত পণ্ডিতগণও এ বিষয়ে এইরূপই বিবেচনা করিয়া থাকেন। আত্মা পাক্ষিক শ্রোতৃত্বাদি ধর্ম্মেই বিশেষিত হইয়া থাকে, অর্থাৎ আত্মার যে শ্রোতৃত্বাদি ধৰ্ম্ম, তাহা তাহার স্বাভাবিক বা নিত্য- সিদ্ধ নহে, পরন্তু পাক্ষিক অর্থাৎ সাময়িক, অনিত্য। সেই পাক্ষিক শ্রোতৃত্বাদি ধৰ্ম্ম দ্বারাই আত্মাকে ‘শ্রোতা’ প্রভৃতি বলা হইয়া থাকে। কেননা, শ্রুতিতে ‘শ্রোতা ও মন্তা’ ইত্যাদি উক্তি রহিয়াছে। তাহার পর, তাঁহারা জ্ঞানকেও সংযোগজ(ত্বক্ ও মনের সংযোগ হইতে জাত) ও অযুগপদ্ভাবী(যাহা একসঙ্গে একের বেশী হয় না) বলিয়া ব্যাখা করিয়া থাকেন, অর্থাৎ তাঁহাদের মতে ত্বগিন্দ্রিয়ের সহিত মনের সংযোগই জ্ঞানোৎপত্তির সাধারণ কারণ, এবং একই সময়ে দুইটি জ্ঞান হয় না বা হইতে পারে না। তাঁহারা একই সময়ে বিভিন্ন জ্ঞান উৎপত্তির বিপক্ষে-‘আমার মন অন্য বিষয়ে ছিল, তাই দেখিতে পাই নাই’ ইত্যাদি ব্যবহারকে হেতুরূপে দেখাইয়া থাকেন; এবং সেই সিদ্ধান্তকেই ন্যায্য বলিয়া বিবেচনা করেন(১)। [অতঃপর পূর্ব্বপক্ষবাদী বলিতেছেন-যখন কণাদ প্রভৃতির সিদ্ধান্তও এইরূপ, তখন] এইরূপই সিদ্ধান্ত হউক, তাহাতে তোমার(সিদ্ধান্তবাদীর) ক্ষতি বা
আপত্তি কি?[সিদ্ধান্তবাদী বলিতেছেন]; ভাল কথা, যদি তোমার অভিমত হয়, তবে তোমার পক্ষে এইরূপই হউক; শ্রুতির অর্থ কিন্তু এরূপ হইতে পারে না। কেন? ‘শ্রোতা মন্তা’ ইত্যাদি কি শ্রুতির অর্থ নহে? ‘না, যে হেতু ‘শ্রোতা নহে, মন্তা নহে’ ইত্যাদি বিরুদ্ধ শ্রুতিবাক্য রহিয়াছে ॥১০ ভাল কথা, তুমি(সিদ্ধান্তবাদী) নিজেই ত শ্রোতৃত্বাদি ধর্ম্মের পাক্ষিকত্ব স্বীকার করিয়াছ? না, যে হেতু ‘শ্রোতার(আত্মার) যে শ্রুতি(শ্রবণজ্ঞান), তাহার কখনও বিলোপ হয় না’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যানুসারে-শ্রোতৃত্বাদি ধর্ম্মের নিত্যতা স্বীকার করিলে, আত্মার সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ-বিরুদ্ধ দুইটি দোষ উপস্থিত হইতে পারে। প্রথমতঃ একই সময়ে দুইপ্রকার জ্ঞান উৎপত্তি, দ্বিতীয়তঃ আত্মাতে জ্ঞানের অভাব; অথচ ইহা ত কাহারো অভীষ্ট নহে। না-উক্ত দুইপ্রকার দোষ উপস্থিত হইতে পারে না; কারণ, শ্রুতিবাক্যানুসারে শ্রুতির(শ্রবণ ক্রিয়ার-) শ্রোতা, মতির মন্তা, ইত্যাদি ধৰ্ম্ম-সম্বন্ধও তাহাতে যুক্তিসঙ্গত হইতে পারে। কারণ, অনিত্য ও মূর্ত্ত(পরিচ্ছিন্ন অর্থাৎ সীমাবদ্ধ) চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের যে দর্শনাদি ব্যাপার, সে সময় অনিত্যই বটে; কারণ, ঐ সমস্ত জ্ঞান সংযোগ ও বিয়োগ- বিশেষের ফল মাত্র। যেমন, তৃণাদি-সংযোগে অগ্নির জসন হইয়া থাকে, ইহাও সেইরূপ; কিন্তু সংযোগ-বিয়োগশূন্য নিত্য অমূর্ত্ত আত্মার পক্ষে সংযোগজাত অনিত্য দৃষ্টি প্রভৃতি ধর্ম্মের সম্বন্ধ কখনই সম্ভবপর হইতে পারে না। সেইরূপ শ্রুতিও আছে,-‘দ্রষ্টার(আত্মার) দৃষ্টির(জ্ঞানের) কখনও বিলোপ নাই’ ইত্যাদি ॥১১
ভাল, এরূপ হইলে ত নিত্য ও অনিত্য দুইটি দৃষ্টি হইয়া পড়ে; চক্ষুর দৃষ্টি অনিত্য, আর আত্মার দৃষ্টি নিত্য; এইরূপ শ্রুতিও দুইপ্রকার হয়-শ্রবণের শ্রুতি অনিত্য, আর আত্মার শ্রুতি নিত্য; এই প্রকার বাহিরের ও ভিতরের মতি(চিন্তা) ও বিজ্ঞাতির(জ্ঞানের) সম্বন্ধেও দুইপ্রকার ভাব সম্ভব হয়। হাঁ, এরূপ হইলেই ‘দৃষ্টির দ্রষ্টা ও শ্রুতির শ্রোতা’ ইত্যাদি শ্রুতির অর্থ সঙ্গত হইতে পারে; অভিপ্রায় এই যে, স্বয়ং শ্রুতিই যখন দুইপ্রকার দৃষ্টিশ্রুতির কথা বলিতেছেন, তখন ঐরূপ দ্বিত্বস্বীকার করিলে তাহাতে অপ্রামাণ্য দোষ হইতে পারে না। লোকব্যবহারেও ইহা প্রসিদ্ধ আছে যে, চক্ষুতে ‘তিমির’ রোগ উৎপন্ন হইয়া দৃষ্টি নষ্ট হইল, আবার সেই রোগ সারিলে দৃষ্টি জন্মিল; এইরূপ ব্যবহার দেখিয়া চোখের দৃষ্টির অনিত্যতাই প্রমাণিত হয়। এইরূপে আত্মদৃষ্টি- প্রভৃতির ও শ্রুতি-মতি-প্রভৃতিরও নিত্যত্ব ও অনিত্যত্ব লোকপ্রসিদ্ধই রহিয়াছে।
তাহার পর, যাহার চক্ষু তুলিয়া ফেলা হইয়াছে, সেরূপ লোকও বলিয়া থাকে যে, ‘আজ স্বপ্নে আমি ভাইকে দেখিয়াছি’। এইরূপ, যে লোকের বধিরতা জানা গিয়াছে, সেরূপ লোকও বলিয়া থাকে যে, ‘আজ স্বপ্নে আমি অমুক মন্ত্র শুনিয়াছি’ ইত্যাদি। আত্মার দৃষ্টি যদি চক্ষুঃসংযোগজনিতই হইত, এবং চক্ষুর বিনাশেই যদি বিনষ্ট হইত, তাহা হইলে যাহার চক্ষু তুলিয়া ফেলা হইয়াছে সে লোক কখনই স্বপ্ন সময়ে নীল-পীতাদি রূপ দেখিতে পারিত না, এবং ‘দ্রষ্টার দৃষ্টি বিলুপ্ত হয় না’ ইত্যাদি শ্রুতিও সঙ্গত হইত না; ‘আর পুরুষের তাহাই চক্ষুঃ, যাহা দ্বারা স্বপ্ন দর্শন করিয়া থাকে’ ইত্যাদি শ্রুতিও যুক্তিযুক্ত হইত না ॥১২ অতএব অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে যে, আত্মার দৃষ্টি নিত্য; সেই নিত্য দৃষ্টিই ইন্দ্রিয়জনিত বাহ্যদৃষ্টির গ্রাহক ও প্রকাশক। জন্ম-মরণশীল বাহ্য দৃষ্টির অনিত্যত্ব-বশতঃ তাহার গ্রাহক নিত্য আত্ম-দৃষ্টিতেও লোকে ভ্রমবশে অনিত্যতা কল্পনা করিয়া থাকে, ইহাই যুক্তিযুক্তি কথা। ভ্রাম্যমাণ অলাত প্রভৃতি(ঘুরিতেছে এমন জ্বলন্ত কাঠখণ্ড প্রভৃতি) দেখিলে তাহাতে চক্ষুর দৃষ্টিও যেন ভ্রমণই করিতেছে বলিয়া যেরূপ মনে হয়, ইহাও ঠিক সেইরূপ। এই প্রকার শ্রুতিও আছে—‘যেন ধ্যানই করে, যেন স্পন্দনই করে’ ইত্যাদি। অতএব আত্মদৃষ্টির নিত্যতা হেতু জ্ঞানের যৌগপদ্য(একই সময়ে হওয়া) বা অযৌগপদ্য(একই সময়ে না হওয়া) ভেদ নাই। বৈদিক-সম্প্রদায়ের সহিত সম্পর্কশূন্য বলিয়া তार्किकগণের ও সাধারণ লোকের যে, বাহ্য অনিত্য দৃষ্টিরূপ উপাধিহেতু আত্মদৃষ্টিতেও অনিত্যতা ভ্রম, তাহা হইতেই পারে। জীব, ঈশ্বর ও পরমাত্মার ভেদ-কল্পনাও এই প্রকার ভ্রান্তি হইতেই উৎপন্ন হইয়া থাকে ॥১৩ উক্তপ্রকার ভ্রান্তির ফলেই-সমস্ত নাম-রূপবিভাগ যেখানে যাইয়া এক হইয়া যায়, সেই ব্রহ্মস্বরূপ নিত্য নির্বিশেষ দৃষ্টিসম্বন্ধেই সৎ(অস্তি), অসৎ(নাস্তি) ইত্যাদি বিকল্প কল্পিত হইয়া থাকে। তাহার পর, যে লোক, সর্ব্বপ্রকার বাক্য ও চিন্তার অগোচর স্বরূপভূত ব্রহ্মেতে-সৎ, অসৎ, এক, অনেক, সগুণ, নির্গুণ, জ্ঞাতা, অজ্ঞাতা, ক্রিয়াযুক্ত, নিষ্ক্রিয়, ফলবান্(ভোক্তা), অফল(অভোক্তা), সবীজ, নির্ব্বীজ, সুখ, দুঃখ, মধ্য(অভ্যন্তর), অমধ্য(বাহ্য), শূন্য, অশূন্য, আমি, অন্য-ইত্যাদি বিকল্প(ভেদ বা অনিত্যতা) কল্পনা করিতে ইচ্ছা করে, সে লোক নিশ্চিতই আকাশকেও চর্মের ন্যায় বেষ্টন করিতে ইচ্ছা করে, এবং দুই পায়ের সাহায্যে আকাশেও সিঁড়ির দ্বারা আরোহণ করিতে ইচ্ছা
করে, এবং জলে মৎস্যের ও আকাশে পক্ষিগণের পদ(পদচিহ্ন) দর্শন করিতে ইচ্ছা করে(১)। কেন না, ‘ইহা নহে—ইহা নহে’, ‘বাক্যসমূহ যাহার নিকট হইতে ফিরিয়া আইসে’ ইত্যাদি শ্রুতি রহিয়াছে, এবং মন্ত্রেও ‘কে তাহাকে সম্যরূপে জানে’ ইত্যাদি উল্লেখ রহিয়াছে ॥ ১৪[ ভাল কথা, আত্মা যদি বাক্য ও মনের অগোচরই হয়,] তাহা হইলে ‘তাহাই আমার আত্মা’ এই প্রকারে আত্মজ্ঞান সম্ভব হয় কি প্রকারে? অতএব বলিয়া দাও-কি প্রকারে ‘আমি সেই আত্মাকে ইহাই আমার আত্মা এইরূপে জানিব? ইহার উত্তরে আচার্য্যগণ একটি আখ্যায়িকা(কাহিনী) বর্ণনা করিয়া থাকেন।[তাহা এই-] কোন এক মূঢ় মনুষ্য একটা অপরাধ করিয়াছিল; সে জন্য কোন ব্যক্তি তাহাকে বলিয়াছিল যে, তোমায় ধিক্, তুমি মনুষ্যই নও। তিরস্কৃত ব্যক্তি নিজের মূঢ়তাহেতু নিজে যে মানুষ ইহা প্রমাণিত করিবার উদ্দেশ্যে অন্য কোন ব্যক্তিকে বলিল-মহাশয়, আপনি বলুন যে, আমি কে হই, অর্থাৎ আমি মনুষ্য কি না? সেই ব্যক্তি ও যে মুঢ় ইহা বুঝিতে পারিয়া বলিলেন যে, আমি তোমাকে ক্রমে বুঝাইতেছি-স্থাবরাদিভাব পরিত্যাগ করিলে[বলিতে হয় যে] তুমি অমানুষ নও অর্থাৎ তুমি স্থাবরাদি স্বরূপ নও এবং মনুষ্য ভিন্নও নও। তিনি এই কথা বলিয়াই চুপ করিলেন। সেই মূঢ় মনুষ্য আবার তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল-আপনি আমাকে বুঝাইতে আরম্ভ করিয়াও চুপ করিয়া রহিলেন কেন, আমাকে বুঝাইতেছেন না কেন? [এই মূঢ়ের কথা যে প্রকার,] আপনার কথাও ঠিক সেই প্রকার; কারণ ‘তুমি
অমনুষ্যই নহ’, এই কথা বলিলেও যে লোক আপনার মনুষ্যত্ব বুঝিতে পারে না, তুমি ‘মনুষ্য’ এ কথা বলিলেও সে লোক কি প্রকারে আপনার মনুষ্যত্ব(নিজে যে মানুষ ইহা) বুঝিতে পারিবে? অতএব আত্মজ্ঞান লাভের উপায় শাস্ত্রের উপদেশই, অন্য কিছু নহে। কারণ, অগ্নি ভিন্ন অপর কেহই অগ্নির দাহ্য (দহনযোগ্য) তৃণ প্রভৃতিকে দাহ করিতে পারে না(১) ॥ ১৫ এই কারণেই উপনিষদ্ শাস্ত্র আত্মার স্বরূপ নির্দেশ করিতে আরম্ভ করিয়াও এই যে তুমি অমনুষ্য নও এইরূপ বলা হইয়াছে, ‘সেইরূপ কেবল “নেতি নেতি” বলিয়াই নিবৃত্ত হইয়াছে। এইরূপ ‘অন্তর্ব্বহির্ভাবশূন্য’ ‘এই আত্মা সর্ব্বানুস্যুত ব্রহ্মস্বরূপ’ এবং ‘তুমি তৎস্বরূপ’ ‘যে সময় এই মুমুক্ষুর সমস্তই আত্মস্বরূপ হইয়া যায়, সে সময় কে কাহার দ্বারা কাহাকে দর্শন করিবে?’ ইত্যাদি রূপেই উপদেশ করা হইয়াছে;[কিন্তু বিধিমুখে কিছুই বলা হয় নাই, হইতেও পারে না।]॥ ১৬ এই পুরুষ এইরূপ আত্মাকে যে পর্য্যন্ত জানিতে না পারে, সেই পর্য্যন্ত অনিত্য বাহ্য দৃষ্টিরূপ উপাধিকে আত্মস্বরূপে অবলম্বন করিয়া অবিদ্যার বশে উপাধির ধর্মসমূহকে আত্মার ধর্ম মনে করিয়া অবিদ্যা ও কাম-কর্মের বশে ব্রহ্মাদি স্তম্বপর্য্যন্ত(ব্রহ্ম হইতে তৃণ পর্য্যন্ত) নানা স্থানে সর্ব্বদা ভ্রমণ করিতে থাকে ॥ ১৭ অবিদ্যা বশে ঐ জীব এই প্রকার ভ্রমণ করিয়া পূর্ব্ব-গৃহীত দেহে-
ন্দ্রিয়াদি-সংঘাতকে একবার পরিত্যাগ করে এবং ত্যাগ করিয়া আবার নূতন অন্য দেহ গ্রহণ করিয়া থাকে। নদীস্রোতের ন্যায় জন্ম-মৃত্যুর ধারা চলিতে থাকায় বারংবার এইভাবেই বৃত্তি(জন্ম) লাভ করিয়া নানা রকম অবস্থায় অবস্থান করিয়া থাকে, লোকের মনে বৈরাগ্য জন্মাইবার উদ্দেশ্যে, শ্রুতি সেই বিষয়টি বুঝাইবার জন্য বলিতেছেন—
পুরুষে হ বা অয়মাদিতো গর্ভো ভবতি যদেতদ্রেতঃ। তদেতৎ সর্ব্বেভ্যোহঙ্গেভ্যস্তেজঃ সম্ভূতমাত্মন্যেবাত্মানং বিভর্তি তদ্যদা স্ত্রিয়াং সিঞ্চত্যথৈনজ্জনয়তি, তদস্য প্রথমং জন্ম ॥২৪॥১৷৷
সরলার্থঃ। অয়ং(অবিদ্যাদিদোষবান্ চন্দ্রমণ্ডলাৎ প্রত্যাবৃত্তঃ পুরুষঃ) আদিতঃ(প্রথমম্ অন্নরসরূপেণ) পুরুষে(পিতৃশরীরে) গর্ভঃ ভবতি। [কোহসৌ গর্ভঃ? ইত্যাহ-] যৎ এতৎ রেতঃ(শুক্রং, তস্মিন্ রেতসি জনিষ্যমাণতয়া জীবস্য প্রবিষ্টত্বাৎ)। তৎ এতৎ(রেতঃ) সর্ব্বেভ্যঃ অঙ্গেভ্যঃ (দেহাবয়বেভ্যঃ) সম্ভূতম্(উৎপন্নং) তেজঃ(সারভূতম্)।[তৎ রেতোরূপম্] আত্মানম্(আত্মসারম্) আত্মনি(স্বশরীরে) এব বিভর্তি(ধারয়তি)[পিতা]। যদা স্ত্রিয়াম্(ঋতুমত্যাং ভার্য্যায়াং) তৎ সিঞ্চতি(উপগচ্ছন্ তেজঃ আধত্তে পিতা), অথ(তদা) এনৎ(এতৎ রেতঃ) জনয়তি(শরীররূপেণ পরিণময়তি); অস্য(সংসারিণঃ পুরুষস্য) তৎ(স্ত্রিয়াৎ নিষেকরূপং) প্রথমং জন্ম(প্রথমাবস্থাভি- ব্যক্তিরিত্যুচ্যতে) ॥২৪॥১॥
মূলানুবাদ।[উক্ত অবিদ্যা ও কামকৰ্ম্মাভিমানযুক্ত সংসারী পুরুষ কর্মক্ষয়ে চন্দ্রমণ্ডল হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া] প্রথমতঃ পুরুষ- শরীরে গর্ভরূপী হয়।[গর্ভ কি, তাহা বলিতেছেন-] যাহা এই প্রসিদ্ধ রেতঃ(শুক্র),[তাহাই এখানে গর্ভ নামে উক্ত হইয়াছে]। সেই এই রেতঃ পিতার শরীরের সমস্ত অবয়ব হইতে উৎপন্ন তেজঃ অর্থাৎ সারস্বরূপ। পুরুষ(পিতা) এই আত্মস্বরূপ রেতকে প্রথমে আপনাতেই ধারণ করে(পোষণ করে)।[স্ত্রী ঋতুমতী হইলে] যখন সেই স্ত্রীশরীরে ইহা নিষিক্ত করে; তখন এই রেতকে গর্ভরূপে উৎপাদন করে। ইহাই সংসারগামী পুরুষের প্রথম জন্ম বলিয়া কথিত হয় ॥২৪॥:॥
শাঙ্করভাষ্যম্। অয়মেবাবিদ্যাকামকৰ্ম্মাভিমানবান্ যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম কৃত্বা অস্মাল্লোকাৎ ধূমাদিক্রমেণ চন্দ্রমসং প্রাপ্য ক্ষীণকর্মা বৃষ্ট্যাদিক্রমেণ ইমং লোকং প্রাপ্য অন্নভূতঃ পুরুষাগ্নৌ হুতঃ। তস্মিন্ পুরুষে হ বৈ অয়ং সংসারী রসাদিক্রমেণ আদিতঃ প্রথমতঃ রেতোরূপেণ গর্ভো ভবতীতি এতদাহ—যদেতৎ পুরুষে রেতঃ, তেন রূপেণেতি।১
তচ্চৈতৎ রেতঃ অন্নময়স্য পিণ্ডস্য সর্ব্বেভ্যঃ অঙ্গেভ্যঃ অবয়বেভ্যো রসাদি- লক্ষণেভ্যঃ তেজঃ সাররূপং শরীরস্য, সম্ভূতং পরিনিষ্পন্নং, তৎ পুরুষস্য আত্মভূত- ত্বাদাত্মা। তমাত্মানং রেতোরূপেণ গর্ভীভূতম্ আত্মন্যেব স্বশরীরে এব আত্মানং বিভর্তি ধারয়তি। তৎ রেতঃ স্ত্রিয়াৎ সিঞ্চতি যদা, যদা যস্মিন্ কালে ভার্য্যা ঋতুমতী, তস্যাং যোষাগ্নৌ স্ত্রিয়াৎ সিঞ্চতি উপগচ্ছন্, অথ তদা এনৎ এতদ্রেত আত্মনো গর্ভভূতং জনয়তি পিতা। তৎ অস্য পুরুষস্য স্থানান্নির্গমনং রেতঃসেককালে রেতোরূপেণাস্য সংসারিণঃ প্রথমং জন্ম প্রথমাবস্থাভিব্যক্তিঃ। তদেতদুক্তং পুরস্তাৎ “অসাবাত্মা অনুমাত্মানম্” ইত্যাদিনা ॥ ২৪৪১ ॥
ভাষ্যানুবাদ। অবিদ্যা, অজ্ঞান ও কামকৰ্ম্মজনিত অভিমানসম্পন্ন এই জীবই যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম সম্পাদন করিয়া, ইহলোক হইতে প্রয়াণের পর(মৃত্যুর পর) ধূমাদি ক্রমে চন্দ্রমণ্ডলে গমন করে; সেখানে নিজের কর্মফল শেষ হইলে পর, বৃষ্টি প্রভৃতিরূপে পৃথিবীতে পতিত হইয়া প্রথমতঃ অন্নরূপে পুরুষরূপ অগ্নিতে আহত হয়(১)। এই সংসারী জীব সেই পুরুষেই(পিতৃদেহেই) রসরক্ত ইত্যাদি ক্রমে রেভোরূপে(শুক্ররূপে) পরিণত হইয়া প্রথমতঃ গর্ভরূপ ধারণ
করে; ইহাই বিবৃত করিয়া বলিতেছেন—এই যে প্রসিদ্ধ রেতঃ(শুক্র), তদ্রূপে (গর্ভ হয়)। ১
সেই এই রেতঃ পদার্থটি অন্নময় দেহপিণ্ডের সমস্ত অবয়ব হইতে অর্থাৎ রস, রক্ত ইত্যাদি সমস্ত অংশ হইতে শরীরের সারস্বরূপ তেজোরূপে সম্ভূত— পরিনিষ্পন্ন(পরিণত) হয়। ইহা পুরুষের আত্মস্বরূপ; এই কারণে আত্মা নামে কথিত হইয়াছে। রেতোরূপে গর্ভ অবস্থাপ্রাপ্ত সেই আত্মাকে পুরুষ আপনার শরীরেই প্রথমে ধারণ করিয়া থাকে। স্ত্রী ঋতুমতী হইলে পর, পুরুষ সেই ঋতুমতী স্ত্রীরূপ অগ্নিতে উপগত হইয়া, যখন সেক(শুক্রত্যাগ) করিয়া থাকে, তখন পিতা আপনার উক্ত শুক্রকেই গর্ভরূপে উৎসর্গ করিয়া থাকেন। পিতার দেহস্থিত বাসস্থান হইতে যে শুক্রত্যাগ-কালে সংসারী পুরুষের শুক্ররূপে নির্গমন অর্থাৎ স্ত্রীদেহে প্রবেশ, ইহাই তাহার প্রথম জন্ম— প্রাথমিক অবস্থার প্রকাশ। ইহার পূর্ব্বে “অসৌ আত্মা অধুম্ আত্মানম্” ইত্যাদি বাক্যেও এই কথাই বলা হইয়াছে ॥২৪॥১৷৷
তৎ স্ত্রিয়া আত্মভূয়ং গচ্ছতি যথা স্বমঙ্গং তথা। তস্মাদেনাং ন হিনস্তি, সাস্যৈতমাত্মানমত্র গতং ভাবয়তি ॥২৫॥২৷৷
সরলার্থঃ। স্বং(স্বকীয়ম্) অঙ্গৎ(স্তনাদি) যথা[আত্মভূয়ং গচ্ছতি] তথা(তদ্বদেব) তৎ(রেতঃ) স্ত্রিয়াঃ(যস্যাং স্ত্রিয়াৎ নিষিক্তং তস্যাঃ) আত্মভূয়ং (আত্মভাবং, আত্মাব্যতিরেকতাং) গচ্ছতি(প্রাপ্নোতি)। তস্মাৎ(স্ত্রিয়া আত্মভাবোপগমনাৎ হেতোঃ) এনাং(আধারতৃতাং স্ত্রিয়ং) ন হিনস্তি (অন্তঃপ্রবিষ্টং শল্যমিব ন পীড়য়তি)। সা(গর্ভিণী) অত্র(আত্মন উদরে) গতং(প্রবিষ্টং) অন্য(তর্ভুঃ) এতম্ আত্মানং ভাবয়তি(অনুকুলাশনাদিভিঃ বর্দ্ধয়তি).॥২৫৷৷২৷৷
মূলানুবাদ। নিজের স্তন ইত্যাদি অঙ্গ যেমন নিজের স্বরূপতা প্রাপ্ত হয়, তেমনি সেই নিষিক্ত শুক্রও সেই স্ত্রীর আত্মভূত হইয়া যায়, অর্থাৎ গর্ভিণীর অঙ্গরূপে পরিণত হয়; সেই কারণেই ঐ শুক্র ইহাকে(গর্ভিণীকে) পীড়া দেয় না। সেই গর্ভিণী আপনার উদরে প্রবিষ্ট স্বামীর এই শুক্ররূপী আত্মাকে যাহাতে অনিষ্ট না হয় এমন খাদ্যাদি দ্বারা পরিবর্দ্ধিত করিয়া থাকে ॥২৫৷২৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। তৎ রেতঃ যস্যাৎ স্ত্রিয়াৎ সিক্তং সৎ তস্যাঃ স্ত্রিয়াঃ আত্মভূরস্ আত্মাব্যতিরেকতাং—যথা পিতুঃ এবং গচ্ছতি প্রাপ্নোতি যথা স্বমঙ্গৎ স্তনাদি, তথা তদ্বদেব। তস্মাদ্ধেতোঃ এনাং মাতরং সগর্ভো ন হিনস্তি পিটকাদিবৎ। যস্মাৎ স্তনাদি স্বাঙ্গবদাত্মভূয়ং গতম্ তস্মান্ন হিনস্তি ন বাধতে ইত্যর্থঃ। সা অন্তর্ব্বত্নী এতৎ অন্য ভর্তুরাত্মানম্ অত্র আত্মন উদরে গতং প্রবিষ্টং বুদ্ধা ভাবয়তি বর্দ্ধয়তি পরিপালয়তি গর্ভবিরুদ্ধাশনাদি-পরিহারম্ অনুকূলাশনাদ্যুপযোগৎ চ কুর্ব্বতী ॥২৫৷৷২॥
ভাষ্যানুবাদ। সেই শুক্র যে স্ত্রীতে নিষিক্ত(ত্যাগ করা) হয়, সেই স্ত্রীর আত্মভাব অর্থাৎ পিতার দেহের ন্যায় তাহার দেহের সহিতও অপৃথক্ ভাব অর্থাৎ একত্ব প্রাপ্ত হইয়া থাকে। যেমন স্তন প্রভৃতি নিজের অঙ্গসমূহ[দেহের সহিত একীভূত হইয়া থাকে], ইহাও ঠিক তেমনি। এই কারণেই সেই গর্ভ অন্তরস্থ পিটক(গ্রন্থির মত একপ্রকার ব্রণ) প্রভৃতির ন্যায় এই মাতাকে পীড়া দেয় না। যে হেতু সেই গর্ভট নিজের অঙ্গ স্তনাদির ন্যায় আত্মভাব প্রাপ্ত, সেই হেতুই বাধা বা পীড়া দেয় না।
সেই গর্ভিণী যখন বুঝিতে পারে যে, স্বামীর আত্মা আমার উদরে প্রবিষ্ট হইয়াছে, তখন সে গর্ভের অনিষ্টকর আহারাদির পরিবর্জ্জন ও অনুকূল আহারাদির ব্যবহার করিয়া স্বামীর আত্মস্বরূপ সেই গর্ভকে ভাবিত—পরিবর্দ্ধিত করে, অর্থাৎ গর্ভ পোষণ করে ॥২৫৷৷২৷৷
সা ভাবয়িত্রী ভাবয়িতব্যা ভবতি তং স্ত্রী গর্ভং বিভর্তি, সোহগ্র এব কুমারং জন্মনোহগ্রেহধি ভাবয়তি। স যৎ কুমারং জন্মনোহগ্রেহধি ভাবয়ত্যাত্মানমেব তদ্ভাবয়ত্যেষাং লোকানাং সন্তত্যা এবং সন্ততা হীমে লোকাস্তদস্য দ্বিতীয়ং জন্ম ॥২৬৷৷৩৷৷
সরলার্থঃ।[যস্মাৎ] সা(গর্ভবতী স্ত্রী) ভাবয়িত্রী(গর্ভভূতস্ত ভর্তুরাত্মনঃ পোষয়িত্রী),[তস্মাৎ সাপি] ভাবয়িতব্যা(ভর্ত্রা বস্ত্রান্নপানাদিভিঃ পালয়িতব্যা) ভবতি। স্ত্রী(গর্ভবতী) তৎ(ভর্তুরাত্মভূতং) গর্ভং বিভর্তি(২শ মাসান্ স্বোদরে ধারয়তি)। সঃ(পিতা) অগ্রে(প্রণবাৎ পূর্ব্বম্) এব [পরিনিষ্পন্নং] কুমারং(বালং) অগ্রে(প্রথমমেব) জন্মনঃ অধি(প্রসবাৎ পরম্) ভাবয়তি(জাতকর্মাদিনা সংস্কৃতং করোতি)।
সঃ(পিতা) অগ্রে কুমারং যৎ জন্মনঃ অধি ভাবয়তি, তৎ আত্মানম্ এব (পুত্ররূপং) ভাবয়তি।[কিমর্থমিত্যাহ-] এষাং(ভবিষ্যৎ-পুত্রপৌত্রাদি- রূপাণাৎ) লোকানাং সন্তত্যৈ(অবিচ্ছেদায়, বিস্তারায়); হি(যতঃ) ইমে (পুত্রাদয়ঃ) লোকাঃ এবং(পুত্রোৎপাদনাদিকর্মণা) সন্ততাঃ(অবিচ্ছিন্নাঃ) [ভবন্তি, অন্যথা বিচ্ছিদ্যেরন্নিতি ভাবঃ]। তৎ(প্রসূতত্বং) অন্য(গর্ভস্থ্য) দ্বিতীয়ং জন্ম ইত্যর্থঃ ॥২৬৷৷৩৷৷
মূলানুবাদ। সেই গর্ভবতী স্ত্রী যেহেতু, গর্ভভূত স্বামীর আত্মার পোষণ করেন, সেই হেতু তিনি[স্বামীরও অন্ন বস্ত্রাদি ‘দ্বারা] প্রতিপালনীয়া হন। গর্ভবতী স্ত্রী গর্ভভূত স্বামীকে পোষণ করিয়া থাকেন। প্রসবের পূর্ব্বে পত্নীর উদরে সুনিষ্পন্ন কুমার ভূমিষ্ঠ হইলে পর প্রথমেই স্বামী জাত-কর্ম্মাদি দ্বারা পুত্রের ভাবনা বা সংস্কার সম্পাদন করেন। তিনি যে, পুত্রের সংস্কার করেন, প্রকৃতপক্ষে তাহা তিনি পুত্রপৌত্রাদিরূপে বংশবৃদ্ধির জন্য নিজেরই সংস্কার করেন। কারণ, এইরূপ ক্রিয়ার ফলেই বংশ অবিচ্ছেদে বিস্তার লাভ করে। এইরূপে ভূমিষ্ঠ হওয়াই তাহার দ্বিতীয় জন্ম ॥২৬৷৷৩৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। সা ভাবয়িত্রী বর্দ্ধয়িত্রী ভর্তুরাত্মনো গর্ভভূতস্য ভাবয়িতব্যা বর্দ্ধরিতব্যা চ ভর্তা ভবতি। ন হ্যাপকারপ্রত্যুপকারমন্তরেণ লোকে কস্যচিৎ কেনচিৎ সম্বন্ধ উপপদ্যতে। তং গর্ভং স্ত্রী যথোক্তেন গর্ভধারণবিধানেন বিভর্তি ধাররতি অগ্রে প্রাগজন্মনঃ। স পিতা অগ্রে এব পূর্ব্বমেব কুমারং জাতমাত্রৎ জন্মনঃ অধি উর্দ্ধং জন্মনঃ জাতং কুমারং জাতকৰ্ম্মাদিনা পিতা ভাবয়তি। স পিতা যৎ যস্মাৎ কুমারং জন্মনঃ অধি উর্দ্ধং অগ্রে জাতমাত্রমেব জাতকৰ্ম্মাদিনা যৎ ভাবয়তি, তদাত্মানমের ভাবয়তি; পিতুরাত্মৈব হি পুত্ররূপেণ জায়তে। ‘তথা হ্যুক্তম্-“পতির্জায়াং প্রবিশতি” ইত্যাদি।
তৎ কিমর্থমাত্মানং পুত্ররূপেণ জনয়িত্বা ভাবয়তি? উচ্যতে-এযাৎ লোকানাং সন্তত্যৈ অবিচ্ছেদায়েত্যর্থঃ। বিচ্ছিদ্যেরন্ হীমে লোকাঃ পুত্রোৎপাদনাদি যদি ন কুৰ্য্যুঃ। এবং পুত্রোৎপাদনাদিকর্ম্মাবিচ্ছেদেনৈব সন্ততা প্রবন্ধরূপেণ বর্তন্তে হি যস্মাৎ ইমে লোকাঃ, তস্মাৎ তদবিচ্ছেদায় তৎ কর্তব্যৎ, ন মোক্ষায়েত্যর্থঃ। তদস্য সংসারিণঃ পুংসঃ কুমাররূপেণ
মাতুরুদরাৎ যন্নির্গমনম্, তদ্দেতোরূপাপেক্ষয়া দ্বিতীয়ং জন্ম দ্বিতীয়াবস্থাভি- ব্যক্তিঃ ॥২৩॥৩॥
ভাষ্যানুবাদ। সেই যে ভাবয়িত্রী অর্থাৎ স্বামীর আত্মস্বরূপ দেহের পোষণকারিণী স্ত্রী; তিনিও আবার ভাবয়িতব্যা অর্থাৎ উপযুক্ত অন্নবস্ত্রাদি দ্বারা স্বামীর পোষণীয়া। কেননা, জগতে উপকার ও প্রত্যুপকার ভিন্ন কাহারো সহিত কাহারও সম্বন্ধ সংঘটিত হইতে পারে না। স্ত্রী প্রথমতঃ প্রসবের পূর্ব্বে শাস্ত্রোক্ত গর্ভধারণ-বিধানক্রমে সেই গর্ভ ধারণ করিয়া থাকেন। পূর্ব্বে উৎপন্ন (গর্ভরূপে অবস্থিত) কুমার জন্মগ্রহণ করিলেই অর্থাৎ ভূমিষ্ঠ হইবার পরই, পিতা সেই কুমারকে জাতকর্ম প্রভৃতি দ্বারা ভাবিত(সংস্কারসম্পন্ন) করেন। পিতা যে জাতকর্মাদি দ্বারা মাতামাত্র(ভূমিষ্ঠ হইবার পরই) কুমারের সংস্কার সম্পাদন করিয়া থাকেন,[বুঝিতে হইবে,] তাহা তিনি নিজেরই সংস্কার করিয়া থাকেন; কারণ, যেহেতু পিতার আত্মাই পুত্ররূপে জন্ম লাভ করিয়া থাকে। অন্যত্রও এই কথা উক্ত আছে—‘পতিই[গর্ভরূপে] পত্নীতে প্রবেশ করেন’ ইত্যাদি।
ভাল, তিনি কিসের জন্য পুত্ররূপে জন্ম লাভ করিয়া আপনার সংস্কার সম্পাদন করেন? হাঁ, বলিতেছি—এই সমুদয় লোকের(বংশের) সন্ততির জন্য অর্থাৎ অবিচ্ছেদে বিস্তারের জন্য। লোকে যদি পুত্র উৎপাদন না করিত, তাহা হইলে এই সমস্ত লোক অর্থাৎ পুত্র পৌত্রাদির ধারায় ছেদ পড়িয়া যাইত। যেহেতু পুত্রোৎপাদন প্রভৃতি কর্ম্মের অবিচ্ছেদেই সমস্ত লোক অবিচ্ছিন্ন প্রবাহরূপে বর্তমান আছে, সেই হেতুই বংশবিচ্ছেদ নিবৃত্তির জন্য(অর্থাৎ বংশের ধারার যাহাতে ছেদ না পড়ে সে জন্য) ঐরূপ কৰ্ম্ম করিতে হয়, কিন্তু মুক্তির জন্য নহে অর্থাৎ পুত্র উৎপাদন রূপ কৰ্ম্ম না থামিয়া একনাগাড়ে চলিতেছে বলিয়াই, সংসারে লোকের ধারা চলিয়া আসিতেছে। এই সংসারী পুরুষের যে, পুত্ররূপে মাতৃ-জঠর হইতে নির্গমন, তাহা পূর্ব্বকথিত শুক্রাবস্থা হইতে দ্বিতীয় জন্ম, অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রকাশ ॥২৬৷৷৩॥
সোহস্যায়মাত্মা পুণ্যেভ্যঃ কর্মভ্যঃ প্রতিধীয়তে। অথাস্যায়মিতর আত্মা কৃতকৃত্যো বয়োগতঃ প্রৈতি, স ইতঃ প্রয়ন্নেব পুনর্জায়তে, তদস্য তৃতীয়ং জন্ম ॥২৭॥৪॥
সরলার্থঃ।[জনকং প্রতি পুত্রকৃতমুপযোগং দর্শয়তি-‘সোহস্যায়ম্’ ইত্যাদিনা]। অন্য(পিতুঃ) সঃ অয়ং(পুত্ররূপঃ) আত্মা(দেহঃ) পুণ্যেভ্যঃ কৰ্ম্মভ্যঃ(শাস্ত্রোক্ত-পুণ্যকৰ্ম্মনিষ্পাদনার্থৎ) প্রতিধীয়তে(পিত্রা স্বপ্রতিনিধিরূপেণ গৃহে স্থাপ্যতে)। অথ(অনন্তরম্) অস্য(পিতুঃ) বয়োগতঃ(বার্দ্ধক্যমাপন্নঃ) ইতরঃ আত্মা(দেহঃ) কৃতকৃত্যঃ(এতজ্জন্মপ্রযুক্তানি কর্মাণি কৃতানি যেন, তাদৃশঃ সন্) প্রৈতি(ম্রিয়তে)। সঃ(পিতা) ইতঃ(অস্মাৎ দেহাৎ) প্রযন্ (নির্গচ্ছন্) এব পুনঃ জায়তে(স্বকর্মানুসারেণ স্বর্গে, নরকে, পৃথিব্যাং বা সমুৎপদ্যতে। অস্মিন্ দেহে স্থিত এব স্বকর্মানুরূপৎ দেহান্তরং মনসা স্বীকৃত্য পশ্চাৎ স্বদেহং ত্যজতীতি ভাবঃ)। অন্য(গর্ভীভূতস্য পুরুষস্য) তৎ তৃতীয়ং জন্ম (তৃতীয়াবস্থাভিব্যক্তিরিত্যর্থঃ) ॥২৭৷৪৷৷
মূলানুবাদ।[পিতার প্রতি পুত্রের উপকারিতা প্রদর্শন করিতেছেন]—[পিতার দুইটি আত্মা—এক নিজস্ব, দ্বিতীয় পুত্রদেহ; তন্মধ্যে উক্ত পিতার এই পুত্ররূপী দেহটি পুণ্য কর্ম্ম সম্পাদনের জন্য নিজের প্রতিনিধিরূপে গৃহে স্থাপিত হয়। তাহার পর বার্দ্ধক্য দশা উপস্থিত হইলে, ইহার অপর আত্মাটি অর্থাৎ তিনি নিজে কৃতকৃত্য হইয়া অর্থাৎ সব কর্তব্যকর্ম্ম শেষ করিয়া এস্থান হইতে প্রস্থান করেন। তিনি প্রস্থানের সময়েই[কর্মানুসারে] পুনর্ব্বার[স্বর্গাদি স্থানে] জন্ম লাভ করেন। ইহা তাঁহার তৃতীয় জন্ম ॥২৭॥৪॥
শাঙ্করভাষ্যম্। অন্য পিতুঃ সোহয়ং পুত্রাত্মা পুণ্যেভ্যঃ শাস্ত্রোক্তেভ্যঃ কৰ্ম্মভ্যঃ কৰ্ম্মনিষ্পাদনার্থং প্রতিধীয়তে পিতুঃ স্থানে, পিত্রা যৎ কর্তব্যম্, তৎকরণায় প্রতিনিধীয়ত ইত্যর্থঃ। তথাচ সম্প্ৰত্তিবিদ্যায়াং বাজসনেয়কে-“পিত্রানুশিষ্টোঽহং ব্রহ্মাহং যজ্ঞঃ” ইত্যাদি প্রতিপদ্যতে ইতি। ১
অথ অনন্তরং পুত্রে নিবেশ্যাত্মনো ভারম্ অস্য পুত্রস্য ইতরোহয়ং যঃ পিত্রাত্মা কৃতকৃত্যঃ, কর্তব্যাদৃণত্রয়াদ্বিমুক্তঃ কৃতকর্তব্য ইত্যর্থঃ, বয়োগতঃ গতবয়া জীর্ণঃ সন্ প্রৈতি ম্রিয়তে। স ইতঃ অস্মাৎ প্রযন্নেব শরীরং পরিত্যজন্নেব তৃণজলৌকাবৎ দেহান্তরমুপাদদানঃ কর্ম্মচিতং পুনর্জায়তে। তদস্য মৃত্যু প্রতিপত্তব্যং যৎ, তৎ তৃতীয়ং জন্ম। ২
ননু সংসরতঃ পিতুঃ সকাশাদ্রেতোরূপেণ প্রথমং জন্ম; তস্যৈব কুমাররূপেণ মাতুদ্বিতীয়ং জন্মোক্তম্; তস্যৈব তৃতীয়ে জন্মনি বক্তব্যে, প্রযতন্তস্য পিতুর্যজ্জন্ম,
তৃতীয়মিতি কথমুচ্যতে? নৈষ দোষঃ, পিতাপুত্রয়োরেকাত্মত্বস্য বিবক্ষিতত্বাৎ। মোহপি পুত্রঃ স্বপুত্রে ভারং নিধায় ইতঃ প্রয়ন্নেব পুনর্জ্জায়তে, যথা পিতা। তদন্যত্রোক্তমিতরত্রাপ্যুক্তমেব ভয়তীতি মনুতে শ্রুতিঃ। পিতা- পুত্রয়োরেকাত্মত্বাৎ ॥২৭৷৷৪৷৷
ভাষ্যানুবাদ। এই পিতার সেই পুত্ররূপী আত্মাটি শাস্ত্রোক্ত পুণ্য কর্মের জন্য অর্থাৎ পুণ্যজনক কার্য্য সম্পাদনের জন্য, পিতার স্থানে প্রতিবিহিত হইয়া থাকে, অর্থাৎ পিতার কর্তব্য কর্ম্ম করণের জন্য প্রতিনিধি হইয়া থাকে। বৃহদারণ্যকোপনিষদে সম্প্রত্তিনামক বিদ্যার প্রকরণে(১) এইরূপ কথিত আছে —পিতার উপদেশপ্রাপ্ত পুত্র ‘আমি(পুত্র) ব্রহ্ম এবং আমি যজ্ঞ’ ইত্যাদিরূপে চিন্তা করিয়া থাকে। ১
অতঃপর পুত্রে আপনার কর্তব্য-ভার সমর্পণ করিয়া, এই পুত্রের যে, পিতৃস্বরূপ অপর আত্মাটি, তাহা কৃতকৃত্য অর্থাৎ পরিশোধন করিবার তিন প্রকার ঋণ(২) হইতে মুক্ত ও বয়োগত অর্থাৎ যাহার বয়স চলিয়া গিয়াছে এরূপ বৃদ্ধ হইয়া প্রয়াণ করে অর্থাৎ দেহত্যাগ করে। সেই পিতৃ-আত্মা এখান হইতে নির্গমন-সময়েই— দেহত্যাগের সময়েই তৃণ-জলৌকা(জোঁক) প্রভৃতির ন্যায় কর্ম্ম দ্বারা অর্জিত অপর দেহ গ্রহণ করিয়া আবার জন্মলাভ করে। মৃত্যুর পর, এই যে তাহার দেহান্তর গ্রহণ, তাহাই তাহার তৃতীয় জন্ম। ২
ভাল কথা, পূর্ব্বে বলা হইয়াছে যে, সংসারী জীবের পিতার নিকট হইতে শুক্ররূপে প্রথম জন্ম; সেই জীবেরই আবার কুমাররূপে মাতার নিকট হইতে
দ্বিতীয়বার জন্ম হয়; এখন তৃতীয় জন্ম কি তাহা বলিবার সময় তাহার প্রভাব- কারী অর্থাৎ পরলোকে যাত্রা করিয়াছে এমন পিতার যে ভবিষ্যৎ জন্ম, তাহাই তৃতীয় জন্ম বলিয়া নির্দ্দেশ করা হইতেছে কিরূপে? না, ইহা দোষের নহে। কারণ এখানে পিতা ও পুত্রের একাত্মভাব অর্থাৎ পিতা ও পুত্র একই, একথা প্রতিপাদনই শ্রুতির উদ্দেশ্য। শ্রুতির অভিপ্রায় এই যে, পিতার ন্যায় সেই পুত্রও বার্দ্ধক্যে নিজ পুত্রে আপনার কর্তব্যতায় সমর্পণ করিয়া এখান হইতে প্রস্থান করিতে করিতেই আবার জন্ম লাভ করিবে। ইহা যখন একের প্রতি বলা হইল, তখন অপরের(পুত্রের) প্রতিও বলা হইল বুঝিতে হইবে; কারণ, পিতা ও পুত্রের আত্মা স্বরূপতঃ এক, অভিন্ন ॥ ২৭॥৪॥
তদুক্তমৃষিণা—
গর্ভে নু সন্নন্বেষামবেদমহং দেবানাং জনিমানি বিশ্বা। শতং মা পুর আয়সীররক্ষন্ননঃ শ্যেনো জবসা নিরদীয়মিতি গর্ভ এবৈতচ্ছয়ানো বাসদেব এবমুবাচ ॥২৮৷৫॥
সরলার্থঃ। ঋষিণা(মধুভট্ট) ৯৯(এবং সংসারিশো অয়মে- প্রবাহপাতজং দুঃখং, তত্ত্বজ্ঞানস্ত চ ত্যচ্চেতত্বম্) উক্তম্—
অহং(বামদেবনামা ঋষিঃ) গর্ভে সন্(নিবসন) নু(এব) এবাহ দেবানাং(অগ্নিবায়ুপ্রভৃতীনাং) বিশ্বা(বিশ্বানি, সর্ব্বাণি) জনিমানি(জন্মানি) অন্ববেদং(বিজ্ঞাতবান্ অগ্নি)। শতং(অনেকাঃ) আয়সীঃ(কৌনম্য ইব দুর্ভেন্স্যাঃ) পুরঃ(পুর্য্য ঔব শরীরাণি) মা(মাম্) অধঃ(সংসার-পাশবিযুক্তেঃ প্রাক্) অরঙ্গন্(রক্ষিতবত্যঃ—মুক্তিপ্রতিয়োগৎ কৃতবত্যঃ)।[অনন্তরক] শ্যেনঃ(পক্ষিবিশেষ ঔব) অবসা(ত্বয়া) নিরদীয়ং(আত্মজ্ঞানপ্রদাহেন পাশং নির্ভিদ্য নির্গতোহস্মি) ইতি। বাহদেবঃ(তদাখ্য ঋষিঃ) গর্ভে শয়ান এব(গর্ভস্থ এব) এতৎ(পূর্ব্বোক্তং মন্ত্রার্থন) এবম্ উবাচ (উক্তবান্)। ২৮।৫॥ মূলানুবাদ। ঋষিও তাহা[সংসারী জীবের উক্তপ্রকার জন্মের পর মরণ, আবার জন্ম আবার মরণ এইরূপ চলিতে থাকার জন্য যে ক্লেশ ও তাহা দূর করিবার উপায়স্বরূপ যে তত্ত্বজ্ঞানে তাহার বিষয়] বলিয়াছেন—আমি(বানদের) গর্ভে থাকিবার সময়েই
এই সমস্ত দেবতার(অগ্নি বায়ু প্রভৃতির) বহুসংখ্যক জন্ম ঠিকমত জানিয়াছি। তত্ত্বজ্ঞান জন্মিবার পূর্ব্বে, বহুসংখ্যক আয়সী(লৌহময়ী) পুরী(শরীর) আমাকে বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল। পরে তত্ত্বজ্ঞানের প্রভাবে আমি শ্যেন(বাজ) পক্ষীর ন্যায় ঐ পাশ ছেদন করিয়া বাহির হইয়াছি। বামদেব ঋষি গর্ভে থাকিয়াই এই কথা বলিয়া- ছিলেন ॥২৮॥৫॥
শাঙ্করভাষ্যম্। এবং সংসরন্ অবস্থাভিব্যক্তিত্রয়েণ জন্মমরণ-প্রবন্ধারূঢ়ঃ সর্ব্বো লোকঃ সংসার-সমুদ্রে নিপতিতঃ কথঞ্চিৎ যথা শ্রুত্যুক্তমাত্মানং বিজানাতি —যস্যাং কস্যাঞ্চিদবস্থায়াম্, তদৈব মুক্তসর্ব্বসংসারবন্ধনঃ কৃতকৃত্যো ভবতীত্যেতদ্ বস্তু, তদুক্তমৃষিণা মন্ত্রেণাপ্যুক্তমিত্যাহ—
গর্ভে নু মাতুর্গর্ভাশয়ে এব সন্, নিতি বিতর্কে। অনেকজন্মান্তরভাবনা- পরিপাকবশাৎ এষাং দেবানাৎ বাগগ্ন্যাদীনাং জনিমানি জন্মানি বিশ্বা বিশ্বানি সর্ব্বাণি অন্ববেদম্ অহম্—অহম্ অনুযুদ্ধবানস্মীত্যর্থঃ। শতম্ অনেকাঃ বহব্যঃ মা মাং পুরঃ আয়সীঃ আয়স্যঃ লোহময্য ইবাভেদ্যানি শরীরাণীত্যভিপ্রায়ঃ। অয়ক্ষন্ রক্ষিতবত্যঃ সংসার-পাশনির্গমনাৎ অধঃ। অথ শ্যেন ইব জালং ভিত্ত্বা জবসা আত্মজ্ঞানকৃতসামর্থ্যেন নিরদীয়ং নির্গতোহস্মি। অহো গর্ভ এব শয়ানো বামদেব ঋষিরেবসুবাচৈতৎ ॥ ২৮॥ ৫ ॥
ভাষ্যানুবাদ। সংসার-সাগরে নিমগ্ন সমস্ত জীবলোক পূর্ব্বোক্ত তিন প্রকার জন্মরূপ অবস্থায় প্রকাশে জন্ম-মরণপ্রবাহ ভোগ করত, যে কোন অবস্থায় হউক, যখন কোনপ্রকারে শ্রুতিকথিত আত্মাকে বিশেষভাবে জানিতে পারে, তখনই সর্ব্বপ্রকার সংসার-বন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া কৃতার্থ হইয়া থাকে। এই বিষয়টি মন্ত্রেও বলা হইয়াছে; এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—শ্রুতির ‘নু’ শব্দটি বিতর্কবোধক। আমি গর্ভে—মাতৃজঠরে থাকিয়াই বহু জন্মে সঞ্চিত সুচিন্তার ফলে, এই বাক্ অগ্নি প্রভৃতি দেবতাগণের সমস্ত জন্ম(জন্মবৃত্তান্ত) জানিয়া- ছিলাম, অর্থাৎ বড় আনন্দের কথা যে, তখনই অনুভব করিতে পারিয়াছিলাম। আমি এই সংসার-বন্ধন হইতে মুক্ত হইবার পূর্ব্বে লৌহময়ী পুরীর ন্যায় দুর্ভঙ্গ বহুসংখ্যক শরীর আমাকে রক্ষা করিয়াছিল, অর্থাৎ আবদ্ধ রাখিয়াছিল। অনন্তর শেন পক্ষী(বাজ পাখী) যেরূপ বন্ধন-জাল ছেদন করিয়া বাহির হয়, তদ্রূপ আমিও আত্ম-জ্ঞান হইতে জ্ঞান শক্তি দ্বারা[সেই সংসার-বন্ধন হইতে]
বাহির হইয়াছি। বড় আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে বামদেব ঋষি গর্ভে শয়ান (অবস্থিত) থাকিয়াই এই বিষয়টি উক্তপ্রকারে বর্ণনা করিয়াছিলেন ॥ ২৮॥ ৫ ॥ স এবং বিদ্বানস্মাচ্ছরীরভেদাদূর্দ্ধ উৎক্রম্যামুষ্মিন্ স্বর্গে লোকে সর্ব্বান্ কামানাপ্তামৃতঃ সমভবৎ সম- ভবৎ ॥২৯৷৷৬৷৷
ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়স্য প্রথমঃ খণ্ডঃ ॥২৷৷১৷৷ ইত্যৈতরেয়োপনিষদি দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥২৷৷ আরণ্যকক্রমেণ তু পঞ্চমোহধ্যায়ঃ ॥৫॥
সরলার্থঃ। এবং(যথোক্তপ্রকারম্ আত্মানং) বিদ্বান্(জানন্) সঃ (বামদেব ঋষিঃ) অস্মাৎ শরীরভেদাৎ(শরীর-বিনাশাৎ, শরীরবিশেষাদ্বা) ঊর্দ্ধঃ (উন্নতঃ—পরমার্থভূতঃ সন্) উৎক্রম্য(সংসাররূপাদধোভাবাদন্নতিমাপদ্য) অমুস্মিন্(ইন্দ্রিয়াগোচরে) স্বর্গে(স্বপ্রকাশে) লোকে(পরমাত্মভাবে) [অবস্থিতঃ সন্] সর্ব্বান্ কামান্ আপ্ত্বা(লব্ধা) অমৃতঃ(মরণরহিতঃ, বিমুক্তঃ) সমভবৎ। অধ্যায়সমাপ্ত্যর্থী দ্বিরুক্তিরিত্যর্থঃ ॥ ২৯॥ ৬॥
মূলানুবাদ। সেই বামদেব ঋষি এই প্রকারে আত্মতত্ত্ব জানিয়া বর্তমান দেহ নাশের পর ঊর্দ্ধলোকে উৎক্রমণপূর্ব্বক(গিয়া) ইন্দ্রিয়াতীত স্বপ্রকাশ পরমাত্মভাবে অবস্থান করত(চক্ষুঃকর্ণ ইত্যাদির অগোচর নিজ জ্যোতিতে প্রকাশিত যে পরমাত্মা তাঁহার অবস্থা প্রাপ্ত হইয়া) সর্বকাম লাভ করিয়া অর্থাৎ ঈশ্বরের ন্যায় পূর্ণকাম হইয়া অমৃত(মরণরহিত—বিমুক্ত) হইয়াছিলেন।[অধ্যায় সমাপ্তি সূচনার্থ ‘সমভবৎ’ পদটির দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে] ॥২৯৷৷৬৷৷
ইতি ঐতরেয়োপনিষদ্ভিদয়াধ্যায়ে প্রথম-খণ্ড-ব্যাখ্যা। ॥২॥১॥
শাঙ্করভাষ্যম্। সঃ বামদেব ঋষিঃ যথোক্তমাত্মানম্ এবং বিদ্বান্ অস্মাচ্ছরীরভেদাৎ শরীরস্যাবিদ্যাপরিকল্পিতস্য আয়সবদনির্ভেষ্য জনন- মরণাদ্যনেকানর্থশতাবিষ্টশরীরপ্রবন্ধস্য পরমাত্মজ্ঞানামৃতোপযোগজনিত-বীর্য্যকুত- ভেদাৎ শরীরোৎপত্তিবীজাবিদ্যাদিনিমিত্তোপমর্দ্দহেতোঃ শরীরবিনাশাদিত্যর্থঃ। উর্দ্ধঃ পরমাত্মভূতঃ সন্ অধোভাবাৎ সংসারাৎ উৎক্রম্য জ্ঞানাবদ্যোতিতামল-
সর্ব্বাত্মভাবমাপন্নঃ সন্ অমুস্মিন্ যথোক্তে অজরেহমৃতেহভয়ে সর্ব্বজ্ঞেহপূর্ব্বেহন- পরেহনস্তেহবাহ্যে প্রজ্ঞানামৃতৈকরসে স্বর্গে লোকে স্বস্মিন্নাত্মনি স্বে স্বরূপে অমৃতঃ সমভবৎ আত্মজ্ঞানেন পূর্ব্বমাপ্তকামতয়া জীবন্নেব সর্ব্বান্ কামানাপ্তা ইত্যর্থঃ। দ্বির্বচনং সফলস্য সোদাহরণস্যাত্মজ্ঞানস্য পরিসমাপ্তিপ্রদর্শনার্থম্ ॥২৯॥৬৷৷ ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দভগবৎ-পূজ্যপাদশিষ্যস্য
ভাষ্যানুবাদ। সেই বামদেব নামক ঋষি উক্ত আত্মাকে যথোক্ত- প্রকারে জানিয়া এই শরীর-ভেদের পর অর্থাৎ লৌহময়ের ন্যায় দুর্ভেদ্য এবং জন্ম সরণাদি বহুবিধ অনর্থরাশিসমন্বিত এই অবিদ্যাকল্পিত(অজ্ঞান বা মায়া দ্বারা সৃষ্ট) শরীর-প্রবন্ধের যে, পরমাত্মজ্ঞানরূপ অমৃতরসাস্বাদজনিত শক্তি দ্বারা ভেদ— শরীরোৎপত্তির কারণস্বরূপ অবিদ্যাদি দোষ-নিবৃত্তির ফলে যে শরীরের বিনাশ বা পতন, তাহার ফলে ঊর্দ্ধ অর্থাৎ পরমাত্মস্বরূপ হইয়া, সংসাররূপ অধোভাব (নিকৃষ্ট অবস্থা) হইতে উৎক্রমণ করিয়া তত্ত্বজ্ঞান দ্বারা আলোকিত বিমল সর্ব্বাত্মভাব লাভ করত, ইন্দ্রিয়ের অগোচর অজর অমর অমৃত অভয় সর্ব্বজ্ঞ এবং পূর্ব্ব ও পর, অন্তর ও বাহির বজ্জিত একমাত্র প্রজ্ঞানস্বরূপ স্বর্গলোকে নিজ আত্মাতে অর্থাৎ স্ব স্বরূপে[অবস্থানপূর্ব্বক] অমৃত হইয়াছিলেন। এখানে বুঝিতে হইবে যে, সেই আত্মজ্ঞ পুরুষ সর্ব্বাত্মভাব লাভ করায় জীবিত অবস্থাতেই সমস্ত কাম্যবিষয় লাভ করিয়াছিলেন; এই জন্যই বলা হইল যে, সমস্ত কাম্য বিষয় প্রাপ্ত হইয়া অর্থাৎ পূর্ণকাম হইয়া। এখানে যে ফল ও উদাহরণের সঙ্গে আত্মজ্ঞানের কথা শেষ করা হইল, তাহা বুঝাইবার জন্য ‘সমভবৎ’ কথাটির দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে॥ ২৯॥৬॥
ঐতরেয় উপনিষদের দ্বিতীয়াধ্যায়ে প্রথম খণ্ডের ভাষ্যানুবাদ ॥ ২ ॥ ১ ॥ দ্বিতীয়াধ্যায়ের অনুবাদ সমাপ্ত। ২॥
আভাস-ভাষ্যম্। ব্রহ্মবিদ্যাসাধনকৃত-সর্ব্বাত্মভাবফলাবাপ্তিং বামদেবাদ্যা- চার্য্যপরস্পরয়া শ্রুত্যাবদ্যোত্যমানাং ব্রহ্মবিৎপরিষদ্যত্যন্তপ্রসিদ্ধাম্ উপলভমানা মুমুক্ষবো ব্রাহ্মণা অধুনাতনা ব্রহ্মজিজ্ঞাসবঃ অনিত্যাৎ সাধ্যসাধনলক্ষণাৎ সংসারাৎ আ জীবভাবাদ্ব্যাবিবৃৎসবো বিচারয়ন্তঃ অন্যোন্যং পৃচ্ছন্তি। কথম্?—
আভাস-ভাষ্যানুবাদ। বামদেব প্রভৃতি আচার্য্য-পরম্পরা ক্রমে পারস্পর্য্যবোধক শ্রুতিতে প্রকাশিত এবং ব্রহ্মজ্ঞানী সমাজেও অত্যন্ত প্রসিদ্ধ যে, ব্রহ্মবিদ্যা-সাধন দ্বারা সর্ব্বাত্মভাবপ্রাপ্তিরূপ ফল, তাহা জানিয়া, এখনকার মুক্তিলাভে ইচ্ছুক, ব্রহ্মকে জানিবার জন্য ব্রাহ্মণগণও সাধনাত্মক বা হেতুফলভাবাপন্ন অনিত্য সংসার ও জীবভাব হইতে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে বিচার করিয়া পরস্পরের প্রতি প্রশ্ন করিয়া থাকেন। কি প্রকার?[প্রশ্ন করিয়া থাকেন, তাহা বলিতেছেন]।—
কোহয়মাত্মেতি বয়মুপাস্মহে কতরঃ স আত্মা যেন বা রূপং পশ্যতি যেন বা শব্দং শূণোতি যেন বা গন্ধানাজি- ঘ্রতি যেন বাচং ব্যাকরোতি যেন বা স্বাদু চাস্বাদু চ বিজানাতি ॥৩০॥১৷৷
সরলার্থঃ।[আত্মোপাসকা ব্রাহ্মণা বিচারয়ন্তঃ পরস্পরং পৃচ্ছন্তি। তৎ- প্রশ্নপ্রকারসাহ] ‘কোহয়মাত্মেতি’ ইতি। বয়ং[যং] ‘অয়ম্ আত্মা’ ইতি উপাস্মহে, [সঃ] কঃ?[ইতি স্বরূপতঃ প্রশ্নঃ]।[শ্রুতৌ তু সোপাধিকো নিরুপাধিকশ্চ দ্বৌ আত্ম’নৌ শ্রূরেতে, তয়োর্মধ্যে] সঃ(অস্মদুপাস্যঃ) আত্মা কতরঃ(সোপা- ধিকো নিরুপাধিকো বা)?[ইদানীং সংশয়প্রকারো বিবিচ্যতে-] যেন (চক্ষুর্ভূতেন) বা রূপং পশ্যতি, যেন বা(শ্রোত্রভূতেন) শব্দৎ শূণোতি, যেন বা
(ঘ্রাণস্বরূপেণ) গন্ধান্ আজিঘ্রতি, যেন বা(বাগ্ভুতেন) বাচং ব্যাকরোতি, যেন বা(রসনারূপেণ) স্বাদু চ অস্বাদু চ বিজানাতি ॥ ৩০ ॥ ১ ॥
মূলানুবাদ। আত্মার উপাসনায় নিরত মুক্তিকামী ব্রাহ্মণগণ বিচার করিয়া পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন যে,—আমরা যে আত্মার উপাসনা করিতেছি, তাহার স্বরূপ কি, এবং[শ্রুতিকথিত দুইটি আত্মার মধ্যে] সেই আত্মাটি কে?—যে আত্মা চক্ষুরূপে রূপ দর্শন করিয়া থাকে, কর্ণরূপে শব্দ শ্রবণ করিয়া থাকে, ঘ্রাণরূপে গন্ধগ্রহণ করিয়া থাকে, বাগিন্দ্রিয়রূপে(জিহ্বা ওষ্ঠ ইত্যাদি রূপে) শব্দ উচ্চারণ করিয়া থাকে, এবং জিহ্বারূপে স্বাদু ও অস্বাদু বস্তু অনুভব করিয়া থাকে,—॥৩০॥১॥
শাঙ্করভাষ্যম্। যমাত্মানময়মাত্মেতি সাক্ষাৎ বয়মুপাস্মহে, কঃ স আত্মেতি। যৎ চ আত্মানময়মাত্মেতি সাক্ষাদুপাসীনো বামদেবঃ অমৃতঃ সমভবৎ; তমেব বয়মপ্যুপাস্মহে; কো মু খলু স আত্মেতি? এবং জিজ্ঞাসাপূর্ব্বমন্যোহন্যং পৃচ্ছতাম্ অতিক্রান্তবিশেষবিষয়শ্রুতিসংস্কারজনিতা স্মৃতিরজায়ত-“তং প্রপদাভ্যাংপ্রাপদ্যত ব্রহ্মেমৎ পুরুষম্” “স এতমেব সীমানং বিদার্য্য তয়া দ্বারা প্রাপদ্যত” এতমেব পুরুষম্ দ্বে ব্রহ্মণী ইতরেতর-প্রাতিকূল্যেন প্রতিপন্নে-ইতি। তে চাশ্য পিণ্ডস্যাত্মভূতে; তয়েরিন্যতর আত্মোপাস্যো ভবিতুমর্হতি। যোহত্রোপাস্তঃ, কতরো নু ন আত্মেতি বিশেষনির্ধারণার্থং পুনরন্যোহন্যং পপ্রচ্ছুব্বিচারয়ন্তঃ ।১
পুনস্তেষাৎ বিচারয়তাৎ বিশেষবিচারণাস্পদবিষয়া মতিরভূৎ। কথম্? যে বস্তুনী অস্মিন্ পিণ্ডে উপলভ্যেতে-অনেকভেদভিন্নেন করণেন যেনোপলভতে, যশ্চৈক উপলব্ধতে, করণান্তরোপলব্ধিবিষয়স্মৃতি-প্রতিসন্ধানাৎ। তত্র ন তাবদ্ যেনোপলভতে, স আত্মা ভবিতুমর্হতি। কেন পুনরুপলভতে ইতি; উচ্যতে- যেন বা চক্ষুভূতেন রূপং পশ্যতি, যেন বা শূণোতি শ্রোত্রতৃতেন শব্দম্, যেন বাঘ্রাণভূতেন গন্ধান্ আজিঘ্রতি, যেন বা বাক্-করণভূতেন বাচং নামাত্মিকাৎ ব্যাকরোতি-গৌরশ্ব ইত্যেবমাদ্যাম্, সাধ্বসাধ্বিতি চ, যেন বা জিহ্বাভূতেন স্বাদু চাম্বাদু চ বিজানাতীতি। ৩১ ॥ ১ ॥
ভাষ্যানুবাদ।—আমরা যাহাকে ‘অয়ম্ আত্মা’(এই আত্মা) বলিয়া সাক্ষাৎ সন্ধে উপাসনা করিয়া থাকি, সেই আত্মাটি কে? রামদেব
যে আত্মাকে ‘অয়ম্ আত্মা’ বলিয়া সাক্ষাৎ সম্বন্ধে উপাসনা করিয়া মুক্তিলাভ করিয়াছিলেন; আমরা তাহারই উপাসনা করিতেছি সত্য; কিন্তু সেই আত্মাটি কে? এই প্রকারে জিজ্ঞাসাপূর্ব্বক(জানিবার ইচ্ছায়) পরস্পর প্রশ্নকারীদিগের হৃদয়ে, ইহার পূর্ব্বে শ্রুতিই আত্মবিষয়ে যে সকল বিশেষ বিবরণের উপদেশ করিয়াছেন, সে সকলের অভ্যাসজাত সংস্কার হইতে স্মৃতি উৎপন্ন হইয়াছিল—‘ব্রহ্মচরণের অগ্রভাগ দ্বারা এই পুরুষে(পুরুষাকার দেহে) প্রবেশ করিয়াছিলেন’, ‘তিনি এই সীমাকে(ব্রহ্মরন্ধ্র) বিদীর্ণ করিয়া, ইহা দ্বারাই এই পুরুষদেহে প্রবেশ করিয়াছিলেন। এখানে পরস্পর ভিন্নস্বভাব দুইটি ব্রহ্মের কথা জানা গিয়াছে। উক্ত উভয়টিই এই দেহপিণ্ডের আত্মস্বরূপ। সেই উভয়ের মধ্যে একটি আত্মাই উপাস্য হইবার যোগ্য। এই উভয়ের মধ্যে, যে আত্মাটির উপাসনা করিতে হইবে, সেইটি কোন্ আত্মা?—এইরূপে উপাস্যবিষয়ক বিশেষত্ব স্থির করিবার জন্য আবার পুনর্ব্বার তাহারা বিচারে প্রবৃত্ত হইয়া পরস্পর প্রশ্ন করিয়াছিলেন—১
এইরূপ বিচারে প্রবৃত্ত সেই মুক্তিকামীদিগের হৃদয়ে উদিত বিচারযোগ্য বিশেষ বস্তুবিষয়ে স্মৃতি উপস্থিত হইয়াছিল। কি প্রকার? না, এই দেহমধ্যে দুইটি বস্তু বোধগম্য হইয়া থাকে(১); তন্মধ্যে একটি হইতেছে বিভিন্নপ্রকার চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়স্বরূপ, যাহা দ্বারা উপলব্ধি করা হইয়া থাকে, এবং আর একটি হইতেছে, যিনি বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভূত বিষয়ের উপলব্ধি করিয়া থাকেন। তিনি এক;(করণভেদেও তাঁহার ভেদ হয় না); যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন ইন্দ্রিয়দ্বারা অনুভূত বিষয়ও স্মরণ করিয়া থাকেন;[ইন্দ্রিয়ভেদে ভিন্ন হইলে, তাহার আর এইরূপ স্মরণ করা সম্ভব হইত না]।
(১) তাৎপর্য্য—এই দেহমধ্যে দুইপ্রকার আত্মা আছে বলিয়া অনুভূত হইয়া থাকে, একটি চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়রূপে, অপরটি সেই অনুভবের কর্তারূপে। অন্য শ্রুতিতে বলা হইয়াছে যে, “পশ্যন্ চক্ষুঃ, শৃণ্বন্ শ্রোত্রম্, মন্বানো মনঃ” ইত্যাদি। এ কথার অভিপ্রায় এই যে, আত্মা যখনই যে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিষয় অনুভব করে, তখন সেই ইন্দ্রিয়ের সহিতই অবিবিক্ত বা এক বলিয়া মনে হইয়া থাকে; এইজন্যই এখানে আত্মাকে করণাত্মক(ইন্দ্রিয় স্বরূপ) বলা হইয়াছে। ইহা ছাড়া—আলাদাভাবেও আত্মা যে অনুভবের কর্তা তাহা বোঝা যায়; নচেৎ এক ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত বিষয় যখন অপর ইন্দ্রিয় স্মরণ করিতে পারে না, অথচ অনুভূত বিষয় সকলেই স্মরণ করিয়া থাকে, তখন ইন্দ্রিয়ের সহিত যুক্ত নয়, এরূপ স্বতন্ত্র আত্মার অস্তিত্ব অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে।
উক্ত দুইটির মধ্যে, যাহাদ্বারা বোধ হইয়া থাকে, তাহা কখনও আত্মা হইতে পারে না। ভাল, সেই বোধ বা উপলব্ধিই কাহার দ্বারা হইয়া থাকে? হাঁ, বলিতেছি—চক্ষুর সহিত একীভূত যাহার দ্বারা রূপ দেখিয়া থাকে, কর্ণভাবাপন্ন যাহা দ্বারা শব্দ শ্রবণ করিয়া থাকে, ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের সহিত একীভূত যাহা দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া থাকে, বাগিন্দ্রিয়স্বরূপে যাহা দ্বারা ‘গো, অশ্ব’ ইত্যাদি নামাত্মক, এবং উত্তম অধম বাক্য উচ্চারণ করিয়া থাকে, এবং জিহ্বারূপে যাহা দ্বারা স্বাদু ও অস্বাহ বস্তু অনুভব করিয়া থাকে। ৩০॥১॥
যদেতদ্ধ দয়ং মনশ্চৈতৎ। সংজ্ঞানমাজ্ঞানং বিজ্ঞানং প্রজ্ঞানং মেধা দৃষ্টিধৃতির্মতির্মনীষা জুতিঃ স্মৃতিঃ সঙ্কল্পঃ ক্রতুরসুঃ কামো বশ ইতি। সর্ব্বাণ্যেবৈতানি প্রজ্ঞানস্য নামধেয়ানি ভবন্তি ॥৩১॥২৷৷
সরলার্থঃ।[ তদেবৎ বাহ্যেন্দ্রিয়াভিব্যক্তচৈতয়ে ঘাত্মভাবসংশয়ং প্রদর্শ, ইদানীমন্তঃকণ-তত্ত্ব ত্তিবিশেষাভিব্যক্তচৈতন্যেঘাত্মতত্ত্বসংশয়ঘভি- প্রেত্যাহ-“যদেতদ্ হৃদয়ম্” ইত্যাদি]। যদেতৎ হৃদয়ং(বুদ্ধিঃ), মনঃ চ(মনো বা, একমেব হি অন্তঃকরণৎ নিশ্চয়বৃত্ত্যা বুদ্ধিঃ, সংশয়বৃত্ত্যা চ মন উচ্যতে ইত্যর্থঃ)। এতৎ(উক্তং অন্তঃকরণমেব বৃত্তিভেদেন) সংজ্ঞানং (চেতনভাবঃ), আজ্ঞানং(আজ্ঞা-প্রভুত্বং), বিজ্ঞানং(কলাবিজ্ঞানং) প্রজ্ঞানং(গ্রন্থার্থাদৌ বুদ্ধেরুন্মেষঃ), মেধা(গ্রন্থার্থধারণসামর্থ্যম্), দৃষ্টিঃ(ইন্দ্রিয়অং জ্ঞানং), ধৃতিঃ(ধৈর্য্যস্-ব্যবসায়াদচলনম্), মতিঃ (মননৎ কাৰ্য্যালোচনম্), মনীষা(তত্র স্বাতন্ত্র্যম্), ভূতিঃ(রোগাদিজনিত- দুঃখিত্বম্), স্মৃতিঃ(স্মরণম্), সংকল্পঃ(নীলপীতাদিবিষয়বিকল্পনম্), ক্রতুঃ (অধ্যবসায়ঃ), অসুঃ(প্রাণনাবি-জীবনব্যাপারঃ), কামঃ(অসন্নিহিতবিষয়ে- হভিলাষঃ), বশঃ(ভোগ্যবস্তু-বিষয়কোইভিলাষঃ), এতানি(যথোক্তাঃ সংজ্ঞানাদ্যা বৃত্তয়ঃ) সর্ব্বাণি এব প্রজ্ঞানস্য(প্রজ্ঞানমাত্রস্য শুদ্ধস্য ব্রহ্মণঃ)- নামধেয়ানি(নাদানি-তত্তদুপাধিগত-বৃত্তিভেদজনিতানি, নতু সাক্ষাৎ) ভবন্তি ॥ ৩১ ॥ ২ ॥
মূলানুবাদ।[ প্রথমতঃ বহিরিন্দ্রিয়ে প্রকাশিত চৈতন্যে
আত্মভাবসম্বন্ধে সংশয় প্রদর্শন করিয়া, এখন অন্তরিন্দ্রিয়ে প্রকাশিত চৈতন্যেও আত্মভাবসম্বন্ধে সন্দেহ প্রদর্শন করিতেছেন—]।
এই যে, হৃদয়, মনও ইহারই নাম-অর্থাৎ একই অন্তঃকরণের দুইটি নাম মাত্র। সংজ্ঞান-চেতনভাব(চেতনা) অর্থাৎ যে বৃত্তির প্রভাবে প্রাণিগণ চেতন বলিয়া পরিচিত হয়, সেই বৃত্তি; আজ্ঞান- আজ্ঞা-প্রভুভাব, বিজ্ঞান-নৃত্যগীতাদি চৌষট্টি কলাবিষয়ক জ্ঞান, প্রজ্ঞান-প্রতিভা, মেধা-গ্রন্থের অর্থ মনে ধরিয়া রাখার ক্ষমতা, দৃষ্টি -ইন্দ্রিয় দ্বারা রূপ রস ইত্যাদির বোধ, ধৃতি অর্থ-ধৈর্য্য, মতি- মনন, কর্তব্যচিন্তা, মনীষা-কর্তব্যচিন্তায় নিজের স্বাধীনতা, জৃতি- রোগাদিজনিত দুঃখ, স্মৃতি-স্মরণ, সংকল্প-শ্বেতপীতাদি বিষয়ক বিতর্ক বা বিচার, ক্রতু-অধ্যবসায়(নিশ্চয়াত্মক জ্ঞান), অসু-শ্বাস প্রশ্বাসাদি নির্বাহক প্রাণবৃত্তি, কাম-আকাঙ্ক্ষা, বশ-ভোগ্য বস্তুর স্পর্শাদি কামনা, এই সমস্তই অন্তঃকরণের বৃত্তি এবং এ সমস্তই ব্রহ্মের ঔপাধিক(বিশেষ বিশেষ কার্য্যবোধক) নামবিশেষ মাত্র ॥ ৩১ ॥ ২॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কিৎ পুনস্তদেকমনেকধা ভিন্নং করণমিতি; উচ্যতে, যদুক্তং পুরস্তাৎ প্রজানাং রেতো হৃদয়ম্, হৃদয়স্য রেতো মনঃ, মনসা সৃষ্টা আপশ্চ বরুণশ্চ, হৃদয়ান্মনো মনসশ্চন্দ্রমাঃ, তদেবৈতদ্ হৃদয়ং মনশ্চ, একমেব তদনেকধা। এতেনান্তঃকরণেনৈকেন চক্ষুর্ভূতেন রূপৎ পশ্যতি, শ্রোত্রভূতেন শূণোতি, ঘ্রাণভূতেন জিঘ্রতি, বাগ্ভুতেন বদতি, জিহ্বাভূতেন রসয়তি, স্বেনৈব বিকল্পনারূপেণ মনসা বিকল্পয়তি, হৃদয়রূপেণাধ্যবস্থ্যতি। তস্মাৎ সর্ব্বকরণবিষয়ব্যাপারকমেকমিদং করণং সর্ব্বোপলব্ধ্যর্থমুপলব্ধঃ। তথা চ কৌষীতকীনাং “প্রজ্ঞয়া বাচৎ সমারুহ্য বাচা সর্ব্বাণি নামান্যাপ্নোতি, প্রজ্ঞয়া চক্ষুঃ সমারুহ্য চক্ষুষা সর্ব্বাণি রূপাণ্যাপ্নোতি” ইত্যাদি। বাজসনেয়কে চ “মনসা হ্যেব পশ্যতি মনসা শূণোতি, হৃদয়েন হি রূপানি বিজানাতি” ইত্যাদি। তস্মাদ্বুদয়মনোবাচ্যস্য সর্ব্বোপলব্ধিকরণত্বং প্রসিদ্ধম্। তদ্বাত্মকশ্চ প্রাণঃ “যো বৈ প্রাণঃ, সা প্রজ্ঞা, যা বৈ প্রজ্ঞা, স প্রাণঃ” ইতি হি ব্রাহ্মণম্। করণসংহতিরূপশ্চ প্রাণ ইত্যবোচাম প্রাণসংবাদাদৌ। ১ তথাৎ ৯৮ পদ্যং প্রাপদ্যত তং বক্ষ্য তদুদ্ভবং ক্বচিৎ বিক্রমেন গুণভূতাৎ।
তদ্বস্তু ব্রহ্মোপাস্য আত্মা ভবিতুমর্হতি। পারিশেষ্যাদ যস্যোপলব্ধ রুপলব্ধ্যর্থা এতন্ত হৃদয়মনোরূপস্য করণস্থ্য বৃত্তয়ো বক্ষ্যমাণাঃ, স উপলব্ধা উপাস্য আত্মা নোহস্মাকং ভবিতুমর্হতীতি নিশ্চয়ং কৃতবস্তুঃ। তদন্তঃকরণোপাধিস্থস্যোপলব্ধঃ প্রজ্ঞানরূপস্য ব্রহ্মণ উপলব্ধ্যর্থা যা অন্তঃকরণবৃত্তয়ো বাহ্যান্তর্ব্বর্তিবিষয়বিষয়াঃ, তা ইমা উচ্যন্তে—। ২
সংজ্ঞানং সংজ্ঞপ্তিঃ চেতনভাবঃ; আজ্ঞানম্ আজ্ঞপ্তিঃ ঈশ্বরভাবঃ; বিজ্ঞানং কলাদিপরিজ্ঞানম্; প্রজ্ঞানৎ প্রজ্ঞপ্তিঃ প্রজ্ঞতা; মেধা গ্রন্থধারণসামর্থ্যম্; দৃষ্টিঃ ইন্দ্রিয়দ্বারা সর্ব্ববিষয়োপলব্ধিঃ; ধৃতিঃ ধারণম্, অবসন্নানাং শরীরেন্দ্রিয়াণাৎ যয়োত্তন্তনং ভবতি; “ধৃত্যা শরীরমুদ্বহন্তি” ইতি হি বদন্তি। মতিঃ মন- নম্; মনীষা তত্র স্বাতন্ত্র্যম্; জৃতিঃ চেতসো রুজাদিদুঃখিত্বভাবঃ; স্মৃতিঃ স্মরণম্; সঙ্কল্পঃ শুক্লকৃষ্ণাদিভাবেন সঙ্কল্পনং রূপাদীনাম্; ক্রতুঃ অধ্যবসায়ঃ; অসুঃ প্রাণনাদিজীবনক্রিয়ানিমিত্তা বৃত্তিঃ; কামঃ অসন্নিহিতবিষয়াকাঙ্ক্ষা; বশঃ স্ত্রীবতিকরাদ্যভিলাষঃ; ইত্যেবমাদ্যা অন্তঃকরণবৃত্তয়ঃ উপলব্ধ, রুপ- লব্যর্থত্বাৎ শুদ্ধপ্রজ্ঞানরূপস্য ব্রহ্মণ উপাধিভূতাঃ, তদুপাধিজনিত গুণনাম- ধেয়ানি সংজ্ঞাদীনি সর্ব্বাণ্যেবৈতানি প্রজ্ঞপ্তিমাত্রস্য প্রজ্ঞানস্য নামধেয়ানি ভবন্তি, ন স্বতঃ সাক্ষাৎ। তথাচোক্তম্ “প্রাণন্নেধ প্রাণো নাম ভবতি” ইত্যাদি। ৩১॥২॥
ভাষ্যানুবাদ। পূর্ব্বে যে, একই করণ বা জ্ঞানসাধন অর্থাৎ ইন্দ্রিয়কে অনেক-প্রকারে বিভিন্ন বলা হইয়াছে, সেই করণটি কে? হাঁ, বলা হইতেছে। পূর্ব্ব শ্রুতিতে বলা হইয়াছে যে, হৃদয়ই প্রাণিগণের সার—হৃদয়ের সার মন; অপ্ ও তাহার অধিদেবতা বরুণ মনের দ্বারা সৃষ্ট হইয়াছে; এবং হৃদয় হইতে মন, মন হইতে চন্দ্রমা সৃষ্ট হইয়াছে। সেই এই হৃদয়ই মনও বটে; অর্থাৎ একই অন্তঃকরণ উভয়রূপে প্রকাশ পাইয়াছে। এই একই অন্তঃকরণ দ্বারা চক্ষুস্বরূপে রূপ দর্শন করে, কর্ণরূপে শব্দ শ্রবণ করে, ঘ্রাণেন্দ্রিয়রূপে গন্ধ গ্রহণ করে, বাগিন্দ্রিয়রূপে শব্দ উচ্চারণ করে, জিহ্বারূপে রসাস্বাদন করে, এবং নিজের বিকল্পাত্মক মনোরূপে বিকল্পনা করে, ও বুদ্ধিরূপে অধ্যবসায় বা নিশ্চয় করে। অতএব এই এক অন্তঃকরণই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের গ্রহণীয় বিষয়ে ব্যাপার নির্বাহ করত উপলব্ধিকারী আত্মার সর্ব্বপ্রকার উপল র্বর সাধন(উপায়) হইয়া থাকে। দেখ, কৌষীতকী ব্রাহ্মণে কথিত আছে ‘প্রজ্ঞা দ্বারা বাগিন্দ্রিয়ে আরোহণ করিয়া বাক্য দ্বারা সমস্ত নাম(শব্দ) প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ শব্দোচ্চারণ
করিয়া থাকে, প্রজ্ঞাদ্বারা চক্ষুতে আরোহণ করিয়া চক্ষুদ্বারা সমস্ত রূপ দর্শন করিয়া থাকে’ ইত্যাদি। বাজসনেয়ক ব্রাহ্মণেও উক্ত আছে-‘মনঃ দ্বারাই শ্রবণ করে, এবং হৃদয়(মনঃ) দ্বারাই সমস্ত বিষয় অনুভব করে’ ইত্যাদি। এই কারণেই হৃদয়(বুদ্ধি) ও মনঃ-শব্দবাচ্য অন্তঃকরণের সর্ব্বপ্রকার জ্ঞানসাধনতা অর্থাৎ অন্তঃকরণ দ্বারাই সকল প্রকার জ্ঞান জন্মে ইহা লোকপ্রসিদ্ধ। প্রসিদ্ধ প্রাণও তদাত্মক(অন্তঃকরণ স্বরূপ) অর্থাৎ অন্তঃকরণ হইতে ভিন্ন নহে; কারণ, ব্রাহ্মণে(উপনিষদে) কথিত আছে যে, ‘যাহা প্রাণ, তাহাই প্রজ্ঞা, আবার যাহা প্রজ্ঞা, তাহাই প্রাণ‘। প্রাণ যে, অন্তঃকরণসমষ্টি-স্বরূপ, একথা আমরা ‘প্রাণ- সংবাদ’ প্রভৃতি প্রকরণে বলিয়াছি(১)। ১ অতএব, যাহা দুইটি পায়ের সাহায্যে প্রবেশ করিয়াছিল, তাহাও ব্রহ্মই বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহা উপলব্ধিকারী আত্মার উপলব্ধিকরণ অর্থাৎ অনুভবের উপায় মাত্র; সুতরাং প্রধান বা মুখ্য নহে; অপ্রধান বলিয়াই সেই গৌণ ব্রহ্ম কখনই উপাস্য আত্মা হইতে পারে না। অতএব পারিশেষ্য নিয়মানুসারে(২)
বুঝা যায় যে, যে উপলব্ধিকর্তার(আত্মার) উপলব্ধির উপায়রূপে এই হৃদয় ও মনঃশব্দবাচ্য অন্তঃকরণের পশ্চাৎকথিত বৃত্তিসমূহ উৎপন্ন হইয়া থাকে, সেই উপলব্ধিকর্তা আত্মাই আমাদের উপাস্য হইবার যোগ্য;—পূর্ব্বকথিত জিজ্ঞাসুগণ এইপ্রকার নির্ধারণ করিয়াছিলেন। সেই অন্তঃকরণে অবস্থান করিয়া উপলব্ধিকারী জ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্মের উপলব্ধির জন্য বাহ্য ও আভ্যন্তরীণ(ভিতরের) বিষয়ে, যে সকল অন্তঃকরণবৃত্তি জন্মিয়া থাকে, এখন সেই বৃত্তিগুলির বিষয় ক্রমে বলা হইতেছে—। ২
সংজ্ঞান অর্থ-সংজ্ঞপ্তি-যাহা দ্বারা চেতন বলিয়া নিরূপিত হয়; আজ্ঞান অর্থ-আজ্ঞা-প্রভুভাব; বিজ্ঞান অর্থ-নৃত্যগীতাদি কলাবিষয়ে জ্ঞান; প্রজ্ঞান অর্থ-প্রজ্ঞতা অর্থাৎ সময়োচিত বুদ্ধির প্রকাশ-প্রতিভা; মেধা অর্থ- গ্রন্থার্থধারণের(মনে রাখার) ক্ষমতা; দৃষ্টি অর্থ-ইন্দ্রিয় দ্বারা সর্ব্ববিষয়ের উপলব্ধি; ধৃতি অর্থ-ধারণা অর্থাৎ অবসাদগ্রস্ত শরীর ও ইন্দ্রিয়সমূহের যাহা দ্বারা উত্তন্তন বা উত্তেজনা হয়; কারণ, ‘পণ্ডিতগণ বলিয়া থাকেন যে, ধৃতি দ্বারাই শরীর উদ্ধৃত করিয়া বহন করা হয়’; মতি অর্থ-মনন বা চিন্তা; মনীষা অর্থ-সেই মননকার্য্যে স্বাধীনতা; জৃতি অর্থ-রোগাদিজনিত মনের দুঃখ; স্মৃতি অর্থ-স্মরণ; সংকল্প অর্থ-রূপাদিবিষয়ে শুক্লকৃষ্ণাধিভাবে বিতর্ক; ক্রতু অর্থ-অধ্যবসায়; অসু অর্থ-জীবনের হেতু স্বরূপ প্রাণনাদি(নিঃশ্বাস- প্রশ্বাস ইত্যাদি) ব্যাপার। কাম অর্থ-দূরবর্তী বিষয়ে অভিলাষ বা তৃষ্ণা; বশ অর্থ-স্ত্রীসম্ভোগ ইত্যাদির অভিলাষ, এই জাতীয় অন্তঃকরণের বৃত্তিগুলি সাধারণতঃ উপলব্ধিকর্তা আত্মার উপলব্ধির জন্যই জন্মিয়া থাকে; সুতরাং এই বৃত্তিসমূহ শুদ্ধ বিজ্ঞানাত্মক ব্রহ্মের উপাধি স্বরূপ গুণ অনুসারে নাম, অর্থাৎ যথোক্ত সংজ্ঞান-প্রভৃতি সমস্ত বৃত্তিই শুদ্ধ জ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্মের উপাধিজনিত নাম মাত্র, কিন্তু সাক্ষাৎ নাম নহে। অন্যত্রও এই কথাই বলা হইয়াছে যে, ‘ব্রহ্ম প্রাণন করেন বলিয়াই প্রাণ নামে পরিচিত হন’ ইতি। ৩১।২।
এষ ব্রহ্মৈষ ইন্দ্র এষ প্রজাপতিরেতে সর্ব্বে দেবা ইমানি চ পঞ্চ মহাভূতানি পৃথিবী বায়ুরাকাশ আপো জ্যোতীংষীত্যেতানা- মানি চ ক্ষুদ্রমিশ্রাণীব। বীজানীতরাণি চেতরাণি চাণ্ডজানি চ জারুজানি চ স্বেদজানি চোদ্ভিজ্জানি চাশ্বা গাবঃ পুরুষা হস্তিনো
যৎ কিঞ্চেদং প্রাণি জঙ্গমং চ পতত্রি চ যচ্চ স্থাবরম্। সর্ব্বং তৎ প্রজ্ঞানেত্রং প্রজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিতং প্রজ্ঞানেত্রো লোকঃ প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠা প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম ॥৩২৷৷৩৷৷
সরলার্থঃ। এষঃ(যথোক্তঃ প্রজ্ঞানরূপ আত্মা)[এব] ব্রহ্ম(অপরং ব্রহ্ম) এবঃ ইন্দ্রঃ(স্বতঃ প্রকাশশীল: হিরণ্যগর্ভঃ, দেবরাজো বা), এষঃ প্রজাপতিঃ(প্রথমশরীরী), এবঃ এতে সর্ব্বে দেবাঃ(অগ্ন্যাদয়ঃ),[এষঃ] ‘ইমানি পঞ্চ মহাভূতানি-পৃথিবী, বায়ুঃ, আকাশঃ, আপঃ, জ্যোতীৎষি (তেজঃ), ইমানি ক্ষুদ্রমিশ্রাণি(ক্ষুদ্রৈ: প্রাণিভিঃ মিশ্রাণি-সমেতানি- সর্পাদীনি), কিঞ্চ,[এষ এব] ইমানি ইতরাণি বীজানি(কারণ-ভূতানি) চ; ইতরাণি চ(কার্য্যরূপানি অপি), অণ্ডজানি(পক্ষিসর্পাদীনি) চ, জারুজানি (জরায়ুভ্যো জাতানি মনুষ্যাদীনি) চ, স্বেদজানি(যুকাদীনি) চ, উদ্ভিজ্জানি (ভূমিমুস্তিত্য জাতানি তরুগুষ্মাদীনি) চ, অশ্বাঃ, গাবঃ, পুরুষাঃ, হস্তিনঃ, [প্রাগুক্তানামের উদাহরণরূপেণ অশ্বাদীনামুল্লেখো মন্তব্যঃ]।[কিং বহুনা] যৎ কিঞ্চ(যৎ কিমপি) ইদং জঙ্গমং চ পতত্রি(পক্ষযুক্তং) চ প্রাণি, যৎ চ (যদপি) স্থাবরং(স্থিতিশীলং), তৎ সর্ব্বং প্রজ্ঞানেত্রং-প্রজ্ঞানে(নিরুপাধিকে চৈতন্যে) প্রতিষ্ঠিতৎ(রজ্জৌ সর্প ইব অধ্যন্তম্), লোকঃ(প্রাণিসংঘঃ) প্রজ্ঞা- নেত্রঃ(প্রজ্ঞা-জ্ঞানং নেত্রং-ব্যবহারহেতুভূতৎ যস্য, সঃ), তথা প্রজ্ঞা(চৈতন্যং) প্রতিষ্ঠা-(লয়স্থানং)[সর্ব্বস্য লোকস্য ইতি শেষঃ]।[এভিঃ পদৈঃ চৈতন্যস্য সৃষ্টিস্থিতিহেতুত্বমুক্তম্। তস্মাৎ] প্রজ্ঞানম্[এব] ব্রহ্ম(ব্রহ্মণ এব সৃষ্টিস্থিতিহেতুত্বাবধারণাৎ) ইত্যর্থঃ ॥ ৩২॥৩॥
মূলানুবাদ। উক্ত প্রজ্ঞানস্বরূপ আত্মাই ব্রহ্ম, ইনিই ইন্দ্র, ইনিই প্রজাপতি, ইনিই এই সমস্ত দেবতা, এই সমস্ত পঞ্চভূত,- পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, জল ও তেজঃ এবং এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণি- দেহের সহিত সমস্ত বীজ(কারণস্বরূপ) ও তদ্ভিন্ন(অকারণস্বরূপ নিখিল দেহ), সমস্ত অণ্ডজ(সর্প প্রভৃতি), জরায়ুজ(মানুষ প্রভৃতি), স্বেদজ(উকুন প্রভৃতি), উদ্ভিজ্জ(বৃক্ষলতা প্রভৃতি), অশ্ব, গো, পুরুষ, হস্তী, অধিক কি, এই মনুষ্য পক্ষী প্রভৃতি যাহা কিছু জঙ্গম ও স্থাবর(চলিতে সমর্থ বা অসমর্থ), সেই সমস্তই প্রজ্ঞানেত্র অর্থাৎ
নিরুপাধিক ব্রহ্ম চৈতন্যে প্রতিষ্ঠিত, তাহা হইতে উৎপন্ন, সমস্ত লোকই প্রজ্ঞানে অবস্থিত, এবং প্রজ্ঞানই তাহাদের লয়স্থান; অতএব প্রজ্ঞানই ব্রহ্ম ॥৩২৷৷৩৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। স এষ প্রজ্ঞানরূপ আত্মা ব্রহ্ম অপরং, সর্ব্বশরীরস্থঃ প্রাণঃ প্রজ্ঞাত্মা অন্তঃকরণোপাধিঘনুপ্রবিষ্টো জলভেদগতসূর্য্যপ্রতিবিম্ববৎ হিরণ্যগর্ভঃ প্রাণঃ প্রজ্ঞাত্মা। এষ এব ইন্দ্রঃ গুণাৎ, দেবরাজো বা। এষঃ প্রজাপতিঃ, যঃ প্রথমজঃ শরীরী, যতো মুখাদিনির্ভেদদ্বারেণাগ্ন্যাদয়ো লোকপালা জাতাঃ, স প্রজাপতিরেব এব। যেহপ্যেতে অগ্ন্যাদয়ঃ সর্ব্বে দেবা এষ এব। ইমানি চ সর্ব্বশরীরোপাদানভূতানি পঞ্চ পৃথিব্যাদীনি মহাভূতানি অন্নান্নাদত্ব- লক্ষণানি এতানি। কিঞ্চ, ইমানি চ ক্ষুদ্রমিশ্রাণি ক্ষুদ্রৈরল্পকৈম্মিশ্রাণি, ইব-- শব্দোহনর্থকঃ, সর্পাদীনি। ১
বীজানি কারণানি, ইতরাণি চেতরাণি চ দ্বৈরাশত্বেন নিদ্দিশ্যমানানি। কানি তানি? উচ্যন্তে-অণ্ডজানি পক্ষ্যাদীনি, জারুজানি জরায়ুজানি মনুষ্যাদীনি, স্বেদজানি যুকাদীনি, উদ্ভিজ্জানি চ বৃক্ষাদীনি। অশ্বাঃ গাবঃ পুরুষাঃ হস্তিনঃ অন্যচ্চ যৎ কিঞ্চেদং প্রাণি। কিং তৎ? অঙ্গমং যচ্চলতি পস্ত্যাং গচ্ছতি, যচ্চ পতত্রি আকাশেন পতনশীলম্; যচ্চ স্থাবরম্ অচলম্; সর্ব্বং তদশেষতঃ প্রজ্ঞানেক্রম্; প্রজ্ঞপ্তিঃ প্রজ্ঞা, তচ্চ ব্রহ্মৈব, নীয়তে(সত্তা প্রাপ্যতে) অনেনেতি নেত্রম্, প্রজ্ঞা নেত্রং যস্য, তদ্বিদৎ প্রজ্ঞানেক্রম্; প্রজ্ঞানে ব্রহ্মন্যুৎপত্তি- স্থিতিলয়কালেষু প্রতিষ্ঠিতং প্রজ্ঞাশ্রয়মিত্যর্থঃ। প্রজ্ঞানেত্রো লোকঃ, পূর্ব্ববৎ; প্রজ্ঞা-- চক্ষুর্ব্বা সর্ব্ব এব লোকঃ। প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠা সর্ব্বস্য জগতঃ। তস্মাৎ প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম। ২
তদেতৎ প্রত্যস্তমিতসর্ব্বোপাধিবিশেষং সৎ নিরঞ্জনং নির্মলং নিষ্ক্রিয়ং শান্তমেকমদ্বয়ং “নেতি নেতি” ইতি সর্ব্ববিশেষাপোহসংবেদ্যং সর্ব্বশব্দপ্রত্যয়া- গোচরং তদত্যন্তবিশুদ্ধপ্রজ্ঞোপাধিসম্বন্ধেন সর্ব্বজ্ঞমীশ্বরং সর্ব্বসাধারণাব্যাকৃত-- জগদ্বীজপ্রবর্তকং নিয়ন্ত ত্বাদন্তর্যামিসংজ্ঞং ভবতি, তদেব ব্যাকৃত-জগদ্বীজভূত- বুদ্ধ্যাত্মাভিমানলক্ষণং হিরণ্যগর্ভসংজ্ঞং ভবতি। তদেবাস্তরণ্ডোদ্ভূত-প্রথম- শরীরোপাধিমদ্বিরাট্ প্রজাপতিসংজ্ঞং ভবতি। তদুদ্ভূতাগ্ন্যাদ্যপাধিমদ্দেবতা-- সজ্ঞং ভবতি। তথা বিশেষশরীরোপাধিঘপি ব্রহ্মা দিস্তম্বপর্য্যন্তেষু তত্তন্নামরূপ- লাভো ব্রহ্মণঃ। তদেবৈকং সর্ব্বোপাধিভেদভিন্নং সর্ব্বৈঃ প্রাণিভিস্তার্বিকৈশ্চ সর্ব্ব- প্রকারেণ জ্ঞায়তে বিকল্প্যতেচানেকধা। “এতমেকে বদস্ত্যগ্নিং মনুমধ্যে প্রজাপতিম্। ইন্দ্রযেকেৎপরে প্রাণষণে ব্রহ্ম শাশ্বতম্” ইত্যাদ্যা স্মৃতিঃ। ৩২।৩।
ভাষ্যানুবাদ। সেই এই প্রজ্ঞানস্বরূপ আত্মারই অপর ব্রহ্ম(উপাধিযুক্ত ব্রহ্ম); ইহাই সর্ব্বশরীরস্থিত প্রাণ ও প্রজ্ঞাত্মা এবং বিভিন্ন জলপাত্রে পতিত জল সূর্য্যপ্রতিবিম্বের ন্যায় ইহাও অন্তঃকরণরূপ উপাধিমধ্যে প্রবেশ করিয়া হিরণ্যগর্ভ প্রাণ ও প্রজ্ঞাত্মা। ইন্দ্রশব্দের প্রকৃতি প্রত্যয় অনুসারে হিরণ্যগর্ভ কিংবা সাক্ষাৎ দেবরাজ অর্থও গ্রহণ করা যাইতে পারে। ইনিই প্রজাপতি, যিনি প্রথমোৎপন্ন শরীরধারী পুরুষ; যাহার মুখছিদ্র ইত্যাদি প্রকাশের ফলে লোকপাল ইন্দ্র, অগ্নি প্রভৃতি উৎপন্ন হইয়াছেন, সেই প্রজাপতিও ইনিই। এবং এই যে, অগ্নি প্রভৃতি দেবতাগণ, তাঁহারাও ইনিই অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপই বটে। আর এই যে, সমস্ত শরীরের উপাদানরূপে এবং অন্ন ও অন্নভোজনকারী- রূপে পরিণত ক্ষিতি(মাটি) প্রভৃতি পঞ্চ মহাভূত, ইহারা, এবং মশক প্রভৃতি ক্ষুদ্র প্রাণীদের সহিত সর্প প্রভৃতি। ১
বীজ ও অবীজ, বীজ অর্থ কারণ-কার্য্যোৎপাদক; যাহা হইতে কার্য্য অর্থাৎ ফল উৎপন্ন হয়; অবীজ অর্থ-কার্য্যের অনুৎপাদক, এই দুই ভাগে বিভক্ত যে সমুদয় প্রাণী(ইতরাণি চ ইতরাণি চ বলিয়া যাহাদের নির্দেশ করা হইয়াছে) সেই সমুদয় প্রাণী কাহারা? বলা হইতেছে-অণ্ডজ-পক্ষি প্রভৃতি, জারুজ-জরায়ুজ মনুষ্য প্রভৃতি, স্বেদজ-উকুন প্রভৃতি, উদ্ভিজ্জ-বৃক্ষলতা প্রভৃতি। অশ্ব, গো, পুরুষ ও হস্তি প্রভৃতি, আরও যে কিছু প্রাণী। তাহা কি কি? না, জঙ্গম-যাহারা পায়ের দ্বারা গমন করিয়া থাকে; আর পতত্রি, যাহারা আকাশপথে উড়িয়া থাকে; যাহা স্থাবর অর্থাৎ চলিতে পারে না; সে সমুদয়ই প্রজ্ঞানেত্র। প্রজ্ঞা অর্থ-প্রকৃষ্ট জ্ঞান, তাহা নিশ্চিতই ব্রহ্মস্বরূপ; নেত্র অর্থ-যাহা দ্বারা নীত হয়(সত্তালাভ হয়)। সেই প্রজ্ঞা যাহার নেত্র, তাহার নাম প্রজ্ঞানেত্র; উৎপত্তি, স্থিতি ও লয়, এই তিন সময়েই যাহা প্রজ্ঞাস্বরূপ ব্রহ্মে অবস্থিত অর্থাৎ প্রজ্ঞাতে আশ্রিত;[এই জন্যই উহারা প্রজ্ঞানেত্র]। লোক অর্থাৎ ভূঃ প্রভৃতি লোকও প্রজ্ঞানেত্র; অথবা প্রজ্ঞাই সমস্ত জগতের প্রতিষ্ঠা বা স্থিতির মূল; সেই কারণে উহারা প্রজ্ঞান ব্রহ্মস্বরূপ। ২
সেই যে, এই সকল উপাধিশূন্য নিত্য নিরঞ্জন(মলিনতাশূন্য) নির্ম্মল ও নিষ্ক্রিয়;[অতএব] শান্ত এক অদ্বিতীয়; “নেতি নেতি” প্রণালীক্রমে সমস্ত বিশেষণ-পরিত্যক্তরূপে বিজ্ঞেয়(যাহার কোন বিশেষণ নাই বলিয়া জানা যায়) এবং শব্দজাত সর্ব্বপ্রকার জ্ঞানের অগোচর ব্রহ্ম, তাহাই আবার অত্যন্ত বিশুদ্ধ
বুদ্ধিস্বরূপ উপাধিসম্পর্ক বশতঃ সর্বজ্ঞ ঈশ্বরভাবে সর্ব্বজীবভোগ্য সমস্ত অব্যক্ত (অপ্রকাশিত) জগতের প্রবর্তক বা আবির্ভাবের কারণ এবং সর্ব্ববস্তুর নিয়ন্ত্রণ- কারীরূপে অন্তর্যামী বলিয়া কথিত হন। তিনিই আবার যখন ব্যক্ত(প্রকাশিত)- জগতের বীজস্বরূপ(অঙ্কুরাবস্থা) বুদ্ধি ও আত্মারূপ উপাধি(বিশিষ্টভাবে) গ্রহণ করেন, তখন হিরণ্যগর্ভ নাম লাভ করেন। তিনিই আবার ব্রহ্মাণ্ডমধ্যে প্রথম উৎপন্ন শরীররূপ বৈশিষ্ট্য লাভ করিয়া বিরাট ও প্রজাপতি নাম লাভ করিয়া থাকেন। তিনিই আবার প্রকাশিত অগ্নিপ্রভৃতি উপাধিবিশেষযোগে দেবতা- নামে কথিত হইয়া থাকেন। এইরূপ ব্রহ্ম হইতে আরম্ভ করিয়া তৃণপর্যন্ত বিশেষ বিশেষ শরীরসম্বন্ধ-বশতঃ সেই ব্রহ্মেরই বিশেষ বিশেষ নাম লাভ হইয়া থাকে। নানাপ্রকার উপাধিভেদে ভিন্ন প্রকার সেই ব্রহ্মকেই সমস্তপ্রাণী ও তাকিকগণ বিভিন্ন প্রকারে জানিয়া থাকেন এবং নানাকারে তাঁহার কল্পনা করিয়া থাকেন। মনুস্মৃতি বলিয়াছেন-‘একশ্রেণীর লোকেরা ইঁহাকে অগ্নি বলিয়া নির্দেশ করেন; অপরে প্রজাপতি মনু বলিয়া বর্ণনা করেন; কেহ কেব ইন্দ্র বলেন; কেহ বা প্রাণ বলেন; কেহ আবার শাশ্বত(নিত্য) ব্রহ্ম বলিয়াও জানেন’ ইত্যাদি ॥ ৩২ ॥৩॥
স এতেন প্রজ্ঞেনাত্মনাস্মাল্লোকাদুৎক্রম্যামুষ্মিন্ স্বর্গে লোকে সর্ব্বান্ কামানাপ্তামৃতঃ সমভবৎ সমভবৎ ॥৩৩॥৪॥
ইতি তৃতীয়াধ্যায়ে প্রথমঃ খণ্ডঃ ॥৩৷৷১॥ ইত্যৈতরেয়োপনিষদি তৃতীয়োহধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥৩৷৷ ইত্যৈতরেয়দ্বিতীয়ারণ্যকে ষষ্ঠোহধ্যায়ঃ ॥৬৷৷
সরলার্থঃ।[অথ তত্ত্বজ্ঞানফলমুপসংহরতি ‘স এতেন’ ইত্যাদিনা।] [যঃ প্রজ্ঞানং ব্রহ্মেতি বিবেদ] সঃ(বামদেবঃ) এতেন(যথোক্তেন) প্রজেন (চৈতন্যস্বরূপেণ) আত্মনা(স্বয়মাবির্ভূতচৈতন্যস্বভাবঃ সন্ ইত্যর্থঃ), অস্মাৎ লোকাৎ উৎক্রম্য(বর্তমানং দেহং পরিত্যজ্য) অমুষ্মিন্ স্বর্গে লোকে সর্ব্বান্ কামান্ আপ্ত্বা(লব্ধা, পূর্ণকামো ভূত্বা ইত্যর্থঃ) অমৃতঃ(কৈবল্যং প্রাপ্তঃ) সমভবৎ। দ্বিরুক্তিরধ্যায়সমাপ্ত্যর্থী ॥ ৩৩॥ ৪॥
মূলানুবাদ।[ এখন তত্ত্বজ্ঞানের ফলোপসংহার করিতেছেন] যিনি[‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’ বলিয়া জানিয়াছিলেন], সেই বামদেব উক্ত
চৈতন্যাত্মস্বরূপে ইহলোক হইতে উৎক্রমণের অর্থাৎ দেহত্যাগের পর স্বর্গলোকে সমস্ত কামফল প্রাপ্ত হইয়া চরম মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন। অধ্যায়সমাপ্তিসূചനার্থ ‘সমভবৎ’ কথার দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে ॥৩৩৷৪৷৷
সেয়মল্লপদোপেতা শ্রীশঙ্করমতে স্থিতা। শ্রীদুর্গাচরণন্যস্তা সরলা স্যাৎ সতাং মুদে ॥ ইতি তৃতীয়াধ্যায়ে প্রথমখণ্ডব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥৩৷১॥ ইত্যৈতরেয়োপনিষদি তৃতীয়োহধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥৩৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। স বামদেবোহন্যো বা এবং যথোক্তং ব্রহ্ম বেদ, প্রজ্ঞেনাত্মনা,- যেনৈব প্রজ্ঞেনাত্মনা পূর্ব্বে বিদ্বাংসোহমৃতা অভুবন্, তথা অয়মপি বিদ্বানেতেনৈব প্রজ্ঞেনাত্মনা অস্মাল্লোকাৎ উৎক্রম্যেত্যাদি ব্যাখ্যাতম্। অস্মাল্লোকাদুৎ- ক্র্যামুষ্মিন্ স্বর্গে লোকে সর্ব্বান্ কামান্ আপ্তা অমৃতঃ সমভবৎ সমভবদিত্যোমিতি ॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ ঐতরেয়োপনিষদ্ভাষ্যে তৃতীয়োহধ্যায়ঃ সম্পূর্ণঃ ॥ ৩ ॥ ঐতরেয়োপনিষদ্ভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥
ভাষ্যানুবাদ। সেই বামদেব কিংবা অন্য যে কেহ উক্তপ্রকার ব্রহ্মকে প্রজ্ঞা আত্মারূপে—চৈতন্যাত্মস্বরূপে জানিয়াছিলেন, অর্থাৎ পূর্ব্ববর্তী জ্ঞানিগণ,- যে প্রজ্ঞাত্মজ্ঞানবলে যেরূপে অমৃত হইয়াছিলেন, এই বিদ্বান্ পুরুষও ঠিক সেইরূপেই এই প্রজ্ঞ আত্মস্বরূপে, এই বর্তমান লোক হইতে উৎক্রান্ত হইয়া (দেহ ত্যাগ করিয়া)—ইত্যাদি বাক্য পূর্ব্বেই ব্যাখ্যাত হইয়াছে। এই লোক হইতে উৎক্রান্ত হইয়া ঐ স্বর্গলোকে সমস্ত কাম অর্থাৎ কাম্য বস্তু ভোগ প্রাপ্ত হইয়া অমৃত হইয়াছিলেন অর্থাৎ মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন। ৩৩॥ ৪॥
ইতি তৃতীয়াধ্যায়ে প্রথমখণ্ডের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৩ ॥ ১ ॥ ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য পূজনীয় শ্রীগোবিন্দের শ্রেষ্ঠশিষ্য শ্রীমৎশঙ্করভগবৎকৃত ঐতরেয়োপনিষদের ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥০॥
ওঁ বাঙ্মে মনসি প্রতিষ্ঠিতা মনো মে বাচি প্রতিষ্ঠিত- মাবিরাবীর্ম এধি। বেদস্য ম আণী স্থঃ শ্রুতং মে মা প্রহাসীঃ।
অনেনাধীতেনাহোরাত্রান্ সন্দধাম্যতং বদিষ্যামি। সত্যং বদিষ্যামি। তন্মামবতু। তদ্বক্তারমবতু। অবতু মামবতু বক্তার- মবতু বক্তারম্ ॥
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥ ওঁ ॥
[ অথোত্তরাশান্তিঃ—]
ওঁ উদিতঃ শুক্রিয়ং দধে। তমহমাত্মনি দধে। অনু মামৈ- ত্বিন্দ্রিয়ম্ ময়ি শ্রীর্ময়ি যশঃ সর্ব্বঃ সপ্রাণঃ সবলঃ। উত্তিষ্ঠাম্যনু মা শ্রীঃ। উত্তিষ্ঠত্বনু মায়ন্ত দেবতাঃ। অদৰ্কং চক্ষুরিষিতং মনঃ। সূর্য্যো জ্যোতিষাং শ্রেষ্ঠো দীক্ষে মা মা হিংসীঃ। তচ্চক্ষুর্দেবহিতং শুক্রমুচ্চরৎ। পশ্যেম শরদঃ শতম্ জীবেম শরদঃ শতম্। ত্বমগ্নে ব্রতপা অসি। দেব আ মর্ত্যেম্বা। ত্বং যজ্ঞেষ্বীড্যঃ ॥
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥ ইত্যৈতরেয়োপনিষদ্ সমাপ্তা ॥০॥
॥ ওঁ তৎ সৎ ওঁ ॥
—